ইসলামী জীবনদর্শনে সততা ও স্পষ্টবাদিতার পাশাপাশি কিছু বিষয়ে গোপনীয়তা বজায় রাখার ওপর বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সব কথা বা পরিকল্পনা সবার সামনে প্রকাশ করা সবসময় বুদ্ধিমানের কাজ নয়। লোকদেখানো মনোভাব, অহংকার, পরশ্রীকাতরতা, বদনজর ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে কিছু ক্ষেত্রে গোপনীয়তা অবলম্বন করা জরুরি।
আসুন জেনে নেই পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এমনকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা মানুষের কাছ থেকে আড়ালে রাখাই শ্রেয়…
দান-সদকার বিষয়
দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। তবে এই দান যদি গোপনে করা হয়, তবে তার মর্যাদা বহুগুণ বেড়ে যায়। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন:
‘তোমরা যদি প্রকাশ্যে দান-খয়রাত করো, তবে তাও ভালো। আর যদি তা লুকিয়ে অভাবগ্রস্তদের দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও বেশি উত্তম।’ (সূরা বাকারা: ২৭১)
গোপন দানের মাধ্যমে নিয়তের বিশুদ্ধতা প্রকাশ পায় এবং সামাজিক লৌকিকতা বা লোকদেখানোর মানসিকতা থেকে মুক্ত থাকা যায়।
নিজের করা পাপ বা অপরাধ
মানুষ মাত্রই ভুল ও পাপের পঙ্কিলতায় জড়াতে পারে। তবে নিজের করা কোনো অন্যায় বা গুনাহর কথা অন্যের কাছে গল্প ছলে বলে বেড়ানো বা তা নিয়ে গর্ব করা ইসলামে চরম নিন্দনীয়। রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন:
‘‘আমার উম্মতের সবাইকে ক্ষমা করা হবে, তবে ওইসব লোক ছাড়া যারা নিজেদের পাপ প্রকাশ করে বেড়ায়। এটি একটি বড় অন্যায় যে, কোনো ব্যক্তি রাতে একটা পাপ করল যা আল্লাহ গোপন রাখলেন, অথচ সে সকালে উঠে মানুষের কাছে বলল—’হে অমুক! আমি গত রাতে এই এই কাজ করেছি।’ অথচ সে এমন অবস্থায় রাত পার করেছিল যে তার প্রতিপালক তার পাপ ঢেকে রেখেছিলেন, আর সে সকালে উঠে আল্লাহর দেওয়া সেই আবরণ নিজেই উন্মোচন করে দিল।’’ (সহিহ বুখারি: ৬০৬৯)
তাই কোনো ভুল হয়ে গেলে তা মানুষের কাছে প্রচার না করে, নিভৃতে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করাই একজন প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
নফল ইবাদত-বন্দেগি
ফরজ ইবাদত বাদে অন্যান্য নফল আমল যতটা সম্ভব গোপনে করা উত্তম। প্রিয় নবী (স.) এমন ব্যক্তির উচ্চ প্রশংসা করেছেন, যিনি এত গোপনে দান করেন যে তার ডান হাত কী দান করল, বাম হাতও তা টের পায় না (সহিহ বুখারি: ১৪২৩)।
এই শ্রেণির নিষ্ঠাবান বান্দারা কিয়ামতের কঠিন দিনে আরশের শীতল ছায়াতলে আশ্রয় পাবেন। রাতের তাহাজ্জুদ, নফল রোজা, তাসবিহ-তাহলিল ও জিকির গোপন রাখার মাধ্যমে ইবাদতের একাগ্রতা ও খাঁটি ভাব বজায় থাকে।
অপরের খুঁত বা ত্রুটি
কারো ব্যক্তিগত দোষত্রুটি খুঁজে বেড়ানো কিংবা তা মানুষের সামনে তুলে ধরা ইসলামের শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আল্লাহর রাসুল (স.) বলেছেন:
‘যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোনো মুসলমানের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবে, মহান আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন।’ (সহিহ মুসলিম: ২৬৯৯)
অন্যের সামাজিক মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করা প্রত্যেকটি মুসলমানের নৈতিক দায়িত্ব।
নিজের সৎকর্ম ও পুণ্য
ভালো কাজ বা আমল করার পর তা সর্বত্র ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করার প্রবণতা ইবাদতের মূল উদ্দেশ্যকে নষ্ট করে দেয় এবং অন্তরে রিয়া বা লোকদেখানোর রোগ তৈরি করে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন:
‘তাদেরকে কেবল এই নির্দেশই দেওয়া হয়েছিল যে, তারা যেন খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করে।’ (সূরা বাইয়্যিনাহ: ৫)
অতএব, সুখ্যাতি অর্জনের মোহ ছেড়ে নিজের নেক আমল গোপন রেখে আল্লাহর সন্তুষ্টির আশা করাই শ্রেয়। তবে হ্যাঁ, সমাজকে উৎসাহিত করতে বা দ্বীনি প্রয়োজনে কখনো কখনো ভালো কাজ প্রকাশ করা যেতে পারে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও স্বপ্ন
জীবনের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বা বিশেষ কোনো স্বপ্নের কথা সবার কাছে আগেভাগেই প্রকাশ করা মোটেও সমীচীন নয়। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, হযরত ইয়াকুব (আ.) তার প্রিয় পুত্র হযরত ইউসুফ (আ.)-কে তার স্বপ্নের কথা ভাইদের কাছে বলতে নিষেধ করে বলেছিলেন: ‘…তারা তোমার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র লিপ্ত হতে পারে।’ (সূরা ইউসুফ: ৫)
এই ঘটনা থেকে ইসলামি স্কলাররা শিক্ষা দিয়েছেন যে, মানুষের হিংসা, বদনজর ও অনাকাঙ্ক্ষিত বাধা-বিপত্তি থেকে নিজের ক্যারিয়ার বা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনাগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে প্রারম্ভিক পর্যায়ে গোপনীয়তা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।