ঢাকা: সমাপ্ত ২০২৫–২৬ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণে নতুন রেকর্ড গড়েছে দেশের ব্যাংকিং খাত। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে কৃষক ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের মধ্যে ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি ১৬ লাখ টাকার ঋণ বিতরণ করেছে ৫৮টি ব্যাংক। নির্ধারিত ৩৯ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এ অর্জন ১০৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ। আগের অর্থবছরের তুলনায় কৃষিঋণ বিতরণ বেড়েছে প্রায় ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় কৃষি খাতে অর্থায়ন সম্প্রসারণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সেই লক্ষ্যেই বিশেষায়িত, রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি, বিদেশি ও ইসলামী ব্যাংকসহ মোট ৫৮টি ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কৃষিঋণ বিতরণে সবচেয়ে ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো। এ খাতের ব্যাংকগুলো ১০ হাজার ২২৩ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বিতরণ করেছে ১২ হাজার ৬১৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার ১২৩ দশমিক ৪ শতাংশ অর্জন করেছে তারা। কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় ভূমিকার কারণেই এই সাফল্য এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এ খাতের ব্যাংকগুলো নির্ধারিত লক্ষ্যের ১০৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ কৃষিঋণ বিতরণ করেছে। একইভাবে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো লক্ষ্যমাত্রার ১০৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বিদেশি ব্যাংকগুলো ১০৪ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জন করেছে।
তবে ব্যতিক্রম ছিল ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো। এসব ব্যাংক ৬ হাজার ৪২১ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বিতরণ করেছে ৬ হাজার ৫৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা। ফলে তাদের অর্জন দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকের তারল্য সংকট, আমানত প্রত্যাহারের চাপ এবং অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনের প্রভাব কৃষিঋণ বিতরণেও পড়েছে বলে ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
মাসভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুরো অর্থবছরে কৃষিঋণ বিতরণে ওঠানামা ছিল। ডিসেম্বর ২০২৫-এ সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৯১৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকার ঋণ বিতরণ হয়। এরপর জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চে বিতরণে ধারাবাহিক ধীরগতি দেখা যায়। এপ্রিলে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও মে মাসে আবার বিতরণ কমে যায়। তবে অর্থবছরের শেষ মাস জুনে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে জোর দেয়। ফলে জুনে এক মাসেই ৪ হাজার ৭৫৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকার কৃষিঋণ বিতরণ হয়, যা আগের মাসের তুলনায় প্রায় ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। শেষ মুহূর্তের এই গতি পুরো অর্থবছরের রেকর্ড অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
খাতভিত্তিক ঋণ বিতরণের চিত্রেও কৃষি উৎপাদনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মোট বিতরণ করা কৃষিঋণের ৪৭ দশমিক ৩২ শতাংশ গেছে ফসল উৎপাদন খাতে। প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি খাতে বিতরণ হয়েছে ২৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ, মৎস্য খাতে ১৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ এবং অ-কৃষি পল্লী ঋণ হিসেবে বিতরণ হয়েছে ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ। সেচ, কৃষিযন্ত্র ও অন্যান্য অবকাঠামোগত খাতে তুলনামূলক কম ঋণ গেলেও খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির কর্মসংস্থান ধরে রাখার লক্ষ্যেই অধিকাংশ অর্থায়ন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ইতিবাচক এই চিত্রের পাশাপাশি উদ্বেগের বিষয়ও রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কয়েকটি ব্যাংকে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি কৃষিঋণের পরিমাণ বেড়েছে। যদিও সামগ্রিকভাবে কৃষিঋণ বিতরণে রেকর্ড অর্জিত হয়েছে, তবুও ঋণের গুণগত মান ধরে রাখা এবং সময়মতো আদায় নিশ্চিত করা আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে কৃষিঋণের বড় অংশ যদি খেলাপিতে পরিণত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে নতুন ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা কমে যেতে পারে।