ঢাকা: গত ১৬ মার্চ শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ২০২৭ সাল থেকে স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতি প্রত্যাহার করে ফের ভর্তি পরীক্ষা চালু করা হবে। তার এই সিদ্ধান্তের পর সারাদেশে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে প্রাইমারি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তিতে লটারির পরিবর্তে পরীক্ষা নেওয়াটা কতটা যুক্তিসঙ্গত হবে তা নিয়ে চলছে ব্যাপক সমালোচনা। অনেকেই মনে করছেন, ভর্তি পরীক্ষা পুনরায় চালু করা হলে কোমলমতি শিশুদের ওপর মানসিক নির্যাতন বেড়ে যাবে। বিভিন্ন ক্লাসে ভর্তি পরীক্ষার অংশ নিতে অভিভাবকদের ওপর বেড়ে যাবে মানসিক ও আর্থিক চাপ। এই সুযোগে মেধা যাচাইয়ের আড়ালে শুরু হবে কোচিং ও ভর্তি বাণিজ্য। ফলে অভিভাবকদের গুনতে হবে বাড়তি খরচের বোঝা।
ক্লাস ওয়ানে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে একটি গল্প শুনেছিলাম পরিচিত এক স্কুল শিক্ষিকার কাছে, গল্পটি অনেকটা এই রকম। ‘মীম ক্লাস ওয়ানে পড়ে। জীবনের প্রথম পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে লিখা শুরু না করে বেঞ্চে বসে খেলা শুরু করছে। সব প্রশ্নের উত্তর মীমের জানার পরও সে কিছুই লিখছে না। বরং বসে বসে খেলা করছে। শিক্ষিকা সাবিনা ইয়াসমিন বিষয়টি খেয়াল করে, শিশুটি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি লিখছো না কেন? জবাবে মীম বলল, আমার লিখতে ইচ্ছে করছে না। তখন শিক্ষিকা বললেন, না লিখলে তুমিতো পরীক্ষায় নাম্বার পাবে না। জবাবে মীমের শিশুসুলভ উত্তর, আমার নাম্বার লাগবে না। এবার শিক্ষিকা বললেন, না লিখলে সবাই পরীক্ষায় তোমার চেয়ে বেশি নাম্বার পেয়ে যাবে। এবার মীম বলল, আমি লোভী না, আমার বেশি নাম্বার লাগবে না।’ এই হলো ক্লাস ওয়ানের শিক্ষার্থীর পরীক্ষা দেওয়ার একটি ঘটনা।
ইংরেজিতে ‘Morning shows the day’ এরকম একটি প্রবাদ আছে। যার মানে হচ্ছে, ‘দিনের শুরুটাই বলে দেয় দিনটা কেমন যাবে।’ বিএনপির তাদের নির্বাচনি ওয়াদায় বলেছিল, সরকার গঠন করলে ধসেপড়া শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারে উদ্যোগ নেবে এবং এ বিষয়ে তাদের পরিকল্পনাও রয়েছে। এই অবস্থায় শিক্ষার বিষয়ে বিএনপি প্রথম যে সিদ্ধান্তটা নিল, তা নিয়ে শুরুতেই কিছুটা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই মত প্রকাশ করছেন, লটারির পরিবর্তে তড়িঘড়ি করে ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্তের ফলে জনগণ তথা অভিভাবকরা ক্ষতিগ্রস্থ হবেন। পাশাপাশি বাড়বে শিশুর মানসিক নির্যাতন, আর লাভবান হবে কোচিং সেন্টার এবং দেশের নামিদামি স্কুলের কতিপয় শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির লোকজন।
হঠাৎ করে ১৫ বছর পর কেনইবা লটারি পদ্ধতি প্রত্যাহার করে ভর্তি পরীক্ষার চালুর মতো সিদ্ধান্ত এলো। জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে (১৫ মার্চ, রোববার) কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ শিক্ষামন্ত্রীকে স্কুলে ভর্তিতে লটারি পদ্ধতি রাখা নিয়ে প্রশ্ন করেন। তিনি বলেন, ‘প্রাইমারি স্কুলে বাচ্চাদের ভর্তি করানোর ক্ষেত্রে আমরা কি ভর্তির প্রক্রিয়াটি পরিবর্তন করব?’ এডমিশন বাই লটারির মাধ্যমেই রেখে মেধাকে সবসময় দমিয়ে রাখা হবে কি না- সেটা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার এই প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘লটারি পদ্ধতি কতটা যৌক্তিক সে বিষয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন রয়েছে। তাই আগামী বছর ভর্তি পদ্ধতি নিয়ে অভিভাবকসহ সংশিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে সেমিনার ও আলোচনার মাধ্যমে মতামত নেওয়া হবে। সব পক্ষের মতামত ও জনমত বিবেচনায় নিয়ে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে স্কুল ভর্তি পদ্ধতি কেমন হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
