Monday 15 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ওভারথিংকিং ও মানসিক অস্থিরতা তাড়াবে ইসলাম

সারাবাংলা ডেস্ক
১৫ জুন ২০২৬ ১৬:২৬

জীবন চলার পথে নানামুখী সংকট, জীবিকার টানাপোড়েন, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কিংবা পারিবারিক সমস্যা নিয়ে ভাবা মানুষের চিরন্তন স্বভাব। কিন্তু এই স্বাভাবিক ভাবনার পরিধি যখন সীমা ছাড়িয়ে তীব্র মানসিক চাপ ও ‘ওভারথিংকিং’ বা অতিরিক্ত চিন্তায় রূপ নেয়, তখন তা মানুষের আত্মিক শান্তি, ইবাদতের গভীরতা এবং দৈনন্দিন জীবনকে বিষিয়ে তোলে। ইসলাম মানুষকে দূরদর্শী ও পরিকল্পনাকারী হতে উৎসাহিত করলেও, অহেতুক দুশ্চিন্তা ও হতাশায় ডুবে থাকতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে।

অতিরিক্ত মানসিক চাপ কেন অন্তরের শান্তি কেড়ে নেয়?

অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা মানুষের মনকে বর্তমানের বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এর ফলে মানুষ হয় অতীতের ব্যর্থতা নিয়ে আফসোস করে, নয়তো ভবিষ্যতের কাল্পনিক ভয়ে আতঙ্কিত থাকে। এতে করে আল্লাহর প্রতি ভরসা বা ‘তাওয়াক্কুল’ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মনের ভেতরের শান্তি উধাও হয়ে যায়। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ এর নিখুঁত সমাধান দিয়ে বলেছেন:

বিজ্ঞাপন

‘জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয়সমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সূরা রা’দ: ২৮)

এ বাণী মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের মনের আসল স্বস্তি ও নিরাপত্তা কোনো পার্থিব ধন-সম্পদে নেই, বরং তা লুকিয়ে আছে আল্লাহর জিকির ও তাঁর প্রতি অবিচল আস্থার মাঝে।

ভবিষ্যতের ভয় মুমিনের ভূষণ নয়

আমাদের আগামীর দিনগুলো কেমন যাবে, রিজিকের সংস্থান কীভাবে হবে—তার সবকিছুই একমাত্র আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন। তাই সাধ্যমতো চেষ্টা ও সঠিক পরিকল্পনা করা ইসলামের শিক্ষা হলেও, ফলাফল নিয়ে অযথা আতঙ্কে ভোগা একজন প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।

কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে:

‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের কোনো পথ তৈরি করে দেন। এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।’ (সূরা তালাক: ২-৩)

হতাশাগ্রস্ত হওয়া ঈমানের পরিপন্থী

অতিরিক্ত চিন্তা মানুষকে ধীরে ধীরে চরম হতাশার দিকে ঠেলে দেয়। অথচ একজন বিশ্বাসী মানুষ কখনোই আল্লাহর দয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে না। আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন:

‘আল্লাহর রহমত থেকে কাফির সম্প্রদায় ছাড়া আর কেউ নিরাশ হয় না।’ (সূরা ইউসুফ: ৮৭)

তাই পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক না কেন, পরম আশাবাদী হয়ে আল্লাহর দরবারে ফিরে আসাই হলো ঈমানের দাবি।

‘যদি এমন হতো…’ শয়তানের এক মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ

অনেকে অতীতের কোনো ঘটনা নিয়ে বারবার আক্ষেপ করেন—’যদি আমি ওটা না করতাম’, ‘যদি এমন হতো’। এই ধরনের অনুশোচনা মনের ক্ষোভ ও হতাশা আরও বাড়িয়ে দেয়।

এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মতকে সতর্ক করে বলেছেন:

‘এমন বলো না যে, ‘যদি আমি এমন করতাম তবে এমন হতো না।’ বরং বলো, ‘আল্লাহ তাআলা যা কপালে নির্ধারণ করে রেখেছিলেন এবং যা চেয়েছেন, তা-ই করেছেন।’ কারণ, ‘যদি’ শব্দটি শয়তানের কাজের পথ উন্মুক্ত করে দেয়।’ (সহীহ মুসলিম: ২৬৬৪)

