ফরিদপুর: কারও কাছে ‘লায়লা বাউল’, কেউবা ডাকে ‘লায়লা বু’। বেশভুষায় সাদাসিদে, পাগল এক নারী। কিন্তু যাদের কাছে তিনি পরিচিত, তাদের গান শুনিয়ে আনন্দ পান এই শিল্পী। ফরিদপুর শহরের সবার কাছে তিনি ‘লায়লা বানু’ নামেই পরিচিত। একজন সংসারত্যাগী ভবঘুরে মানুষ লায়লা। শহরের এ-প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত, রেল স্টেশন, বাস স্টেশন, হাটবাজার ও শ্মশান ঘাট- এমন যেসব জায়গাতে লোকসমাগম বেশি সেখানে ঘুরে বেড়ান ও গান পরিবেশন করেন তিনি।
ফরিদপুরের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নজরুল গীতি গেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তিনি ভাইরাল হয়েছেন। শনিবার (২৪ মে) বিকেলে শহরের ময়েজ মঞ্জিলে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদ। অনুষ্ঠানে খালি গলায় নজরুল গীতি পরিবেশন করে রাতারাতি নেট দুনিয়ায় ভাইরাল ‘লায়লা বাউল’।
স্থানীয় ফটোগ্রাফার অপূর্ব অসীম অপু অনুষ্ঠানে লায়লা বাউলের গাওয়া গান ভিডিও করে আপলোড করেন তার নিজস্ব ফেসবুক ও ইউটিউবে। তিনি বলেন, ‘পথে-ঘাটে যখনই লায়লা বাউলকে পাই ওর একটা গান আমি রেকর্ড করে আপলোড করি। ছয় বছর আগে অল্প দিনের ব্যবধানে লায়লা বাউলের ১০-১২টি গান আমি আপলোড করি। তখন বেশ ভিউ পেয়েছিল সেগুলো। ছয় বছর পর আবার নজরুল জন্মজয়ন্তীতে লায়লা বাউল খালি গলায় গান গেয়ে ভাইরাল হলো। আমি যতদূর জানি তার নিজস্ব কোনো ঠিকানা নেই। চাইলেই লায়লা বাউলকে খুঁজে পাওয়া যায় না। অনেকে তাকে না বুঝে পাগল বলে। আসলে লায়লা লালন ভক্ত একজন বাউল। তিনি সাধু সঙ্গে চলতে পছন্দ করেন।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বোহেমিয়ান স্বাধীনচেতা লায়লা বাউলের বিচরণ ক্ষেত্র একসময় ছিল ফরিদপুর শহরের রথখোলা এলাকা। কৈশরে তার বিয়ে হয়েছিল ওই এলাকায়। সোমবার (২৪ মে) সন্ধায় সরেজমিনে রথখোলা এলাকায় গিয়ে ওই এলাকার বেশ কয়েকজন মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লায়লার বর্তমান বয়স প্রায় ৭০ বছর। হারিয়ে যাওয়া বা কুড়িয়ে পাওয়া কিশোরী লায়লা ওই এলাকার দিলীপের মা (কালি) নামে পরিচিত এক নারীর সান্নিধ্যে যাওয়ার পর তাকে ‘মা’ ডাকেন। কৈশরে কালি তাকে বিয়ে দিয়েছিলেন ইসলাম শেখ নামের একজন কসাইয়ের সঙ্গে। নয় বছর আগে সেই ইসলাম শেখ মারা গেছেন।
লায়লার দুই ছেলে, দুই মেয়ে। দুই ছেলে আবুত মনা ও টুটুল শেখ বর্তমানে ফরিদপুর শহরতলীর হাড়োকান্দি এলাকায় জলিল মিয়ার মসজিদের পাশে থাকেন। তারা দু’জনই পেশায় কসাই। টুটুল শেখ সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘মা গান পাগল মানুষ, মাঝে মাঝে কোথায় চলে যায়, আবার ফিরে আসে। যাওয়ার সময় আমাদের বলে যায় না। কিন্তু, একাই আবার ফিরে আসে। বিভিন্ন বাউল আসর ও গানের অনুষ্ঠানে সে ঘুরে বেড়ায়, আর নিজে গান গায়। তার কোনো মোবাইল নেই। গান গাওয়াই তার একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান। চাইলেই আমরা তাকে আটকে রাখতে পারি না। এজন্য আমরা তাকে ছেড়ে দিয়েছি। স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়িয়ে, গান গেয়ে যদি সে ভালো থাকে, তাহলে সেভাবেই থাক। তাকে আটকে রাখতে চাইলে সে কষ্ট পায়।’
স্থানীয়রা জানান, ছোটবেলা থেকেই গান গায় লায়লা। নিজে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইতে পারে। নজরুল, লালন এমনকি হিন্দি-উর্দুসহ বিভিন্ন দেশের গান সে গাইতে পারে। গান গেয়ে সে কোনো টাকা চায় না। যদি কেউ খুশি হয়ে কিছু দেয়, সেটাই নেয়।
সন্তানরা বড় হয়ে গেছে। সংসার হয়েছে তাদের। কিন্তু লায়লা বাউল সংসারে ফেরেননি। কথিত আছে, কোনো ভিসা-পাসপোর্ট ছাড়াই তিনি পায়ে হেঁটে প্রায়ই চলে যান আজমীর শরিফে। এভাবে তিনি প্রায় বিশ বছর ধরে শহরের বিভিন্ন স্থানে খালি পায়ে হেঁটে হেঁটে লোকো গানসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন নামকরা শিল্পীর গান গেয়ে চলছেন।
শনিবার সন্ধায় নজরুল জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাকে মঞ্চে গান গাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। অন্যান্য শিল্পীর মাঝে তার একটি নজরুল গীতি দর্শকদের মুগ্ধ করে। অনুষ্ঠানে দেখা যায়, পরনে জীর্ণ শাড়ি, খালি পা। তিনি মাইক ধরে মনের আনন্দে সাবলীলভাবে খালি গলায় গাইছেন কাজী নজরুল ইসলামের ‘নয়নভরা জল গো তোমার…।’ তার গায়কি ও কণ্ঠে মুগ্ধ দেশের নামি-দামি শিল্পী ও সুধীজনরা। এর পর অনেকেই তার পোস্টটি শেয়ার করে লিখছেন নানা মুগ্ধতার কথা।
ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মফিজ ইমাম মিলন সারাবাংলাকে বলেন, ‘আরও ২০ বছর আগে লায়লার গান শুনে আমি মুগ্ধও হয়েছিলাম। শিল্পকলা একাডেমিতে যেখানে গানের চর্চা হতো, সেখানে চুপচাপ বসে থাকতে দেখতাম।’ তিনি আরও বলেন, ‘লায়লাকে ঘুরে বেড়াতে দেখে প্রশ্ন করা হলে বলতো- আমি মানুষ দেখি, দুনিয়াতে কত রকমের মানুষ। এত মানুষ, কারও সঙ্গে কারও মিল নাই। মানুষ দেখতে আমার ভাল্লাগে।’