Saturday 27 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

৩ মামলা, তবু অবাধে চলছিল তেতুলিয়া পরিবহনের ওই বাসটি!


২৫ মার্চ ২০১৯ ২৩:৫১ | আপডেট: ২৬ মার্চ ২০১৯ ০০:০০
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ঢাকা: রাজধানীর পশ্চিম শেওড়াপাড়ায় তেতুলিয়া পরিবহনের বাসের চাপায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারান ওয়ান ব্যাংকের মেকানিক নুরুল ইসলাম শান্ত (৩২)। জানা গেছে, ওই বাসটির নামে তিনটি মামলা রয়েছে। শুধু তাই নয়, ওই বাসের চালকের ভারি যানবাহন চালানোর লাইসেন্সও নেই। হালকা যান চালানোর লাইসেন্স থাকলেও মামলার কারণে লাইসেন্সটি ছয় মাস আগে জব্দ করা হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, ইনস্যুরেন্স, রেজিস্ট্রেশন ও ট্যাক্স টোকেন মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কারণে ছয় মাস আগেই গাড়ির নামে তিনটি মামলা দিয়েছিল ট্রাফিক পুলিশ। এ অবস্থাতেই গাড়িটি সড়কে চলছিল।

সোমবার (২৫ মার্চ) মিরপুর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মেহেদি হাসান মৌসুম সারাবাংলাকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এদিন, সকাল ১০টার দিকে পশ্চিম শেওড়াপাড়ায় নাজমা ফার্নিচারের সামনের সড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

বিজ্ঞাপন

এসআই মৌসুম বলেন, দুর্ঘটনার পর বাসটিসহ এর চালককে আটক করে স্থানীয় লোকজন পুলিশে দেয়। এসময় চালকের কাছ থেকে কাগজপত্র জব্দ করা হয়। পরে বিআরটিএ থেকে একজন পরিদর্শক এসে কাগজপত্র দেখে বাসের নামে তিনটি  ও চালকের নামে একটি মামলা থাকার কথা বলেছেন।

এসআই মৌসুম আরও বলেন, নিহতের চাচা থানায় এসে এজাহার দায়ের করেছেন। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এলে রাতে মামলা হবে। আগামীকাল (মঙ্গলবার) দুপুরের পর আসামিকে আদালতে তোলা হবে। লাশের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এখানেই বাসচাপায় প্রাণ হারান নুরুল, দেখাচ্ছেন একজন প্রত্যক্ষদর্শী

সোমবার পশ্চিম শেওড়াপাড়ার নাজমা ফার্নিচারের সামনে ঘটনাস্থলে পরিদর্শনে গেলে ওই দোকানের ম্যানেজার হাফিজুল্লাহ খান সারাবাংলাকে বলেন, মোটরসাইকেলের চালক মিরপুর ১০-এর দিকে যাচ্ছিলেন। তেতুলিয়া পরিবহনের বাসটিও দ্রুত গতিতে মিরপুর-১০-এর দিকে ছুটছিল। আমি বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ ‘ও বাবারে’ বলে একটা চিৎকার শোনা গেল। এরপরই দেখতে পাই, ছেলেটির বুকের ওপর দিয়ে বাসের পেছনের চাকা চলে গেছে। হেলমেট পরা মাথার অংশটি ছিল বাইরে, আর পায়ের অংশটি ছিল চাকার ভেতরের দিকে। একটু দূরে গিয়ে বাসটি দাঁড়িয়ে যায়। এরপর স্থানীয় লোকদের কেউ বাসের চালককে আটক করে, কেউ আহত ব্যক্তিকে একটি প্রাইভেট কারে তুলে আল হেলাল হাসপাতালে নিয়ে যায়।

ওই ফার্নিচারের দোকানের সামনে ঝাড়ু দিচ্ছিলেন শহীদ উল্লাহ। তিনি বলেন, বাসের ধাক্কা খাওয়ার পর ছেলেটি প্রথমে চাকার নিচে পড়ে, মোটরসাইকেলটি একদিকে ছিটকে যায়। ছেলেটিও পরে অনেক দূর চলে যায়। শরীরের বিভিন্ন স্থানে চামড়াগুলো জড়ো হয়ে গিয়েছিল। প্রাইভেট কারে হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও কাঁপছিল। তখনও রক্ত বের হয়নি। শুনেছি, আল হেলাল হাসপাতালে নেওয়া হলে তারা প্রাথমিক চিকিৎসাও দেয়নি। তখন তাকে পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

