Wednesday 15 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

খসে পড়ছে দেয়াঙ কিল্লা, হারিয়ে যাচ্ছে খোট্টাদের ভাষা-সংস্কৃতি

রমেন দাশ গুপ্ত, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ২১:০৮ | আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ২১:১১

ধসে পড়তে বসা দেয়াঙ কেল্লার মতো খোট্টা সম্প্রদায়ের ভাষা ও সংস্কৃতিও হারিয়ে যেতে বসেছে। ছবি: শ্যামল নন্দী/ সারাবাংলা

চট্টগ্রাম ব্যুরো: সাড়ে তিন শ বছর আগের ইতিহাস। মগদের আরাকান সাম্রাজ্য চাটগাঁয় (চট্টগ্রামে) আঘাত হানে মোগল শাসক। দখল করে নেয় মগদের দেয়াঙ কিল্লা (দুর্গ)। উত্তর ভারত থেকে হাজার হাজার মোগল সৈন্য এসে ঘাঁটি গড়েন সেই কিল্লাসহ আশপাশের এলাকায়। একসময় মোগল শাসনের অবসান হয়। কিন্তু বসতি গড়ে রয়ে যান সেইসব সৈন্য ও তাদের পরিবার। জীবনযাপনের রীতি, ভাষা, পোশাক মিলিয়ে তারা একটি স্বতন্ত্র সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিতি পায়।

বংশ পরম্পরায় তাদের মূল অবস্থান সেই দেয়াঙ কিল্লার আশপাশজুড়ে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার এক নম্বর বৈরাগ ইউনিয়নের বন্দরগাঁ গ্রামে। তবে এর বাইরেও চট্টগ্রাম শহর, দোহাজারি, রাঙ্গুনিয়া, কুমিল্লার লাকসামসহ আরও বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন তারা। ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যের কারণে তাদের পরিচয় ‘খোট্টাভাষী’ কিংবা ‘খোট্টা সম্প্রদায়’ হিসেবে। আনোয়ারায় তাদের বসবাসের এলাকাটিও ‘খোট্টাপাড়া’ নামে পরিচিত।

বিজ্ঞাপন

মোগল গেছে, ব্রিটিশ গেছে, পাকিস্তান শাসনেরও অবসান হয়েছে। ভগ্নাবশেষ নিয়ে দেয়াঙ পাহাড়ের ওপর ধুঁকছে দেয়াঙ কিল্লা। তার পাদদেশের মানুষগুলোও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এসে ভুলতে বসেছে পূর্বপুরুষের সঠিক ইতিহাস। খোট্টা সম্প্রদায়ের নিজস্ব সংস্কৃতি প্রায় হারিয়ে গেছে, বিলুপ্তির পথে খোট্টাভাষাও। তবু কিছু মানুষ নিজেদের মাতৃভাষা রক্ষার শেষ চেষ্টাটুকু করে যাচ্ছেন।

মোগলদের চট্টগ্রাম বিজয় ও খোট্টা সম্প্রদায়ের উদ্ভব

দিল্লীর বাদশাহ আওরঙ্গজেব মগ সাম্রাজ্যের পতন ঘটানোর নির্দেশনা দিয়ে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহচর শায়েস্তা খাঁকে পাঠিয়েছিলেন বাংলার সুবাহদার করে। ১৬৬৫ সালে শায়েস্তা খাঁ ছেলে বুজুর্গ উমেদ খাঁকে সেনাপতির দায়িত্ব দিয়ে গঠন করেন সুবিশাল এক সৈন্যদল। ১০ হাজারের বেশি সৈন্য নিয়ে বুজুর্গ উমেদ খাঁ ১৬৬৬ সালের জানুয়ারি মাসে ফেনী নদী পার হয়ে চট্টগ্রামে পৌঁছান। ২৪ জানুয়ারি আক্রমণ করেন আরাকানদের দুর্গ চাঁটগাছি কিল্লায় (বর্তমানে নগরীর আন্দরকিল্লা)। তিন দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর আরাকান বাহিনী পিছু হটে। ২৭ জানুয়ারি চাঁটগাছি কিল্লায় বিজয় নিশান ওড়ান উমেদ খাঁ।

মোগল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন ও দেয়াঙ পরগণার ইতিহাস নিয়ে বই লিখেছেন গবেষক জামাল উদ্দিন। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে বর্তমানে আনোয়ারা উপজেলার দেয়াঙ পাহাড়ে তখন ছিল মগদের প্রশাসনিক সদর দফতর। দেয়াঙ পাহাড়ের ওপর ছিল মগদের দেয়াঙ কিল্লা, কারাগার ও চাটিগাঁ দুর্গ। চট্টগ্রাম বিজয়ের পর আরাকানিরা চলে গেলে মোগল সেনাপতি উমেদ খাঁ গিয়ে দেয়াঙ কিল্লা, মানে মগদের প্রশাসনিক সদর দফতর দখল করে বিজয়ের পতাকা ওড়ান। দেয়াঙ কারাগারে আরাকান রাজসভার মহাকবি আলাওলসহ প্রায় ৪০ হাজার বাঙালিকে মগরা বন্দি করে রেখেছিল। উমেদ খাঁর নির্দেশে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।’

প্রায় সাড়ে তিন শ বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেয়াঙ কিল্লা, যার আশপাশেই খোট্টা সম্প্রদায়ের বসতি। ছবি: শ্যামল নন্দী/ সারাবাংলা

