Monday 20 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

হজের মূল শিক্ষা: ধৈর্য, আত্মসংযম ও চারিত্রিক উৎকর্ষ

সারাবাংলা ডেস্ক
২০ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৪১

হজ ইসলামের পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের অন্যতম। এটি কেবল একটি শারীরিক বা আর্থিক ইবাদত নয়, বরং মুমিনের আত্মিক ও চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধনের এক অনন্য মাধ্যম। হজের প্রতিটি বিধানের গভীরে নিহিত রয়েছে আখলাকি বা চারিত্রিক শিক্ষার অপূর্ব সমন্বয়। পবিত্র কোরআনের নির্দেশনানুসারে, এই দীর্ঘ সফরের প্রধান পাথেয় হলো ‘সবর’ বা ধৈর্য এবং গভীর আত্মসংযম।

হজের প্রস্তুতি ও পবিত্র সময়

হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা জিলহজ মাসে হলেও এর আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি শুরু হয় শাওয়াল মাস থেকেই। মূলত শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ, এই তিন মাসকে বলা হয় হজের মাস।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘হজের রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু মাস। এই মাসগুলোতে যারা নিজেদের ওপর হজ অপরিহার্য করবে, তাদের কর্তব্য অশ্লীল কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকা, সকল পাপাচার থেকে বেঁচে থাকা এবং ঝগড়া-বিবাদ না করা।’ (সুরা বাকারা: ১৯৭)

বিজ্ঞাপন

সবর: হজের মূল চালিকাশক্তি

হজ মূলত ধৈর্যের এক চরম পরীক্ষা। দীর্ঘ এই সফরে আবহাওয়া, ভিড় এবং ক্লান্তির কারণে অনেক সময় মানুষের সহ্যক্ষমতার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। এখানেই মুমিনের সার্থকতা। ইসলামি স্কলারদের মতে, সবরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘আস-সবরু আনিল মাআসি’ বা গুনাহ থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। প্রচণ্ড ভিড়ের মাঝেও মেজাজ হারানো থেকে বিরত থাকা, চারিত্রিক মাধুর্য বজায় রাখা এবং দৃষ্টির হেফাজত করার মাধ্যমেই হজের প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হয়।

কলহমুক্ত সফর ও জান্নাতের সুসংবাদ

হজ কাফেলায় অনেক সময় অব্যবস্থাপনা বা অন্যের কারণে কষ্ট হওয়ার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়। কিন্তু পবিত্র কোরআনের কঠোর নির্দেশ হলো, যতই উসকানি আসুক, ঝগড়া করা যাবে না। রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন:

‘যে ব্যক্তি ন্যায়ের ওপর থেকেও ঝগড়া ত্যাগ করে, তার জন্য জান্নাতের মাঝখানে একটি ঘর নির্মাণ করা হয়।’ (জামে তিরমিজি: ১৯৯৩)

কোরআন মজিদ যেমন বার্ধক্যে পিতা-মাতার সাথে কোমল আচরণের নির্দেশ দিয়েছে, হজের সফরের প্রতিটি কদমেও একইভাবে বিনম্র ও নম্র থাকার শিক্ষা দেয়। কারণ সামান্য ঝগড়া বা বিবাদ ইবাদতের মূল আমেজকে নষ্ট করে দিতে পারে।

পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও আল্লাহর মেহমান

হজ মূলত আল্লাহর প্রতি গভীর আনুগত্য ও সমর্পণের এক অনুপম সফর। দীর্ঘ পথের কষ্টকে ছাপিয়ে যায় স্রষ্টার সন্তুষ্টি লাভের প্রবল আকুলতা। প্রাচীনকালে মুমিনরা মাসের পর মাস দুর্গম পথ পাড়ি দিতেন কেবল মালিকের সান্নিধ্য পাওয়ার আশায়। এই নিঃশর্ত সমর্পণই একজন হাজিকে সাধারণ মুসাফির থেকে আলাদা করে ‘আল্লাহর মেহমান’ (যুয়ুফুর রহমান) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

সামর্থ্যবানদের প্রতি পবিত্র সতর্কবার্তা

যার ওপর হজ ফরজ হয়েছে, তার জন্য তা আদায় করা অপরিহার্য। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ না করার ব্যাপারে কোরআনে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:

‘যার সামর্থ্য আছে তার জন্য বায়তুল্লাহর হজ করা ফরজ। আর যে অস্বীকার করবে সে জেনে রাখুক, আল্লাহ জগতবাসী থেকে অমুখাপেক্ষী।’ (সুরা আলে ইমরান: ৯৭)

হজে মাবরুর ও অভাবনীয় পুরস্কার

সঠিকভাবে ও মাসনুন তরিকায় হজ সম্পন্নকারীর জন্য রয়েছে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন:

‘হজে মাবরুর বা কবুল হজের একমাত্র প্রতিদান হলো জান্নাত।’ (সহিহ বুখারি: ১৭৭৩)

তিনি আরও বলেছেন, ‘তোমরা বারবার হজ ও ওমরা করো। কারণ এ দুটি আমল গুনাহ ও দারিদ্র্যকে এমনভাবে দূর করে দেয়, যেমন হাপর লোহার মরিচাকে দূর করে দেয়।’ (সুনানে তিরমিজি: ৮১০)

হজ থেকে অর্জিত সবর, শৃঙ্খলা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের গুণ যদি একজন হাজি তার পরবর্তী জীবনে ধরে রাখতে পারেন, তবেই হজের প্রকৃত সার্থকতা অর্জিত হয়। এটি কেবল কয়েক দিনের সফর নয়, বরং জীবনের বাকি পথকে সুন্নাহর আলোয় আলোকিত করার এক পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর