ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্ময়কর ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি হলো ইসরা ও মেরাজ। এটি শুধু একটি অলৌকিক সফরই নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর জন্য ঈমান, ইবাদত ও ধৈর্যের এক গভীর শিক্ষার অধ্যায়।
হাদিস ও ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, হিজরতের আগে কঠিন এক সময়ে—যা ‘আমুল হুযন’ বা দুঃখের বছর নামে পরিচিত—এই মহিমান্বিত ঘটনা সংঘটিত হয়। এক রাতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে হযরত জিবরাঈল (আ.) মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে বাইতুল মুকাদ্দাসে (মসজিদুল আকসা) নিয়ে যান। এই অংশটি ‘ইসরা’ নামে পরিচিত।
এরপর শুরু হয় ‘মেরাজ’—আসমানের পথে এক অলৌকিক যাত্রা। বোরাক নামক বিশেষ বাহনে চড়ে নবীজি (সা.) আসমানের বিভিন্ন স্তরে গমন করেন এবং পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন নবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রথম আসমানে হযরত আদম (আ.), দ্বিতীয় আসমানে হযরত ঈসা (আ.) ও ইয়াহইয়া (আ.), তৃতীয় আসমানে হযরত ইউসুফ (আ.), চতুর্থ আসমানে হযরত ইদরীস (আ.), পঞ্চম আসমানে হযরত হারূন (আ.), ষষ্ঠ আসমানে হযরত মূসা (আ.) এবং সপ্তম আসমানে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়।
এরপর তিনি পৌঁছান সিদরাতুল মুনতাহা—সৃষ্টি জগতের শেষ সীমায়। সেখান থেকে আল্লাহর সান্নিধ্যে গিয়ে তিনি উম্মতের জন্য বিশেষ উপহার লাভ করেন। প্রথমে ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হলেও হযরত মূসা (আ.)-এর পরামর্শে তা কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নির্ধারণ করা হয়। তবে প্রতিটির সওয়াব রাখা হয় দশগুণ, যা ইসলামের অন্যতম রহমত হিসেবে বিবেচিত।
মেরাজের এই সফরে নবীজি (সা.) জান্নাত ও জাহান্নামের বিভিন্ন দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। তিনি দেখেন নেককারদের জন্য অফুরন্ত নেয়ামত এবং পাপীদের জন্য কঠোর শাস্তি। এই অভিজ্ঞতাগুলো মুসলমানদের জন্য সতর্কবার্তা ও প্রেরণার উৎস।
এ সফরে আরও গুরুত্বপূর্ণ তিনটি উপহার প্রদান করা হয়— পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, সূরা বাকারার শেষ আয়াতসমূহ এবং এই সুসংবাদ যে, যারা শিরক থেকে বেঁচে থাকবে, আল্লাহ তাদের গুনাহ ক্ষমা করবেন।
মেরাজ থেকে ফিরে এসে নবীজি (সা.) যখন ঘটনাটি বর্ণনা করেন, তখন মক্কার অনেকেই তা অবিশ্বাস করে উপহাস করে। কিন্তু হযরত আবু বকর (রা.) নিঃসন্দেহে তা সত্য বলে মেনে নেন। তার এই দৃঢ় বিশ্বাসের জন্যই তিনি ‘সিদ্দিক’ উপাধিতে ভূষিত হন।
মেরাজ শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি মুসলিম জীবনের জন্য একটি দিকনির্দেশনা। নামাজের গুরুত্ব, আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস এবং কঠিন সময়েও ধৈর্য ধারণের শিক্ষা— সবকিছুই এই এক রাতের সফরের মধ্যেই নিহিত।