‘কিন্তু উনার (উমেদ খাঁ) বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। দেয়াঙ পাহাড়ের ওপর থেকে তিনি দেখতে পেলেন, সাগর ও নদীর মিলনস্থল একেবারে পাহাড়ের কাছেই। উনি আশঙ্কা করলেন, পরাজিত আরাকানিরা নৌ পথে এসে তার ওপর আক্রমণ করতে পারে। তিনি সেখান থেকে আন্দরকিল্লা দুর্গে এসে গুহায় আশ্রয় নেন। একইসঙ্গে দেয়াঙ পাহাড়ে প্রশাসনিক সদর দফতর পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন। কর্ণফুলী নদীর উত্তরে, অর্থাৎ এখন যেখানে চট্টগ্রাম শহরের অবস্থান সেখানে প্রশাসনিক সদর দফতর স্থাপনের ঘোষণা দেন। তখনই মূলত চট্টগ্রাম শহরের গোড়াপত্তন হয়,’— বলেন জামাল উদ্দিন।

এই গবেষকের দেওয়া তথ্যমতে, পরিত্যক্ত শহর থেকে নতুন প্রশাসনিক সদর দফতরে আসতে সম্মত ছিলেন না সেখানকার ভূমিপুত্ররা। উমেদ খাঁ আবার ১০ হাজার সৈন্য পাঠান দেয়াঙ কিল্লায়। এর মধ্যে পাঁচ হাজার মুসলিম, পাঁচ হাজার হিন্দু। তাদের সেনাপতি ছিলেন জবরদস্ত খাঁ ওরফে মনু মিয়া। তারা জোর করে ওই এলাকার ভূমিপুত্রদের নতুন প্রশাসনিক সদর দফতর অর্থাৎ নতুন শহরে চলে যেতে বাধ্য করেন এবং মোগল সৈন্যরা সেখানেই বসতি গড়ে বসবাস শুরু করেন। মোগল শাসনের অবসানের পর ব্রিটিশরা বাংলা দখল করলে মোগলরা অসহায় হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ আমলে মোগলদের আর সেনাবাহিনীতে রাখা হয়নি।

জামাল উদ্দিন বলেন, ‘ব্রিটিশরা তাদের চাকরিতে না রাখলেও তারা কোথায় যাবে? কারণ ব্রিটিশ শাসন আসার আগেই তো মোগল সৈন্যদের পরবর্তী অন্তত তিন প্রজন্ম গত হয়েছে। তারা দেয়াঙ পাহাড়ের আশপাশেই রয়ে গেল। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে ওরা মূলত উত্তর ভারত থেকে এসেছিল। তাদের ভাষা হিন্দি। আবার মোগলদের রাষ্ট্রীয় ভাষা ছিল ফারসি। এখানে বসবাস করতে গিয়ে তাদের ভাষায় মিশ্রণ ঘটে। ফারসি, হিন্দি, উর্দু, বাংলা এবং চাটগাঁর ভাষা মিলে একটি উপভাষা তৈরি হয়। এর সঙ্গে উত্তর ভারতের ভাষার তেমন কোনো মিল নেই। পরে সেটিই খোট্টা ভাষা হিসেবে পরিচিতি পায়। আর সেই ভাষাভাষি যারা তারা খোট্টা সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিতি পায়।’

কথা হয় খোট্টা সম্প্রদায়ের দুজন মানুষের সঙ্গে। এদের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা সত্তরোর্ধ্ব জগদীশ চন্দ্র সিং এবং অন্যজন খোট্টা ভাষা-ঐতিহ্য নিয়ে লেখালেখি করা মোহাম্মদ আশরাফ আলী। প্রশ্ন ছিল— তাদের ভাষাকে ‘খোট্টাভাষা’ বলা হয় কেন?

জগদীশ চন্দ্র সিং সারাবাংলাকে বলেন, ‘খোট্টা মূলত কোনো ভাষা নয়, এটাকে উপভাষা বলা যায়। যেমন— আমদের পূর্বপুরুষ এসেছে ভারতের বেনারস থেকে। আরেকদল সৈন্য এসেছে বিহার কিংবা আফগান থেকে। অঞ্চলভেদে ভাষার বৈচিত্র্য ও বলার ধরণ মিশ্রিত হয়ে একটি মিশ্র ভাষায় জন্ম হয়। তখন এখানকার যারা ভূমিপুত্র— আরাকানি মগ, চাটগাঁইয়া কিংবা বাঙালিরা এই ভাষা বুঝত না বলে খুবই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত। তারাই এর নাম দিয়েছে খোট্টা ভাষা। চাটগাঁইয়া ভাষায় খোট্টা বলতে সাধারণত খটমটে কিংবা কঠিন বোঝানো হয়।’

আশরাফ আলী বললেন, ‘আমাদের যে ভাষা, এর মধ্যে আরবি, ফারসি, হিন্দি, উর্দু, ব্রিটিশ ইংলিশ, বাংলা-চাটগাঁ সব ভাষার মিশ্রণ আছে। আমাদের কথ্য ভাষা আরাকানিরা বুঝত না। এজন্য তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে একে খোট্টা ভাষা বলত। সেই থেকে আমরা যারা এখানে আসা মোগল সৈন্যদের বংশ পরম্পরা, আমরা খোট্টাভাষী সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত।’

দেয়াঙ কিল্লা নিয়ে আরও একটি তথ্য দিলেন আশরাফ। তাদের পূর্বপুরুষরা জেনেছিলেন, দিল্লির সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় পুত্র শাহ সুজা বাংলার সুবাহদার থাকার সময় এক রমজান পরিবার নিয়ে দেয়াঙ পাহাড়ে কাটিয়েছিলেন। দেয়াং কিল্লার সামনে সৈন্যদের নিয়ে তিনি ঈদের নামাজ আদায় করেছিলেন। শাহ সুজা নিজেই ইমামতি করেছিলেন। পরে উমেদ খাঁর মোগল সৈন্যরা দেয়াঙ কিল্লা দখলের পর প্রতি ঈদে সেখানে নামাজ আদায় শুরু করেন। বংশ পরম্পরায় ১৯৯০ সাল পর্যন্ত খোট্টাপাড়ার বাসিন্দারা সেখানেই নামাজ আদায় করেছেন।

