Tuesday 14 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ফ্যামিলি কার্ড: নারীর ক্ষমতায়নের যুগান্তকারী হাতিয়ার

মো. আসিফ হাসান রাজু
১৪ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৫৬

বাংলাদেশ গত দুই দশকে দারিদ্র্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও বাস্তবতা এখনো পুরোপুরি আশাব্যঞ্জক নয়। সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে এখনো প্রায় ১৮ থেকে ১৯ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে এবং ৫ থেকে ৬ শতাংশ মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে। একই সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিও উদ্বেগজনক, যেখানে প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে পড়ার সম্ভাবনায় রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সদ্য দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি সরকার স্বল্প সময়ের মধ্যেই ফ্যামিলি কার্ড নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে এবং ইতোমধ্যে এ কার্ড স্বল্প পরিসরে বিতরণও করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে আগামী ৪ বছরে ধীরে ধীরে এ প্রকল্পের অধীনে ৪ কোটি নারী এই কার্ড পাবেন। পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া এ প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি কার্ডধারীকে মাসিক ২,৫০০ টাকা নগদ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং অন্য একটি গোষ্ঠী সমপরিমাণ খাদ্য সহায়তা পাচ্ছে। নতুন সরকারের এই সূচনা একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, কেননা ফ্যামিলি কার্ডকে কেবল প্রশাসনিক উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এই কার্ডকে সামাজিক নিরাপত্তা, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা এবং নারীর ক্ষমতায়নের একটি সমন্বিত রূপ হিসেবে তুলে ধরা যেতে পারে। বিশেষ করে পরিবারের নারী সদস্যের নামে কার্ড প্রদানের সিদ্ধান্ত এই উদ্যোগকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। যদিও বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ইতিহাস দীর্ঘদিনের। যেখানে, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, ভিজিএফ কিংবা খাদ্য সহায়তার মতো বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া হয়ে আসছে। তবে এসব কর্মসূচি অনেকাংশে বিচ্ছিন্ন ও খণ্ডিত হওয়ায় সমন্বয়ের অভাব দেখা যায়, যার ফলে প্রকৃত উপকারভোগীরা অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। ফ্যামিলি কার্ড এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে একটি পরিবারভিত্তিক সমন্বিত নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করতে পারে। এই উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিবারকে একটি একক ইউনিট হিসেবে বিবেচনা করা। খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদাকে একটি প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার মাধ্যমে একটি পরিবার একই ব্যবস্থার আওতায় বহুমুখী সহায়তা পেতে পারে। ফলে পূর্বের বিচ্ছিন্ন সহায়তা কাঠামোর তুলনায় এটি অধিক কার্যকর ও টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

বিজ্ঞাপন

নৃবিজ্ঞানের সামাজিক লিঙ্গ কাঠামো তত্ত্ব অনুযায়ী, সমাজে নারী ও পুরুষের ভূমিকা সামাজিকভাবে নির্ধারিত হয়। এই কাঠামো সাধারণত নারীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র থেকে দূরে রাখে। ফ্যামিলি কার্ড সেই কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করে নারীর জন্য একটি নতুন অবস্থান তৈরি করতে পারে, যেখানে তিনি পরিবারের সম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হন। এর মাধ্যমে নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভূমিকার পুনর্গঠন সম্ভব।

প্রচলিত ভাতা কর্মসূচির তুলনায় ফ্যামিলি কার্ডের একটি মৌলিক পার্থক্য হলো সহায়তা সরাসরি পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক নারী সদস্যের হাতে প্রদান করা। গবেষণা বলছে, পরিবারের সম্পদের ওপর যার নিয়ন্ত্রণ বেশি, তার দরকষাকষির ক্ষমতাও তত বেশি। এই বাস্তবতায় ফ্যামিলি কার্ড নারীর হাতে সম্পদের নিয়ন্ত্রণ তুলে দিয়ে তার পারিবারিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে। ফলে এটি নারীর বাস্তব স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়নের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে। এই কর্মসূচির একটি রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ জনগণের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে যে দূরত্ব নিয়ে সমালোচনা রয়েছে, এই উদ্যোগ সেই ব্যবধান কমানোর একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে, ফ্যামিলি কার্ডের সাফল্য নির্ভর করবে এর সুষ্ঠু বাস্তবায়নের ওপর। উপকারভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করা এবং দুর্নীতি ও অপব্যবহার রোধে কার্যকর নজরদারি অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি নারীর নামে সরকারি সুবিধা গ্রহণ নিয়ে যে সামাজিক সংকোচ রয়েছে, তা দূর করতে সচেতনতা বৃদ্ধি ও সামাজিক প্রচারের প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। নব্বইয়ের দশকে চালু হওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদাজিয়া’র ফুড ফর এডুকেশন কর্মসূচি শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ফ্যামিলি কার্ড সেই ধারাবাহিকতার একটি আধুনিক রূপ, যেখানে খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি উন্নয়ন এবং নারীর ক্ষমতায়ন একই সঙ্গে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। যেকোন বড় সামাজিক উদ্যোগের মতো এখানেও কিছু ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তিকর তথ্য বা অপপ্রচার ছড়ানোর প্রবণতা দেখা দিতে পারে। তাই এই কর্মসূচির সফলতা নিশ্চিত করতে জনগণের সচেতনতা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোপরি, সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে ফ্যামিলি কার্ড কেবল দারিদ্র্য হ্রাসের একটি উপায় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং একটি নতুন সামাজিক চুক্তিতে রূপ নিতে পারে। এছাড়া, উদ্যোগটি যদি তার প্রত্যাশিত প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে, তবে তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সামাজিক নীতির ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।

লেখক: শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

বিজ্ঞাপন

বৈশাখে স্নিগ্ধ অপু বিশ্বাস
১৪ এপ্রিল ২০২৬ ১৭:৪৬

আরো

সম্পর্কিত খবর