পরিবারের নির্ভরতা ছিলেন নুরুল ইসলাম শান্ত

সোমবার সন্ধ্যায় মিরপুর মডেল থানায় গেলে কথা হয় নুরুল ইসলাম শান্তর চাচা লোকমান হোসেনের সঙ্গে। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, নুরুল বিজয় সরণিতে ওয়ান ব্যাংকের গাড়ির ওয়ার্কশপে হেড ইঞ্জিন মেকানিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি স্ত্রী ও তিন বছরের ছেলে আবিরকে নিয়ে মগবাজারের আমবাগান নয়াটোলা এলাকায় একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন। তার গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরের হোসনাবাদ গ্রামে।

লোকমান হোসেন জানান, নুরুল প্রায় ১৫ বছর ধরে ঢাকায় থাকেন। ভোকেশনালে এসএসসি পাস করার পর ঢাকায় এসে জার্মান মেকানিকাল থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কয়েক বছর আগে ওয়ান ব্যাংকে যোগ দেন। তার বাবা সোহরাব হোসেনের বয়স ৭০ বছর। তিনি অসুস্থ হয়ে বাসায় রয়েছেন। তার মায়ের বয়স ৬৫ বছর। তার বড় ভাইয়ের বয়স ৪০ বছর। তবে নুরুলই ছিলেন পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।

নুরুলের স্ত্রী রেশমা বেগম সারাবাংলাকে বলেন, নতুন মোটরসাইকেল কিনেছিল। সকালে ৮টার দিকে বের হয় বাসা থেকে। অফিসে হাজিরা দিয়ে মিরপুর বিআরটিএতে যাওয়ার কথা ছিল মালিকানা পরিবর্তনের জন্য। সকাল ১০টার কিছুক্ষণ আগে ফোনে জানায়, অফিস থেকে বিআরটিএ যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরই মোবাইলে জানতে পান দুর্ঘটনার কথা।

কী বলছে চালকের পরিবার

এদিকে, মিরপুর মডেল থানায় বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে কথা হয় নুরুলকে চাপা দেওয়া তেতুলিয়া পরিবহনের ওই বাসের চালক সাইফুল ইসলামের মা-বাবা ও স্ত্রীর সঙ্গে। সঙ্গে সাইফুলের তিন বছরের মেয়ে আনিকাও ছিল। সাইফুলের মা শিরিন বেগম বলেন, লালমাটিয়া এলাকায় একটি টিনশেড বাড়ি ভাড়া নিয়ে সবাই থাকি। ছেলে একটাই, সাইফুল। দুই বছর হলো ড্রাইভারি শিখেছে। এর আগে লেগুনা চালাত, কিছুদিন হলো বাস চালায়। একহাজার টাকা দিন চুক্তিতে একদিন পরপর গাড়ি চালাত সাইফুল। তার আয় দিয়েই সংসার চলত।

শিরিন বেগম বলেন, সাইফুল পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত। কখনও নেশা করত না। কিভাবে যে এ ঘটনা ঘটল, বুঝতে পারছি না। এখন ছেলেকে কোথায় কিভাবে রাখবে, জানি না। কিভাবে ছেলেকে ছাড়াতে হবে, তাও জানি না। বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মা।

ছেলের সঙ্গে দেখা হয়েছিল বলেও জানান শিরিন বেগম। তিনি বলেন, ছেলে বলছে, আমি বুঝতেই পারিনি যে সে (নুরুল) আমার বাসের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছে। বাসের পেছনের চাকার নিচে পড়েছে, এতে আমার দোষ কী!

উল্লেখ্য, গত ১৯ মার্চ রাজধানীর বসুন্ধরা গেট এলাকায় যমুনা ফিউচার পার্কের সামনের সড়কে সুপ্রভাত বাসের চাপায় প্রাণ হারান বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী। এ ঘটনার প্রতিবাদে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করেন তার বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সেই দাবিতে সমর্থন জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও। ওই বাসের চালক এখন রিমান্ডে রয়েছে।

সারাবাংলা/ইউজে/টিআর