ইতিহাসের পাতার মতোই জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে দেয়াঙ কিল্লা। দেখে বোঝার উপায় নেই, একসময় এখানেই ছিল কোনো শাসনকর্তার প্রশাসনিক সদর দফতর। নেই সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগও। ছবি: শ্যামল নন্দী/ সারাবাংলা

দেয়াঙ পাহাড়ের পথে পথে

দেয়াঙ পাহাড়ের পাদদেশ আর বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে আনোয়ারার বৈরাগ ইউনিয়নের বন্দরগাঁ গ্রাম। উত্তর, মধ্যম ও দক্ষিণ বন্দরগাঁ— এ তিন পাড়া মিলে গ্রামটিতে মুসলিম ও হিন্দু মিলে ১০ হাজারেরও বেশি খোট্টা ভাষাভাষীর বসবাস। খোট্টাপাড়া নামে পরিচিত এ গ্রামের বাসিন্দারা জানালেন, প্রায় সাড়ে তিন হাজার পরিবারে ১০ হাজারের মতো মুসলিম এবং প্রায় সাড়ে তিন শ হিন্দু জনগোষ্ঠীর বসবাস এখানে।

পাহাড়ের বুক চিড়ে কোরিয়ান ইপিজেডের তৈরি সুবিশাল সড়ক পেরিয়ে উত্তর বন্দরগাঁ গ্রামে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে প্রাচীন নানা স্থাপত্যশৈলী। উত্তর বন্দরগাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের সড়ক দিয়ে দেয়াঙ পাহাড়ে ওঠার একটি পথ পাওয়া যায়। ভাঙাচোরা ইটের সিঁড়ি দিয়ে পাহাড়ে উঠলেই দেখা মেলে দেয়াঙ কিল্লার। বড় বড় বেলগাছ, বট-অশ্বত্থের জড়াজড়ির সাক্ষী হয়ে থাকা কিল্লার সিংহদ্বারেরও দেখা পাওয়া যায়। তবে খসে পড়ছে পলেস্তারা, সুরম্য দেয়াল। কিল্লার উঁচুতে ওঠার সিঁড়িটা আছে, ভেতরের স্থাপনার অবশিষ্টটুকু ধুঁকছে। নথিপত্রে পাহাড়ের মালিক চট্টগ্রাম বন্দর, রক্ষণাবেক্ষণে আন্তরিকতার অভাব স্পষ্ট।

কিল্লা ঘুরে দেয়াঙ পাহাড়ের পাদদেশে গ্রামটিতে প্রবেশের সময় দেখা প্রায় ৬০ বছর বয়সী মোহাম্মদ শাহজাহান আবেদের সঙ্গে। তার কাছে খোট্টাপাড়ার অবস্থান জানতে চাইলে জানালেন, তিনি নিজেই খোট্টাভাষী। শুদ্ধ বাংলায় কিছুক্ষণ আলাপের পর শাহজাহানকে নিয়েই প্রবেশ সেই পাড়ায়। শাহজাহান এক তরুণকে হাঁক দিলেন, ‘ফজু এমিক্যা আও, কেতুনি গরবা আয়আয়, আও ইক্কিনি চাহাই।’ ওই তরুণের জবাব, ‘নয়, হাম এহন চা হাখে আইজ্যে, তুনসফ হা।’ শাহজাহানই আবার তরজমা করে দিলেন এই কথোপকথনের। তিনি বলেছিলেন, ‘ফজু, এদিকে আসো, কয়েকজন অতিথি এসেছে, একটু আসো তো দেখি।’ তরুণের জবাব ছিল— ‘আমি এখনই চা খেয়েছি, আপনি খান।’

বোঝা গেল, তারা নিজেদের অনেকের মধ্যে কথ্য ভাষা হিসেবে খোট্টা চালু রেখেছেন। কাউকে কাউকে আবার চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাতেও নিজেদের মধ্যে কথা বলতে শোনা গেল।

শাহজাহান সারাবাংলাকে বলেন, ‘খোট্টা ভাষা এমনিতেই মিশ্র ভাষা। এখন আমাদের কথাবার্তায়ও তা আরও বিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। যেমন— ভাতকে চট্টগ্রামে ভাত বলে, আমরাও ভাত বলি। কিন্তু হিন্দি ও উর্দুতে চাল বলে। আগে আমরাও চাল বলতাম, এখন বলি ভাত। ভাষা বিবর্তিত হয়েছে। লাকড়ির চুলাকে আমরা বলি লাকড়িয়ে চুলা। গ্যাসের চুলাকে বলি গ্যাস কা চুলা।’

খোট্টা ভাষায় গালি কেমন— জানতে চাওয়া হলো এক তরুণের কাছে। একগাল হেসে তিনি বললেন, “চট্টগ্রামে একটা সম্বোধনকে সবাই গালি হিসেবে ব্যবহার করে— আলার আলা (শালার শালা)। আমরা বলি ‘শালাশালা’। চট্টগ্রামের গালিগুলোই আমাদের গালি হিসেবে প্রচলিত, তবে সামান্য ব্যতিক্রম আছে। যেমন— খোট্টা এক চাচা তার ভাতিজাকে গালি দিয়ে বলছে, ‘হাঙ্কিয়া লরকা, এমিক্যা আও’। চট্টগ্রামে বহুল প্রচলিত একটি গালিকে আমরা আমাদের ভাষায় বলছি ‘হাঙ্কিয়া লরকা’।”

