ঢাকা: দেশের পাঁচটি সংকটাপন্ন ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) বন্ধ বা অবসায়নের পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আরও চারটি প্রতিষ্ঠানকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৯ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভা-সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, অবসায়নের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হওয়া পাঁচটি প্রতিষ্ঠান হলো—এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস। অন্যদিকে বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স ও প্রাইম ফাইন্যান্সকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ হিসেবে তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, বন্ধের সিদ্ধান্ত হওয়া পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৭ হাজার ব্যক্তি আমানতকারীর মোট দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকা জমা রয়েছে। প্রথম ধাপে এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করা হবে। এরপর প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে রেজুলেশন প্রক্রিয়া শুরু হবে। প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কাজ শুরু হবে। প্রাথমিকভাবে প্রত্যেক ব্যক্তি আমানতকারী সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন।
তিনি বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানকে তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে, তাদের এ সময়ের মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীদের মূল অর্থ পরিশোধে সক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে। তা না হলে সেগুলোকেও রেজুলেশন বা অবসায়ন প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে এফএএস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার ছিল ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। ফারইস্ট ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণ ৯৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, আভিভা ফাইন্যান্সের ৯৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ, পিপলস লিজিংয়ের প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ৯৯ দশমিক ৪৪ শতাংশে পৌঁছেছে।
উচ্চ খেলাপি ঋণ ও আমানত ফেরতে ব্যর্থতার কারণে গত বছরের মে মাসে ২০টি এনবিএফআইকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা সন্তোষজনক না হওয়ায় নয়টি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স ও বিআইএফসিকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। সর্বশেষ পর্ষদ সভায় প্রিমিয়ার লিজিংকে সাময়িক ছাড় দিয়ে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। আলোচিত ঋণ কেলেঙ্কারির অন্যতম ব্যক্তি পিকে হালদারের বিরুদ্ধে পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স ও বিআইএফসি থেকে অন্তত সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে তারল্য সংকট, উচ্চ খেলাপি ঋণ ও দুর্বল সুশাসনের চাপে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতেই বাংলাদেশ ব্যাংক রেজুলেশন কাঠামোর আওতায় এই নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষ করে আমানত ফেরত না পেয়ে ভোগান্তিতে থাকা গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষায় এ উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সারাবাংলা/এসএ/এসআর