খাদ্য গ্রহণ ও মতপ্রকাশ করা মানুষের জন্মগত অধিকার। মানুষ আছে মানেই তার ক্ষুধা লাগবে এবং খাদ্য গ্রহণ করবে। আবার মানুষ মাত্রই মনের ভাব তথা চিন্তা-চেতনা প্রকাশ করতে চাইবে। এটা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না এবং নিয়ন্ত্রণ করা উচিতও না। কিন্তু মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানে এই নয় যে, কারও বক্তব্য পছন্দ না হলে সংঘবদ্ধভাবে তার বিরুদ্ধে অপতথ্য ছড়িয়ে তার চরিত্র হনন করতে হবে। এটা মত প্রকাশ না, বরং এক প্রকার তথ্য সন্ত্রাস। এই তথ্য সন্ত্রাস থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।
পাশাপাশি সরকারের কোনো কাজ কিংবা পদক্ষেপ জনবিরোধী কিংবা দেশবিরোধী হলে অবশ্যই সমালোচনা করার সুযোগ থাকতে হবে। অন্যথায় সরকার স্বৈরাচারি হয়ে উঠবে। ফলে বিরোধীদল তথা ভিন্ন মত অবলম্বনকারীদের সমালোচনা করার অধিকার থাকতে হবে। কারণ, মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা যেমন অপরিহার্য, তেমনি বাকস্বাধীনতারও একটা সীমাও রয়েছে। এই স্বাধীনতা প্রচলিত আইন, সংস্কৃতি, ধর্ম, সামজিক রীতিনীতি দ্বারা সীমাবদ্ধ। নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকে সেদেশের আইন মেনে চলার বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ। এর বাইরে নাগরিকের কিছু দায়িত্ব কর্তব্য থাকে, সেগুলো পালনে অলিখিতখভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। অর্থ্যাৎ, মত প্রকাশে আমি ওই পর্যন্ত স্বাধীন যা অন্যের ক্ষতির কারণ না হয়ে যায়।
এই সেস্যাল মিডিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও একটা বিপজ্জনক দিক লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা হলো কারও বক্তব্য পছন্দ না হলেই সংঘবদ্ধভাবে তার বিরুদ্ধে অপতথ্য ছড়িয়ে চরিত্র হনন যেন দিন দিন বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা কিন্তু তা নয়। রাজনীতিতে মতের ভিন্নতা থাকবে, নানা ইস্যুতে তর্কবিতর্ক হবে। জনগণ যেটা যৌক্তিক সেটা গ্রহণ করবে। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু সাম্প্রতিক দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, কিংবা সদ্য সাবেক প্রধান উপদেষ্টাকে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিয়ে যেভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার করা হচ্ছে, তা গণতন্ত্র ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একইসঙ্গে কোনো কোনো রাজনীতিক ও অনেক নাগরিক মত প্রকাশের নামে ভিন্নমত ও দলের বিরুদ্ধে যেভাবে অশ্লীল গালাগালি করছেন তাও কোনোভাবেই কাম্য নয়। এক্ষেত্রে আমাদের আরও সহনশীল হতে হবে। আবার মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানে এই না যে, আমার যাকে মন চাই তাকে বিনা কারণে গালিগালাজ করর। কিংবা কাউকে ভালো লাগছে না, সুতরাং তাকে নিয়ে কোনো যাচাই-বাচাই না করে নিজের ইচ্ছামতো ভুল তথ্য দিয়ে তাকে হেয় প্রতিপন্ন করব- বিষয়টি কিন্তু ঠিক হবে না।
এ প্রসঙ্গে একটা পুরানো গল্প মনে পড়ছে। গল্পটা এখনো বেশ প্রাসঙ্গিক। গল্পটা ষাটের দশকে পাকিস্তান ও ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে। সীমান্তে দুই দেশের কুকুরের মধ্যে কথা হচ্ছিল। ভারতের কুকুর রুগ্ন, আর পাকিস্তানের কুকুর মোটাতাজা। ভারতের কুকুর পাকিস্তানের কুকুরকে বলছে, ‘তুমি কত নাদুসনুদুস, আর দেখ আমি কতো রুগ্ন। আমার ঘেউ ঘেউ করার স্বাধীনতা আছে, কিন্তু পেটে খবার নাই।’ পাকিস্তানের কুকুর বলছে, ‘আমার সমস্যা অন্য জায়গায়, আমার পেটে খাবার আছে তবে আমি মন খুলে কথা বলতে পারি না। আমার দরকার ঘেউ ঘেউ করার স্বাধীনতা।’ এই গল্প থেকে এটা পরিষ্কার যে, খাদ্য ও মতপ্রকাশের অধিকার মানুষের জন্মগত অধিকার। মানুষ আছে মানেই তার ক্ষুধা লাগবে এবং সে তার মনের ভাব প্রকাশ করতে চাইবে। তবে সেটা যেন গঠনমূলক হয়।