শাহজাহানের সঙ্গে হাঁটতে গিয়েই দেখা হয় মধ্যবয়সী দোকানি মোহাম্মদ মোজাহের মিয়ার সঙ্গে। ভাষা-সংস্কৃতিতে নিজস্বতার জন্য তার মধ্যে আলাদা অহংকার, বোঝা গেল কথাবার্তা। মোজাহের বললেন, ‘খোট্টা আমাদের ভাষা, আমাদের ঐতিহ্য। আমাদের মা-বাবার সঙ্গে আমরা এ ভাষায় কথা বলি। ছেলেমেয়েরা তাদের দাদা-দাদির সঙ্গে বলে। এটাই আমাদের মাতৃভাষা। বাংলা ভাষা আমাদের মাতৃভাষা নয়, চাটগাঁর ভাষাও আমাদের মাতৃভাষা নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের একজন মানুষও বেঁচে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এ ভাষা টিকে থাকবে। বিশ্বের সব মানুষের চেয়ে আমরা অন্তত একটি ভাষা বেশি জানি— এটা আমাদের গর্ব।’

উত্তর থেকে দক্ষিণে একটিই রাস্তা। তার দুপাশে বাড়িঘর, দোকানপাট, মসজিদ, মাজার, মন্দির, স্কুল, মাদরাসা। মাঝে মাঝে ঘুপচি গলিপথ, ভেতরে শহুরে কলোনির মতো বসতি। জীবনযাপনে নগরজীবনের ছাপ দেখা গেছে।

মোগল যোদ্ধাদের বংশধরেররা

খোট্টাপাড়ায় দেখা মিলল মোহাম্মদ আশরাফ আলীর সঙ্গে, যার পরিচয় শুরুতেই দেওয়া হয়েছে। তিনি মোগল সৈন্য কালু বরকন্দাজের সপ্তম বংশধর। পূর্বপুরুষদের নাম আশরাফের মুখস্ত— কালু বরকন্দাজের ছেলে লালু বরকন্দাজ, তার ছেলে কেরামত আলী, তার ছেলে রহমান আলী, তার ছেলে আব্দুল মজিদ এবং তার ছেলে আরব আলী। এই আরব আলীর ছেলে আশরাফ আলী। শুরুতে যে শাহজাহান আবেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে, তিনিও একই বংশের।

খোট্টাপাড়ার সড়কে এক শিশু। তাদের দাদা-দাদি ও মা-বাবা নিজেদের মধ্যে খোট্টা ভাষায় কথাবার্তা বলতে পারলেও নতুন প্রজন্মের এমন শিশুদের অনেকের মধ্যেই নেই ভাষার চর্চা। ছবি: শ্যামল নন্দী/ সারাবাংলা

আশরাফ আলী সারাবাংলাকে জানালেন, বন্দরগাঁ গ্রামে তাদের পূর্বপুরুষদের আটজন নামকরা যোদ্ধা ছিলেন। তাদের মধ্যে আসমত আলী সিপাই আর সামাদ আলী সিপাইয়ের নাম তারা জানেন। আর একজন হিন্দু যোদ্ধা ছিলেন ভগবান সিং।

সামাদ আলী সিপাইয়ের বংশধর একজনকে পাওয়া যায় ওই গ্রামে। তিনি মোহাম্মদ ফজলে করিম আজাদ, বয়স ত্রিশের কোঠায়, পেশায় ইলেকট্রিশিয়ান।

আর যে বীর মুক্তিযোদ্ধা জগদীশ চন্দ্র সিংয়ের কথা শুরুতে বলা হয়েছে, তিনি ভগবান সিংয়ের বংশধর। জগদীশেরও তাদের পূর্বপুরুষদের নাম মুখস্ত। তিনি ভগবান সিংয়ের সপ্তম বংশধর। ভগবানের ছেলে পেচুরাম সিংহ, তার ছেলে জঁগন সিংহ, তার ছেলে নিশিকান্ত সিংহ, তার ছেলে যোগেন্দ্র লাল সিংহ, তার ছেলে মনীন্দ্র লাল সিংহ। মনীন্দ্রের ছেলে জগদীশ কাস্টমস পরিদর্শক ছিলেন, ২০১৫ সালে অবসরে যান। এক ছেলে জুয়েল সিংহ, মেরিন প্রকৌশলী, বর্তমানে বিদেশি জাহাজে কর্মরত।

জগদীশের ঘর মধ্যম বন্দরগাঁ গ্রামের সিংহপাড়ায়। পাকা দালানের ফটকেই শ্বেতপাথরে লেখা ‘জঁগন সিংহ মহাজন বাড়ি’। এ গ্রামে তাদের প্রথম পুরুষ ভগবান সিংহ ছিলেন মোগল সেনাপতি এবং পরে মোগল রাজদরবারের কর্মচারী ও জমিদার।

আন্দরকিল্লাতেও আছে খোট্টাদের বসবাস

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৩২ নম্বর আন্দরকিল্লা ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জহরলাল সিং হাজারি, তিনিও খোট্টা সম্প্রদায়ের। উত্তর ভারত থেকে মোগল সৈন্য হিসেবে আসা তাদের পূর্বপুরুষরা আন্দরকিল্লা এলাকায় বুজুর্গ উমেদ খাঁয়ের মূল কিল্লায় দায়িত্বরত ছিলেন। তাদের নামানুসারেই পরে নাম হয়েছে ‘হাজারি লেন’।

জহরলাল হাজারি সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের বংশের প্রথম পুরুষ এখানে এসেছিলেন ভারতবর্ষের উত্তর প্রদেশ থেকে। দেরাদুন, উত্তরাখাণ্ডে এখনো আমাদের বংশীয় লোকজন আছে। আমরাও ছিলাম সেখানকার ভূস্বামী। মোগল বাহিনীর যোদ্ধা হিসেবে আমাদের পূর্বপুরুষকে চট্টগ্রামে আনা হয়েছিল। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে আমরা পৈতাধারী ক্ষত্রিয়, মানে যোদ্ধা। আন্দরকিল্লা ছিল আমাদের দুর্গ, মোগল দুর্গ। এক হাজার সৈন্যের সমাবেশ এখানে ঘটানো হয়েছিল।’