দুশ্চিন্তা মুক্তির চার নববী দাওয়াই

মানসিক অশান্তি ও উদ্বেগ থেকে মুক্ত থাকতে রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং পবিত্র কুরআন আমাদের বেশ কিছু কার্যকরী আমল শিখিয়েছে:

১. ধৈর্য ও সালাতের আশ্রয় নেওয়া: আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও।’ (সূরা বাকারা: ১৫৩)। প্রিয় নবী (সা.) কোনো বড় সংকটে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন।

২. অবিরাম ইস্তিগফার করা: হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, যে ব্যক্তি নিয়মিত আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা (ইস্তিগফার) করে, আল্লাহ তাকে সব ধরনের সংকট থেকে বাঁচার পথ দেখান এবং তার সব মানসিক পেরেশানি দূর করে দেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৮১৯)

৩. বিশেষ দোয়ার মাধ্যমে আশ্রয় চাওয়া: আল্লাহর রাসূল (সা.) নিয়মিত এই দোয়াটি পড়তেন: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাজান…’ যার অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুশ্চিন্তা ও মানসিক অস্থিরতা, অক্ষমতা ও অলসতা, কৃপণতা ও ভীরুতা এবং ঋণের বোঝা ও মানুষের অত্যাচার থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।’ (সহীহ বুখারী: ২৮৯৩)

৪. বেশি বেশি দরুদ পাঠ: সাহাবি উবাই ইবনে কাব (রা.) যখন তাঁর দোয়ার পুরোটা সময় দরুদ পড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, ‘তাহলে তা তোমার দুশ্চিন্তা মুক্তির জন্য যথেষ্ট হবে এবং তোমার গুনাহসমূহ ক্ষমা করা হবে।’ (সুনানে তিরমিজি: ২৪৫৭)

তাওয়াক্কুল: পরম মানসিক স্বস্তির চাবিকাঠি

ইসলামী পরিভাষায় তাওয়াক্কুল হলো নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পর ফলাফলের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া। এটি মুমিনের মানসিক শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) চমৎকার একটি উদাহরণের মাধ্যমে এটি বুঝিয়েছেন:

‘তোমরা যদি আল্লাহর ওপর সঠিক উপায়ে ভরসা করতে, তবে পাখিদের মতো তোমাদেরও রিজিক দেওয়া হতো; যারা সকালবেলা খালি পেটে বাসা থেকে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে নীড়ে ফেরে।’ (জামে তিরমিজি: ২৩৪৪)

কষ্টের মাঝেও মুমিনের কল্যাণ

একজন মুসলিমের জীবনে আসা দুঃখ-কষ্ট কখনোই বৃথা যায় না। মহানবী (সা.) বলেছেন:

‘কোনো মুসলিমের ওপর যে মানসিক ও শারীরিক কষ্ট, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কিংবা সামান্য একটা কাঁটার আঘাতও আসে—তার বিনিময়ে আল্লাহ তার পাপসমূহ মোচন করে দেন।’ (সহীহ বুখারী: ৫৬৪১)

অতএব, জীবনের কঠিন সময়গুলোকে অতিরিক্ত চিন্তা করে নষ্ট না করে ধৈর্যের সাথে মোকাবিলা করলে তা পরকালের পাথেয় হিসেবে গণ্য হবে।

উল্লেখ্য, চিন্তা-ভাবনা মানুষের স্বভাবজাত বিষয় হলেও একে ‘মানসিক ব্যাধি’ বা ওভারথিংকিং-এ রূপ নিতে দেওয়া যাবে না। ইসলাম আমাদের কর্মঠ হওয়ার পাশাপাশি আল্লাহর ওপর ভরসা, নিয়মিত ইবাদত, ইস্তিগফার ও দোয়ার মাধ্যমে মনের শান্তি খোঁজার শিক্ষা দেয়। যে ব্যক্তি নিজের চেষ্টা শেষে আল্লাহর ওপর আস্থা রাখতে পারে, তার অন্তর কখনোই অশান্ত হয় না।