পবিত্র হজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কেন্দ্রীয় অনুষঙ্গ হলো আরাফাতের ময়দানে অবস্থান। হজের পুরো কার্যক্রমের মধ্যে এটিকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন— ‘হজই হলো আরাফা।’ অর্থাৎ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান ছাড়া হজ পূর্ণতা লাভ করে না।
ইসলামি ক্যালেন্ডারের শেষ মাস জিলহজ-এর ৯ তারিখ পালিত হয় পবিত্র আরাফাতের দিন। এ দিন বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আগত লাখো হজযাত্রী সৌদি আরবের মক্কা নগরীর অদূরে অবস্থিত আরাফাতের বিশাল প্রান্তরে সমবেত হন। মক্কা থেকে প্রায় ১৩–১৪ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক ময়দানটি জাবাল আর-রহমাহ বা ‘রহমতের পাহাড়’-এর পাদদেশে বিস্তৃত।
ভৌগোলিকভাবে আরাফাতের ময়দান প্রায় দুই কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও দুই কিলোমিটার প্রস্থজুড়ে বিস্তৃত। তিন দিক থেকে পাহাড়বেষ্টিত এই প্রান্তরের দক্ষিণ পাশে রয়েছে মক্কা–হাদা–তায়েফ রিং রোড এবং আবেদি উপত্যকার দিকে অবস্থিত উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়। উত্তরে রয়েছে সাদ পাহাড়। প্রতিবছর হজ মৌসুমে এই বিশাল প্রান্তর লাখো মুসল্লির ইবাদত ও দোয়ায় মুখর হয়ে ওঠে।
‘আরাফাত’ শব্দটি আরবি ‘আরাফা’ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘চেনা’, ‘জানা’ বা ‘পরিচয় লাভ করা’। এই নামকরণকে ঘিরে ইসলামের ইতিহাসে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মত পাওয়া যায়।
প্রথম মতে, ইব্রাহিম (আ.) যখন হজের বিধিবিধান শিখছিলেন, তখন ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) তাকে এই ময়দানে বিভিন্ন শিক্ষা দেন। তখন তিনি বলেন, ‘আরাফতু’—অর্থাৎ ‘আমি বুঝেছি।’ সেখান থেকেই এ স্থানের নাম হয় আরাফাত।
দ্বিতীয় মতে, হজযাত্রীরা এখানে এসে নিজেদের গুনাহ স্বীকার করেন এবং মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তাই এই স্থানকে আত্মসমালোচনা ও ক্ষমা প্রার্থনার এক অনন্য ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আরেকটি ঐতিহাসিক বর্ণনায় বলা হয়, আদম (আ.) এবং হাওয়া (আ.) জান্নাত থেকে পৃথিবীতে অবতরণের পর দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর এই আরাফাতের ময়দানেই পুনরায় মিলিত হন। এখানেই তারা একে অপরকে চিনতে পারেন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
হিজরি ১০ সালে বিদায় হজের সময় এই আরাফাতের ময়দানেই মানবজাতির উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন নবী মুহাম্মদ (সা.)। সেই ভাষণে তিনি মানবতার মর্যাদা, নারীর অধিকার, ন্যায়বিচার ও মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের বার্তা তুলে ধরেন। এ সময় কোরআনের গুরুত্বপূর্ণ আয়াত— ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম’— নাজিল হওয়ার ঘটনাও ইসলামের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
সুতরাং আরাফাত কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়; এটি ইসলামের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক। প্রতি বছর হজের সময় এখানে সমবেত হয়ে লাখো মুসলমান মানবতা, ক্ষমা এবং ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত বিশ্বের সামনে তুলে ধরেন।