জহরলালের বাবার নাম রণধীর সিং হাজারি, তার বাবা রাজনারায়ণ সিং হাজারি এবং তার বাবা ভগবান সিং হাজারি। এর বেশি পূর্বপুরুষের তথ্য আর তার কাছে নেই। জানালেন, তাদের মূল ভাষা ছিল হিন্দি। কিন্তু চট্টগ্রামে বসবাস করতে গিয়ে তাদের কথ্যভাষায় মিশ্রণ ঘটে। এরপর তারাও খোট্টাভাষী সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিতি পান।

জহরলাল বলেন, ‘আমার বাবা-কাকা, আমার দাদুদেরও হিন্দি ভাষায় কথা বলতে ‍শুনেছি। তার সঙ্গেও কিছুটা বাংলার সংমিশ্রণ ছিল। লাকসামে হাজারি সম্প্রদায় আছে, তারাও খোট্টা। রাঙ্গুনিয়ায় আমাদের সম্প্রদায়ের লোকজন আছে। দোহাজারিতে আছে।’

সারাবাংলার সঙ্গে আলাপচরিতায় (বাঁ থেকে) জগদীশ চন্দ্র সিং, মোহাম্মদ আশরাফ আলী ও মোহাম্মদ শাহজাহান আবেদ। খোট্টা ভাষা পরিপূর্ণভাবে আয়ত্তে রাখা শেষ প্রজন্মের প্রতিনিধি বলা যায় তাদের। ছবি: শ্যামল নন্দী/ সারাবাংলা

গবেষক জামাল উদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘বুজুর্গ উমেদ খাঁ ছিলেন মূল সেনাপতি। তিনি আবার অনেকগুলো ছোট ছোট সেনাদল গঠন করেছিলেন। এক হাজার সৈন্য নিয়ে যে দল, তার সেনাপতিকে বলা হতো হাজারি সেনাপতি। তখন আবার হিন্দু সেনাপতির অধীনে শুধু হিন্দু সৈন্যরা থাকতে পারতেন, আর মুসলিমরা থাকতেন মুসলিম সেনাপতির অধীনে।’

‘জহরলাল হাজারির পূর্বপুরুষ এক হাজার সৈন্যদল নিয়ে আন্দরকিল্লা দুর্গে মোতায়েন ছিলেন, এ জন্য তাদের হাজারি বলা হয়। দুই হাজার সৈন্য যেখানে ছিল, সেটা দোহাজারি, চন্দনাইশের দোহাজারি যেটা। একইভাবে আট হাজার সৈন্যদল নিয়ে একজন সেনাপতি হাটহাজারীতে বর্তমানে যেখানে চট্টগ্রাম সেনানিবাস, সেখানে অবস্থান করছিলেন। সেটা আটহাজারি নামে পরিচিত ছিল, পরে নামকরণ হয়েছে হাটহাজারী। আনোয়ারায় বারশত নামে একটা ইউনিয়ন আছে, সেখানে ১২০০ সৈন্যের সমাবেশ ঘটানো হয়েছিল।’

খোট্টারা কেন স্বতন্ত্র?

গবেষক জামাল উদ্দিনের মতে, উত্তর ভারত থেকে আসা অধিকাংশ সৈন্যের গায়ের রঙ ছিল ঘুটঘুটে কালো। ভাষা তো চট্টগ্রামের ভূমিপুত্রদের চেয়ে আলাদা ছিলই, তাদের জীবনযাপনে উত্তর ভারতের সংস্কৃতির প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই ছিল।

‘বিশেষত গায়ের রঙ কালো হওয়ায় চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দারা কেউ তাদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনে রাজি ছিলেন না। এমনকি সামাজিকভাবেও তাদের গ্রহণ করা হতো না শুরুতে। সেজন্য তারা নিজেরাই আলাদা সমাজব্যবস্থা তৈরি করেন। নিজেরা নিজেদের মধ্যে বিয়ে করতেন। যেমন— কেউ তার চাচাতো বোনকে বিয়ে করল, ফুপাতো বোন আবার মামাতো ভাইকে বিয়ে করল। এভাবে একটা স্বতন্ত্র সম্প্রদায় হিসেবে তারা গড়ে উঠেছে,’— বলছিলেন জামাল উদ্দিন।

আশরাফ আলী জানালেন, তাদের পোশাক থেকে শুরু করে খাদ্যাভাসেও ভিন্নতা ছিল চট্টগ্রামের মানুষের থেকে। ধর্মপ্রাণ মুসলিম হলেও খোট্টাভাষী মুসলমানদের মধ্যে পুরুষের পোশাক ছিল পায়জামা-পাঞ্জাবি আর কাবলি। মেয়েদের ছিল লেহাঙ্গা, বোরখা। কিন্তু কালক্রমে বার্মিজ লুঙ্গিতে অভ্যস্ত হয়ে যান তারা। নারীরা শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ পরতে শুরু করেন। পূর্বপুরুষদের মূল খাদ্যের মধ্যে ছিল গমের আটার রুটি, ছিল গমভাজাও।

পোশাকের সংস্কৃতি গত ৫০ থেকে ১০০ বছরে পালটেছে— এমন মত আশরাফের। সমাজব্যবস্থা আলাদা হওয়ার কথাও উঠে এসেছে তার কথায়, ‘আমাদের খোট্টা সমাজ সর্দার প্রথানির্ভর ছিল। সর্দারের নেতৃত্ব আগে, তারপর সরকার-প্রশাসনের সিদ্ধান্ত। বিচার-সালিশে আগে সর্দারের সিদ্ধান্ত। এর প্রশাসনিক স্বীকৃতিও ছিল। অনেকটা টিকে থাকার জন্যই এ ব্যবস্থা ছিল।’