কিন্তু কোনো পক্ষের কোনো মতামত না নিয়ে তড়িঘড়ি করে পর দিন ১৬ মার্চ বিকেলে সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী জানান যে, স্কুলে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এখন থেকে শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য আবারও পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করা হবে। আবার ওইদিনই রাজধানীর একটি হোটেলে ‘নির্বাচনি ইশতিহারের আলোকে আগামী দিনের শিক্ষাখাত’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতি বাদ দিয়ে আবার পরীক্ষার দিকে যেতে চায়।’ এর থেকে বিষয়টা পরিষ্কার যে, সরকার হয়তো আগে থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে, সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর দৃষ্টি আকর্ষণটা ছিল একটি উছিলামাত্র।
এবার আসা যাক ভর্তি পরীক্ষার বিষয়ে। বিশেষ করে প্রাথমিকে ভর্তি পরীক্ষার বিরোধিতার দুটো দিক আছে। প্রথম কথা হচ্ছে, একটি শিশু যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তে যাবে, তখন সে একটা সাদা কাগজ, তার পরীক্ষা কেন নেওয়া হবে? সে কি পরীক্ষা দেবে? তাকে তো পড়ানোই হয়নি, না পড়িয়ে তার পরীক্ষা নেবে কেন? যে প্রতিষ্ঠান তাকে কোনো কিছু পড়ায়নি সে প্রতিষ্ঠান তার পরীক্ষা নেবে কেন? সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রশ্ন তুলেছেন, ‘মেধাকে দমিয়ে রাখা হবে কিনা?’ যা ছিল একেবারেই অপ্রসাঙ্গিক প্রশ্ন। আর এই সমস্যাটা সারা দেশের সমস্যা নয়। দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুরা লটারির মাধ্যমে ভর্তি হয় না। এটা কেবল শহরগুলোতে, বিশেষ করে ঢাকা শহরের সমস্যা। ঢাকা শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম নয়, তবে কিছু প্রতিষ্ঠান নামি দামি হিসেবে পরিচিত। অভিভাবকরা ওইসব প্রতিষ্ঠানে তাদের সন্তানকে ভর্তি করাতে চান। তাদের অনেকের ধারণা, এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে তার সন্তান ভর্তি করানো না গেলে তার ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
নানা টানাপোড়নে থাকা অভিভাবকরা এইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্তানকে ভর্তি করানোর মাধ্যমে নিজেরা কিছুটা সন্তুষ্টি অর্জন করে। এর ফলে শুরু হয়ে যায় কোমলমতি শিশুকে ভর্তি পরীক্ষায় কৃতকার্য করতে বহুমুখী তৎপরতা, বাসায় মাস্টার রেখে পড়ানো, কোচিংয়ে ছুটাছুটি; যেগুলোকে এক কথায় নির্যাতন বলা যেতে পারে। এর বাইরে থাকে প্রশ্ন আউট কিংবা, স্থানীয় এমপি, নেতা বা ক্ষমতাবানদের ধরাধরির বিষয় এবং ভর্তিবাণিজ্য। এই যুদ্ধটা শেষ পর্যন্ত বাচ্চাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে অভিভাবকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। বিগত সময়ে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল ও কলেজে ভর্তি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ স্থানীয় এমপির বিরুদ্ধে উঠেছিল। এটা হচ্ছে বাস্তবতা।
