ঢাকা: দেশের বৃহত্তম ইসলামী ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ গঠনে শুধু যোগ্যতা নয়, সম্ভাব্য সদস্যদের সামাজিক ও সংশ্লিষ্ট মহলে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও বিবেচনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ কারণে ব্যাংকটির পর্ষদ গঠনে কিছুটা সময় লাগছে- বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।
রোববার (২৩ আগস্ট) সাংবাদিকদের এসব কথা জানান তিনি।
তিনি বলেন, ব্যাংকটির কার্যক্রম যাতে নতুন করে অস্থিতিশীল না হয়, সে বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। বর্তমানে আরজেএসির ১৮৪ ধারার আওতায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ব্যাংকটির কার্যক্রমে একটি সেতুবন্ধনের ভূমিকা পালন করছেন। তিনি নিয়মিত ব্যাংকে বসছেন, ব্যবস্থাপনার সঙ্গে কথা বলছেন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তুলে ধরছেন।
পর্ষদ গঠন নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘পর্ষদ গঠন হচ্ছে না’—বিষয়টিকে এভাবে দেখা ঠিক হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক একটি স্থিতিশীল ও পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ গঠনের জন্য কাজ করছে।
তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ যে আবশ্যক, এটা বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্যই বিশ্বাস করে এবং চাচ্ছে একটা স্থিতিশীল বোর্ড গঠিত হোক। যার কারণে এই বোর্ডের কোনো সদস্য নিয়ে ব্যাংকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো কর্নার থেকে যাতে কোনো আপত্তি না আসে, এজন্য বিষয়টা সময় নিচ্ছে।
পর্ষদ গঠনে এত সময় লাগার কারণ হিসেবে যোগ্য ব্যক্তির সংকট রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, বিষয়টি শুধু যোগ্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
আরিফ হোসেন খান বলেন, যোগ্যতার বিভিন্ন মাপকাঠি রয়েছে। অনেক যোগ্য ব্যক্তিও সমাজের কাছে কিংবা সমাজের কোনো একটি গোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারেন। তাই পর্ষদ গঠনের ক্ষেত্রে যোগ্যতার পাশাপাশি গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
তার ভাষায়, ‘শুধু যোগ্যতার বিষয় না, যোগ্যতার পাশাপাশি গ্রহণযোগ্যতারও একটা বড় বিষয়। এই দুইটাকে একসঙ্গে ম্যাচ করেই আমরা পর্ষদ গঠনের চেষ্টা করছি—এই কারণে বিষয়টা একটু সময় নিচ্ছে।’
তবে কবে নাগাদ ব্যাংকটির পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ গঠন করা হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা দিতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নির্দিষ্ট করে কোনো টাইমলাইন দেওয়া যাচ্ছে না যে কবে নাগাদ পর্ষদ গঠিত হবে।
মুখপাত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ না থাকলেও ব্যাংকটির কার্যক্রম থেমে নেই। ১৮৪ ধারার আওতায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। একই সঙ্গে ব্যাংকের বিভিন্ন বিষয় বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে তুলে ধরা হচ্ছে।
ফলে পর্ষদ গঠন না হওয়া পর্যন্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে সমন্বয়ের একটি ব্যবস্থা চালু রয়েছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই অবস্থানের মূল লক্ষ্য হলো, দেশের বৃহৎ এই ইসলামী ব্যাংককে নতুন কোনো অনিশ্চয়তা বা অস্থিতিশীলতার মধ্যে না ফেলা। বিশেষ করে বিপুলসংখ্যক আমানতকারী ও গ্রাহকের স্বার্থ বিবেচনায় রেখেই পরবর্তী পর্ষদ গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
অন্য এক প্রসঙ্গে আরিফ হোসেন খান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক খাতে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, তা এক-দেড় বছরের মধ্যে পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। তবে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর বিষয়ে রাজনৈতিক পর্যায়ে ঐকমত্য রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, বর্তমান সংসদে যারা সরকারে আছেন এবং যারা বিরোধী দলে আছেন—উভয় পক্ষই অন্তত এই বিষয়ে একমত যে আর্থিক খাত, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে।
তার মতে, ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যা কাটিয়ে উঠতে সময় প্রয়োজন। তবে সেই সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে একটি অভিন্ন লক্ষ্য থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামী ব্যাংকসংক্রান্ত একটি সিদ্ধান্তের বিষয়ে রাজনৈতিক চাপ ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবেও অবস্থান স্পষ্ট করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র।
তিনি বলেন, কোনো একটি রাজনৈতিক দলের ওই আন্দোলনের পেছনে সহায়তা বা সম্মতি থাকতে পারে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক ওই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় রাজনৈতিক চাপ অনুভব করেনি।
বরং বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে এবং গ্রাহকদের একটি বড় অংশের পছন্দকে সম্মান জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছিল বলে জানান তিনি।
আরিফ হোসেন খান বলেন, এটিকে সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য করা ঠিক হবে না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক রাজনৈতিক চাপটা অনুভব করেনি। তারা এর বিশাল যে গ্রাহক আছে, গ্রাহকদের স্বার্থ বিবেচনা করে, যেহেতু এটা বড় গ্রুপ গ্রাহকদের মধ্যে, সে নিয়োগটাকে পছন্দ করে নাই, তাদের পছন্দের কে সম্মান দেখিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছিল। এটাকে ঠিক রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য করা ভুল হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ বক্তব্যে স্পষ্ট হচ্ছে, ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পর্ষদ গঠনে মূল বিবেচনা থাকবে ব্যাংকের স্থিতিশীলতা, সম্ভাব্য পরিচালকদের যোগ্যতা, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা এবং গ্রাহকদের স্বার্থ। তবে সেই প্রক্রিয়া শেষ করার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।