খোট্টাদের বিয়ের আলাদা রীতি প্রসঙ্গে আশরাফ বলেন, ‘আমাদের কিন্তু বিয়ের রাতে বা পরের রাতেই বাসর হয় না। তৃতীয় দিন, পঞ্চম দিন কিংবা সপ্তম দিন রাতে হয়। বাসর রাতের আগ পর্যন্ত কিন্তু নববিবাহিত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনো দেখা-সাক্ষাৎ হয় না। যে রাতে বাসর হয়, পরদিন সকালেই বৌ নাইওর (বেড়াতে) চলে যান বাবার বাড়ি।’

সনাতন ধর্মাবলম্বী খোট্টাদের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রথা, পোশাক, খাদ্যাভাসেও ভিন্নতা ছিল। এ কারণে চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দারা তাদের পৃথক করে রেখেছিলেন— এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

জগদীশ চন্দ্র সিংহ সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা ছিলাম পৈতাধারী ক্ষত্রিয়। আমাদের মূল পূজা কিন্তু দুর্গাপূজা ছিল না। দুর্গাপূজা ছিল বাঙালি হিন্দুদের পূজা। একসময় আমাদের পূর্বপুরুষ শুধু নেংটির মতো ধূতি পরত, খালি গায়ে থাকত শুধু পৈতা। নারীরা শাড়ি পরতেন। সেটি পরার আবার ভিন্ন একটা স্টাইল ছিল— বাঙালিরা যেভাবে পরেন সেভাবে নয়।’

‘আমাদের বিয়ের রীতিও ছিল সামান্য ভিন্ন। হিন্দুদের বিয়েতে মাটির বেদি বানানো হয়, যার সামনে বর-কনের মালাবদল হয়। বাঙালি হিন্দুদের বিয়েতে বেদি বানানো হয় চার কোণা করে, আমাদেরটা বানানো হতো কিছুটা কচ্ছপাকৃতির। তখন বাঙালি হিন্দুরা আমাদের খুব তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত। আমাদের বিয়ের আগের দিন কনেকে বরের বাড়িতে নিয়ে আসা হতো, কোনো প্রতিবেশীর বাড়িতে রেখে পরদিন বিয়ের আসরে নেওয়া হতো। বিয়ের আড়াই দিন পর কনে নাইওর (বেড়াতে) যেত বাবার বাড়িতে। এটা কিছু কিছু বাঙালি হিন্দুর বিয়েতেও দেখা যেত,’— বলেন জগদীশ।

বাঙালি হিন্দুদের খাদ্যাভাসে নিরামিষ থাকলেও খোট্টাদের সেটা ছিল না। খোট্টাদের প্রায় সব পূজোয় পশুবলি প্রথা ছিল বলেও জানালেন জগদীশ। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘ভাষার কারণে আমরা তুচ্ছ পাত্র ছিলাম এ দেশের ভূমিপুত্র বা আদি বাসিন্দাদের কাছে। এর একটা কারণ হচ্ছে, মোগলরা উত্তর ভারত থেকে একই সময়ে হরিজন সম্প্রদায়ের অনেককেও এ দেশে নিয়ে আসে ময়লা-বর্জ্য পরিষ্কার করার জন্য, যাদের মেথর হিসেবে সম্বোধন করা হয়। চট্টগ্রাম শহরের পাথরঘাটা, ফিরিঙ্গিবাজারে অনেক মেথরের বসবাস, যারা সে সময়ে উত্তর ভারত থেকে এসেছে। উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা এই মেথরদেরও খুবই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত, এমনকি আমরা যারা পৈতাধারী ক্ষত্রিয় ছিলাম, তাদের আমাদের বাড়ির চৌহদ্দিতে প্রবেশ কিংবা স্পর্শের অধিকারও তখন ছিল না।’

‘কিন্তু আমাদের ভাষা আর মেথরদের ভাষা ছিল একই। তখন বাঙালি হিন্দুরা বলত, আমরাও নাকি মেথর। অথচ উত্তর ভারতে মেথরের ভাষা যেটা, ব্রাহ্মণের ভাষাও তো সেটাই। গোঁড়ামির কারণে তারা আমাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত। আমাদের সঙ্গে তাদের বৈবাহিক কোনো সম্পর্ক তৈরি করতে চাইত না। এমনকি তাদের বাড়িঘরে আমাদের প্রবেশাধিকারও সীমিত ছিল। সেজন্য আমাদের বিয়েশাদি হতো আমাদের নিজেদের মধ্যেই, অর্থাৎ খোট্টাভাষী সম্প্রদায়ের মধ্যেই।’

জহরলাল সিং হাজারী সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা খেতাম রুটি-তরকারি, ছাতু। ভাত আমাদের খাদ্য ছিল না। আমার বাবাদের প্রজন্ম থেকে ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য হয়ে ওঠে। আমাদের পোশাক ছিল শুধু নেংটি আর পৈতা।’

বাঙালিরা আলাদা করে রাখলেও খোট্টা হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ ছিল না। খোট্টাদের মধ্যে যারা প্রবীণ, তারা এই সম্প্রীতি এখনো ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। জগদীশ জানালেন, ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় খোট্টা হিন্দুদের বাড়িঘর লুটের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন খোট্টা মুসলিম সর্দার আহমদ সোবহান চৌধুরী।