ভর্তি বাণিজ্যের ব্যাপক অভিযোগের কারণে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ভর্তিতে পরীক্ষার পরিবর্তে লটারি সিস্টেম চালু করেছিল। এখন দরকার এই লটারি সিস্টেমও উঠিয়ে দিয়ে ক্যাসমেন্ট এরিয়ার ভিত্তিতে ছাত্রদের ভর্তি কারনো এবং সবগুলো স্কুলকে একটা মানে নিয়ে আসা। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আওয়ামী লীগের বিগত ১৫/১৬ বছরের শাসনামলে ক্ষতিগ্রস্ত সেক্টরগুলোর শীর্ষে রয়েছে শিক্ষা খাত। পরীক্ষা নীরিক্ষা করতে করতে এই সেক্টরকে মটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। তাদের পরীক্ষা নীরিক্ষার কারণে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের কি ধরনের দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তা কেবল ভুক্তভুগীরাই ভালো জানেন। পিএসসি ও জেএসসির কথ স্মরণ করলে এখনো আৎকে উঠতে হয়। এর মাধ্যমে যে কাজটা হয়েছে, তা হচ্ছে কোয়লিটি এডুকেশন ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি জেনারেশন দেশে বেড়ে উঠেছে ন্যূনতম কোয়ালিটি শিক্ষা ছাড়াই।
কঠিন হলেও এরকম ধ্বংসপ্রাপ্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে গড়ে তোলা বিএনপির সরকারের অন্যতম দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। বিএনপি বরাবরই বলে এসেছে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারে তাদের পরিকল্পনা আছে, যার মূলে থাকবে কোয়ালিটি এডুকেশন এবং স্কিল তৈরি করা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা করেছেন যে, আগামী দেড় বছরে এক কোটি তরুণের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন। এই কাজটা সফল করতে গেলে শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। মোট কথা শিক্ষায় বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তন বিএনপি করবে এবং এ সংক্রান্ত তাদের সুনির্দিষ্ট হোমওয়ার্ক আছে- এমন ধারণা তৈরি হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী এ দায়িত্ব পাওয়ার পর যেসব কথাবার্তা বলছেন, তাতে হোঁচট খেতে হচ্ছে। তিনি বারবার আলোচনা একটা জায়গায় এনে দাঁড় করাচ্ছেন, সেটা হচ্ছে- পরীক্ষায় নকল বন্ধ করা। একটা সময় নকল বন্ধে তার ভূমিকা ছিল এটা সত্য। তার কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে এখন শিক্ষাব্যবস্থার মূল সমস্যা নকল। বাস্তবে এখন নকল মূল সমস্যা না। মূল সমস্যা শিক্ষা খাতে বাণিজ্যকরণ, আর সেটা বন্ধ করতে হবে। তা না করে বরং লটারির পদ্ধতি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি এই মুহূর্তে জরুরি ছিল না। বরং শিক্ষামন্ত্রীর উচিত ছিল এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শিক্ষাবিদ বা অভিভাবকদের সঙ্গে না হলেও দলীয় মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে মতবিনিময় করা। ধসেপড়া শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারে বিএনপির কী পরিকল্পনা রয়েছে তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে উল্লিখিত সিদ্ধান্ত থেকে আশাবাদী হওয়ার কোনো কারণ দেখা যাচ্ছে না। শিক্ষাখাতে নতুন করে দীপু মণিদের উত্থান ঘটুক তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা চাই এই সিদ্ধান্ত দ্রুত পরিবর্তন করে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেবে সরকার।
২০১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় (যেসব বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি রয়েছে) প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি চালু করা হয়। পরের বছর বেসরকারি বিদ্যালয়েও একই পদ্ধতি চালু হয়। তবে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি তখনো পরীক্ষার মাধ্যমেই হতো। পরবর্তী সময়ে করোনা সংক্রমণের কারণে ২০২১ শিক্ষাবর্ষে সব শ্রেণিতেই লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত একই পদ্ধতিতে ভর্তি কার্যক্রম চলছে।