‘অহংকার’ আমাদের মানব চরিত্রের এমন এক ব্যাধি, যা মানুষের ইহকাল ও পরকাল উভয়কেই ধ্বংস করে দেয়। দাম্ভিক ও উদ্ধত মানুষকে সমাজ যেমন কখনো ভালো চোখে দেখে না, তেমনি স্বয়ং মহান আল্লাহ তাআলাও তাদের তীব্র অপছন্দ করেন।
পবিত্র কোরআনের সুরা নিসায় মহান আল্লাহ পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি কোনো দাম্ভিক বা অহংকারীকে ভালোবাসেন না। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে বিনয়ী হওয়ার তাগিদ দিয়ে সুরা ইসরা ও সুরা লোকমানেও পৃথিবীকে দম্ভভরে না চলার এবং মানুষকে অবজ্ঞা না করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি বিখ্যাত হাদিস থেকে জানা যায় যে, যার অন্তরে কণা পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতের সুবাস থেকেও বঞ্চিত হবে। অবশ্য সুন্দর পোশাক বা জুতো পরা অহংকার নয়, কারণ আল্লাহ নিজে সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন; আসল অহংকার হলো সত্যকে মেনে নিতে অস্বীকার করা এবং অন্য মানুষকে নিজের চেয়ে ছোট মনে করা।
ইসলামের মূল শিক্ষা হলো, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের অহংকার বিসর্জন দিয়ে বিনয়ী হতে পারে, আল্লাহ সমাজ ও মানুষের চোখে তার মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। পক্ষান্তরে, যে নিজেকে খুব বড় ভেবে ডানা মেলে, সে মানুষের কাছে অত্যন্ত ঘৃণিত ও ছোট হয়ে যায়। সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে বলা হয়েছে, ক্ষমাশীলতা মানুষের সম্মান বৃদ্ধি করে এবং আল্লাহর জন্য কেউ বিনীত হলে তিনি তাকে অনন্য উচ্চতায় আসীন করেন। তাই অন্তরের এই গোপন শত্রু বা অহংকার দূর করতে হলে আমাদের নিয়মিত কিছু আত্মিক অনুশীলন বা আমল করা প্রয়োজন। এর জন্য প্রথমেই নিজের ভেতরের অজস্র দুর্বলতা, অক্ষমতা ও ত্রুটিগুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে এবং যেকোনো মানুষের চেয়ে নিজেকে সব সময় ছোট মনে করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
এই আত্মিক ব্যাধি থেকে মুক্তির আরেকটি চমৎকার ও ফলপ্রসূ সামাজিক আমল হলো চেনা-অচেনা, ছোট-বড় সবাইকে নিজে এগিয়ে গিয়ে আগে সালাম দেওয়া, যা মনের ভেতরের সব গুমর ও অহংকারকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। একইসঙ্গে পরম করুণাময়ের দরবারে আকুল হয়ে এই বলে প্রার্থনা করা উচিত, যেন তিনি আমাদের পরম কৃতজ্ঞ ও ধৈর্যশীল বানান, নিজের চোখে আমাদের ছোট এবং মানুষের দৃষ্টিতে সম্মানিত ও বড় করে তোলেন।
সর্বোপরি, কেবল এই একটি মাত্র পাপ বা অহংকারের কারণে শয়তান কীভাবে চিরদিনের জন্য অভিশপ্ত ও জাহান্নামী হয়েছিল, সেই ইতিহাস বারবার স্মরণ করা উচিত। এই ভাবনাসমূহ মানুষকে ভেতর থেকে নরম করে এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে একটি সুন্দর, বিনম্র ও পুণ্যময় জীবন গড়তে সাহায্য করে।