‘আগে ঈদ-পার্বণে হিন্দু-মুসলিমদের একে অন্যের ঘরে আসা-যাওয়া ছিল। এখন অনেকটা কমে গেলেও বয়সে প্রবীণ যারা আছেন, তারা সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। ওই যে এখানকার আদি বাসিন্দাদের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার জন্য যে ঐক্য, তার একটা প্রভাব এখনো রয়ে গেছে,’— বলেন জগদীশ সিং।

ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রাম-মুক্তিযুদ্ধেও আছে খোট্টাদের অবদান

জগদীশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোগল সৈন্যদের উত্তরসূরী খোট্টাদের গ্রামে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোট পাঁচজন। তাদের মধ্যে তিনজন হিন্দু— ক্ষুদিরাম, মন্টুরাম ও জগদীশ বেঁচে আছেন। জাফরউল্লাহ ও সৈয়দ আহমদ মারা গেছেন।

জগদীশ ও জাফরউল্লাহ ছিলেন দুই সহপাঠী। খোট্টাপাড়া থেকে পালিয়ে গিয়ে একসঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। সেই কাহিনী বলতে গিয়ে শিশুর মতো কান্নায় ভেঙে পড়েন জগদীশ।

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর জগদীশ ভারতে প্রশিক্ষণে যাওয়ার জন্য গোপনে সব ব্যবস্থা করে ফেলেন। যাওয়ার আগের দিন জাফরউল্লাহর কাছে গিয়ে বললেন, ‘আমাকে হয়তো আর দেখবি না, মুক্তিযুদ্ধে যাচ্ছি।’ তখন জাফরউল্লাহ বললেন, ‘তুই মুক্তিযুদ্ধে যাবি আর আমি বন্ধু হয়ে ঘরে বসে থাকব? আমিও মুক্তিযুদ্ধে যাব।’

জগদীশ জানালেন, অগ্নিযুগের বিপ্লবী কল্পনা দত্ত ১৯৩৩ সালে এ খোট্টাপাড়ায় ভীম সিং মহাজনের আশ্রয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। গোরখা সৈন্যরা তাকে গ্রেফতারে অভিযান চালাবে খবর পেয়ে ভীম মহাজন তাকে রেখে আসেন আনোয়ারার গহিরায় এক গোপন আস্তানায়। জগদীশ বলেন, ‘মায়ের মুখে শুনেছি, পরদিন গোরখা সৈন্যরা তাকে গ্রেফতার করে খোট্টাপাড়ার ভেতর দিয়েই হেঁটে হেঁটে নিয়ে যায়।’

কেন হারাচ্ছে ইতিহাস, ভাষা-সংস্কৃতি?

বসতি গড়ার তিন শতক পেরিয়ে খোট্টাদের নিয়ে চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দা বা বাঙালিদের যে ধারণা ছিল, সেটি পাল্টে গেছে। খোট্টারাও তাদের যাপিত জীবনে এখানকার সংস্কৃতিকেই গ্রহণ করে নিয়েছেন। ছয় কিংবা সাত প্রজন্ম পর এখন আর খোট্টাভাষা কথ্য হিসেবে সেভাবে জোরালো নয়। এ ছাড়া এ ভাষার লিখিত কোনো বর্ণমালাও নেই। মূলত এসব কারণকেই গবেষক ও খোট্টা সম্প্রদায়ের লোকজন তাদের ইতিহাস, ভাষা-সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

সেই যে মোগল যোদ্ধা সামাদ আলী সিপাইয়ের বংশধর মোহাম্মদ ফজলে করিম আজাদ, বিয়ে করেছেন চাচাতো বোনকে। তার পাঁচ বন্ধু সবাই বিয়ে করেছেন খোট্টাপাড়াতেই। তার দাবি, ১০০টি বিয়ের মধ্যে এখনও ৭০-৮০টি গ্রামের ছেলে-মেয়েদের মধ্যেই হচ্ছে। কিন্তু যে ২০টি বাইরের সম্প্রদায় থেকে হচ্ছে, তারা তো খোট্টা ভাষা-সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত নন। তাদের সন্তানরাও সেটা সেভাবে পাচ্ছে না।

‘আমাদের ভাষা বিলুপ্তির পথে। আমার মা-বাবা, দাদা-দাদির মুখে খোট্টা ভাষা শুনেছি। আমার দাদা তো সারাক্ষণ সবার সঙ্গে খোট্টা ভাষায় কথা বলতেন। মা-বাবাও নিজেরা খোট্টা ভাষায় কথা বলতের। আমরা মায়ের ভাষা হিসেবে খোট্টা ভাষা পেয়েছি। কিন্তু এখনকার প্রজন্ম আর খোট্টা ভাষাকে মায়ের ভাষা হিসেবে পাচ্ছে না। মায়েরা, পাড়া-পড়শিরা তাদের সঙ্গে চাটগাঁর প্রচলিত ভাষায় কথা বলছে। সবসময় খোট্টা ভাষায় কথা বলে, এমন পরিবার এখন আর নেই,’— বলেন ফজলে করিম আজাদ।

আশরাফ আলী বললেন, ‘দুই পুরুষ আগেও আমাদের বিয়েশাদি শুধু আমাদের ভেতরেই অর্থাৎ খোট্টা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। গত ২০-৩০ বছরে এটা পালটে গেছে। আমরা বাঙালি নই, কিন্তু বাঙালি মুসলমানদের রীতি-প্রথা আমাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। মোগলদের যে রীতি আমাদের পূর্বপুরুষের ছিল, আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। যেমন— লুঙ্গি তো আমাদের পোশাক ছিল না। আমাদের খোট্টাভাষী মুসলমানদের মধ্যে পুরুষের পোশাক ছিল পায়জামা-পাঞ্জাবি আর কাবলি। মেয়েদের ছিল লেহাঙ্গা, বোরখা। কিন্তু পরে আমরা বার্মিজ লুঙ্গিতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। মহিলারা শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ পরা শুরু করে। এটা ৫০-১০০ বছর আগের কথা।’

