ঢাকা: বৈশ্বিক জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সংকট এবং আমদানিনির্ভরতার চাপে বাংলাদেশের অর্থনীতি ‘এনার্জি ট্র্যাপ’ বা জ্বালানি ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
শনিবার(২মে) পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত এক ওয়েবিনারে এ আশঙ্কা তুলে ধরা হয়।
ওয়েবিনারে আলোচকরা বলেন, জ্বালানি সরবরাহে সীমাবদ্ধতা, চাহিদা-নির্ভর প্রতিক্রিয়া এবং তথ্যের ঘাটতির কারণে সংকট আরও তীব্র হয়েছে। শুরুতে কিছু ত্রুটি দ্রুত প্যানিক বায়িংয়ে রূপ নেয়, ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে জ্বালানির চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। রেশনিংসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
সাবেক জ্বালানি সচিব একেএম জাফর উল্লাহ খান বলেন, দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে বর্তমান সংকট প্রকট হয়েছে। দেশের জ্বালানি মজুত সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে স্টোরেজ সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
কৃষিখাতে জ্বালানির বাড়তি চাহিদার বিষয়টি তুলে ধরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এ. সত্তার মন্ডল বলেন, কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ায় ডিজেলের ওপর নির্ভরতা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৪২ লাখ ডিজেলচালিত ইঞ্জিন ব্যবহৃত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এই সংখ্যা আরও বাড়বে।
ট্রেড সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহমুদুল হক জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম সামান্য বাড়লেও দেশের আমদানি ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তিনি বিকল্প উৎস খোঁজার পাশাপাশি সরবরাহ উৎস বহুমুখীকরণের পরামর্শ দেন।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম পারভেজ বলেন, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা জ্বালানি সরবরাহকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। তাই স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত নীতি গ্রহণের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গ্যাসভিত্তিক শিল্প উৎপাদন সচল রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারের ওপর জোর দেন। তিনি জানান, সরকার ইতোমধ্যে ১৪০টি গ্যাস কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে, যা ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভরতা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
ওয়েবিনারের আলোচনায় আরও উঠে আসে, চাহিদা ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি জোরদারের মাধ্যমে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও বিভিন্ন স্থানে জ্বালানির অসম বণ্টন এবং অতিরঞ্জিত তথ্যপ্রবাহ জনমনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সমাপনী বক্তব্যে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের পাশাপাশি মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি স্পষ্ট। সমন্বিত নীতি ও কার্যকর বাস্তবায়ন ছাড়া এ সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসতে পারে। তিনি সংকটকালে সঠিক তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।