বিগত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, আমাদের মিড়িয়া স্বেচ্ছায় সরকারের প্রচারযন্ত্রে পরিণত হয়েছে, সংবাদকর্মীরা দলীয় কর্মীরও নিচে নিজেদের নামিয়ে ফেলেছেন। এটা কেবল আমাদের দেশের সমস্যা নয়, ভারতের মতো দেশেও মেইন স্ট্রিম মিডিয়া মোদি সরকারের প্রচারযন্ত্রে পরিণত হয়েছে। যে কারণে সে দেশের মিডিয়াকে গদিমিডিয়া বলা হয়ে থাকে। স্বৈরশাসকের প্রচারযন্ত্রে নামিয়ে আনার কারণে মিডিয়াগুলো কীভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে তা আমরা দেখেছি। মিডিয়াগুলোর এমন অবস্থানের সময় স্যোশাল মিডিয়া জনমত তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় চলে আসে। এই মিডিয়ার শক্তি কতটুকু তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিগত সময়ে এই স্যোশাল মিডিয়ায় মত প্রকাশ নিয়ন্ত্রণের বা দমন-পীড়নের কথা কারও অজানা নয়। এক সময় পর্যন্ত পত্রিকায় নিয়মিতভাবে রাজনীতিকদের নিয়ে কার্টুন আঁকা হতো, ওই কার্টুনগুলো তথ্য প্রকাশের এক ভিন্ন মাত্রা তৈরি করে। এগুলো নিয়ে কেউ আপত্তি করত না, বরং এর শিল্পীত দিক সবাই উপভোগ করতো। সেই কার্টুন আঁকাকে নিয়ে একজন শিল্পীকে রিমান্ডে নিয়ে কি ধরনের নির্যাতন করা হয়েছে তা ভুলে যাওয়ার নয়।
এই স্যোশাল মিডিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও একটা বিপজ্জনক দিক লক্ষ্য করা যাচ্ছে মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে। কারও বক্তব্য পছন্দ না হলেই সংঘবদ্ধভাবে তার বিরুদ্ধে অপতথ্য ছড়িয়ে তার চরিত্র হনন বিপজ্জনক বিষয় হয়ে উঠেছে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, যে রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দাবিতে রাজপথে ছিল তারাই এখন যুক্তি-তর্কেও পরিবর্তে দলীয় কর্মীদের নিয়েজিত করছে প্রতিপক্ষের চরিত্র হননের জন্য।
স্যোশাল মিডিয়ায় ইদানিং ব্যাপকহারে একটা বিষয় দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন মন্ত্রী, এমপির নামে ফটোকার্ড তৈরি করে বিভিন্ন আইডি থেকে ভুয়া নিউজ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, নিউজ লিংক কমেন্টে দেওয়া হয়েছে। বাস্তবে কমেন্টে কোনো নিউজ নেই। এটা যে একটা ভুয়া তথ্য তা বুঝে ওঠার আগেই ছড়িয়ে পড়ছে হাজারে হাজারে।
ফলে কোনটা তথ্য, কোনটা অপতথ্য, কোনটা ব্যক্তিচরিত্র হননের কাজ, কোনটা নোংরামি এই পার্থক্য করতে পারা ও তা মেনে চলা নাগরিকের দায়িত্ব কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। এইগুলোর অপপ্রয়োগে কী ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে সে বিষয়েও একজন নাগরিকের জানা থাকা জরুরি। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের জানা ও মান্য করা আরও বেশি জরুরি।
বিগত সময়ে ভিন্নমত দমনে যে নিষ্ঠুর আচরণ হয়েছিল তার পুনরাবিৃত্তি যেমন কাম্য নয়, তেমনি ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে মতপ্রকাশের চর্চার সুস্থ পরিবেশ নষ্ট, নোংরামি ও চরিত্র হরণের মতো ঘটনাকে প্রশ্রয় দেওয়াও কাম্য হতে পারে না। মত প্রকাশের সুস্থ পরিবেশ তৈরিতে সরকারের যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি অপপ্রচার, অপতথ্য, চরিত্রহননকারীদের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নিতে হবে। এক্ষেত্রে যেকোনো ধরণের দুর্বলতা প্রকাশ গণতন্ত্রের জন্যই হুমকি হয়ে উঠবে।