জগদীশ সিং বললেন, ‘আমি আমার দাদু-ঠাকুরমা, মা-বাবার মুখে খোট্টা ভাষায় কথাবার্তা শুনেছি। আমি নিজেও পরিবারে, এলাকায় খোট্টা ভাষায় একসময় কথা বলেছি। এটাই আমাদের কথ্য ভাষা ছিল। কিন্তু বিয়ে করেছি অন্য এলাকায়। আমার স্ত্রী তো খোট্টা ভাষা সেভাবে বোঝেন না। চট্টগ্রাম শহরে বাসায় থাকতাম, সেখানেও খোট্টা ভাষা বললে কেউ বুঝত না। বাধ্য হয়ে চাটগাঁর ভাষা কিংবা সাধু ভাষা বলতে হয়েছে। আমার ছেলে এখন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, সে তো বলতে গেলে খোট্টা ভাষা জানেই না, বোঝেও না। কারণ সে শহরে বড় হয়েছে। আমরা তো সেভাবে তার সঙ্গে খোট্টা ভাষায় কথা বলিনি।’

‘গত ৩০০ বছরে বাঙালি হিন্দুদের মতো দুর্গাপূজা আমাদেরও ‍মূল পূজায় পরিণত হয়েছে। একসময় খোট্টা হিন্দুরা নেংটি-পৈতা পরত। মোগল আমল যখন শেষ হলো, তখন বেঁচে থাকার তাগিদে সবাইকে চাষবাসে নামতে হয়েছিল। এখন নেংটি আর পৈতা দিয়ে তো চাষবাস হয় না। তখন সবাই সেটা ছুঁড়ে ফেলে লুঙ্গি পরতে শুরু করল। এর আগে অবশ্য ব্রিটিশরা আসার পর হিন্দু খোট্টারা প্যান্ট-শার্ট, কুর্তা পরতে শুরু করেছিল।’

খোট্টাপাড়ার টুকরো কিছু ছবি। খোট্টা সম্প্রদায়ের বাসিন্দারা বলছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভাষা আর সংস্কৃতি এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে। ছবি: শ্যামল নন্দী/ সারাবাংলা

জগদীশ জানালেন, গত ৫০ বছরে বিয়ের রীতিও খোট্টারা পালটে ফেলেছে। এখন আর বর-কনের মালাবদলের সামনের বেদি কিছুটা কচ্ছপাকৃতির হয় না। কনেকে বরের বাড়িতে নিয়ে বিয়ের রীতিও কালক্রমে আর নেই। কারণ সেগুলো ধরে রাখতে গেলে বাঙালি হিন্দুরা তাদের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্কে আগ্রহী হচ্ছিলেন না।

‘আমাদের যে জনগোষ্ঠী, যেটাকে খোট্টা ভাষাভাষী গোষ্ঠী বলা হতো, সেটা মূলত মোগল দেয়াঙ কিল্লা ঘিরেই গড়ে উঠেছিল। একটি স্বতন্ত্র ভাষাভাষি জনগোষ্ঠী এবং তাদের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি। ছয়-সাত প্রজন্ম পর এখন সেই ভাষা-সংস্কৃতি অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। আত্মীয়তা হচ্ছে বাঙালিদের সঙ্গে, তাদের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে। এ ছাড়া লিখিত কোনো বর্ণমালাও নেই,’— বলছিলেন জগদীশ।

মোহাম্মদ শাহজাহান আবেদ বলেন, ‘আমরা এলাকায় মুরব্বিদের সঙ্গে কিংবা বাজারে কারও সঙ্গে দেখা হলে খোট্টা ভাষায় কথা বলি। আমার নাতির জন্ম চট্টগ্রাম শহরে। তার সঙ্গে তো কেউ খোট্টা ভাষায় কথা বলে না। আমাদের মুখে খোট্টা ভাষা শুনলে সে হাসে। এখনকার যে প্রজন্ম, তাদের অনেকেই পড়ালেখা শিখে গ্রাম ছেড়ে গেছে। ইতিহাসের যে বিষয়, সেটা অনেকেই জানে না কিংবা জানলেও সেটা ধারণ করে না। প্রাচীন স্থাপনা, ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষার জন্য রাষ্ট্রীয় কোনো উদ্যোগও তো আমাদের এখানে নেই বা আমরা সেটাকে পৌঁছাতে পারিনি সে পর্যন্ত।’

জহরলাল সিং হাজারী সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষরা খোট্টা সম্প্রদায় ছাড়া আর কারও সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক করত না। আমার বাবা খোট্টা বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু পরের প্রজন্ম আমরা বাঙালি হিন্দু বিয়ে করেছি। বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে আমাদের যে খোট্টা সংস্কৃতি, সেটি হারিয়ে গেছে। বিয়ের রীতি হারিয়ে গেছে। শুধু মৃত্যুর পর ক্ষত্রিয় হিসেবে যে রীতি, সেটি আমরা এখনো ধরে রেখেছি।’

‘আমরা কেউ এখানে খোট্টা ভাষায় কথা বলি না। কিন্তু আমরা যখন ভারতে যাই, সেখানে আমাদের বংশীয় কাউকে পেলে বা এখানেও খোট্টা কাউকে পেলে আমরা আমাদের ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করি। তবে আমাদের সন্তানরা, মানে আমাদের পরের প্রজন্ম খোট্টা ভাষা আর জানে না, বংশীয় ইতিহাসও জানে না। আমরাই সেটা সংরক্ষণ করতে পারিনি,’— বলেন জহরলাল হাজারী।

ছবি: শ্যামল নন্দী, ফটোকরেসপন্ডেন্ট, সারাবাংলা

সারাবাংলা/আরডি/টিআর