ঢাকা: বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ কর্পোরেট শাখায় ঘটেছে একটি বড় ধরনের আর্থিক জালিয়াতির ঘটনা। পারফেক্ট নিটওয়্যার প্রাইভেট লিমিটেড-কে ২৭ কোটি টাকা ঋণ দেয় ব্যাংকটি। কোন ধরনের জামানত ছাড়াই দেওয়া হয় এই ঋণ। কোন কিস্তি না দিয়েই পারফেক্ট নিটওয়্যার ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) রাফাত হোসেন দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে (ইউএসএ) পালিয়েছেন। কিস্তি না দেওয়ার পরও ২১ কোটি ২৩ লাখ টাকার সুদ মওকুফ করেছে ব্যাংকটি। বিষয়টি নিয়ে বিপাকে পড়েছে সোনালী ব্যাংক।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন ঘটনা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তের করা দরকার। রাফাত হোসেনের বিদেশি সম্পত্তি থেকে টাকা উদ্ধারের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দরকার, যেমন মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের অধীনে। এই ধরনের জালিয়াতি রোধে ব্যাংক খাতে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং স্বচ্ছতা আনতে হবে। জনগণের টাকা রক্ষা করতে সরকার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
জানা গেছে, বিভিন্ন নামে ঋণ নিয়ে প্রায় ২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে রাফাত হোসেন। পরবর্তীতে এ ঘটনায় ব্যাংক কর্মকর্তাদের ঘুষ গ্রহণ এবং অসচ্চলতার মাধ্যমে ঋণ মাফের অভিযোগও উঠেছে। জনগণের টাকার অপব্যবহার। যা দেশের ব্যাংক খাতে দুর্নীতির একটি নতুন অধ্যায় যোগ করতে পারে।
সোনালী ব্যাংকের নথিসূত্রে জানা গেছে, সোনালী ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ কর্পোরেট শাখা থেকে পারফেক্ট নীটওয়্যার প্রাইভেট লিমিটেডের নামে বিভিন্ন সময়ে ঋণ প্রদান করা হয়। কোম্পানির এমডি রাফাত হোসেন মোট ২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার ঋণ, যার মধ্যে প্রধান অংশটি ছিল ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল লোন এবং এক্সপোর্ট ক্রেডিট। কিন্তু ঋণ নেওয়ার পর তিনি কোনো সুদ বা মূল অর্থ ফেরত না দিয়ে সমস্ত টাকা নিয়ে আমেরিকায় চলে যান।
নথিতে উল্লেখ আছে যে, রাফাতের ইউএসএ-তে সম্পত্তি রয়েছে, যেমন নিউ ইয়র্কের হিকসভিলে ১৫ একর লেন একটি বাড়ি (৩০ কোটি টাকা মূল্যের) এবং জ্যামাইকা বিরাট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান (৩০ কোটি টাকা মূল্যের)। এছাড়া, বাংলাদেশে তার অনেক সম্পত্তি রয়েছে, যা ঋণ আদায়ের জন্য বাজেয়াপ্ত করা যেতে পারত।
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি অভ্যন্তরীণ দলিল (১৫ ডিসেম্বর ২০২৫) অনুসারে, ব্যাংকের কর্মকর্তারা এই ঋণকে ‘নন-পারফর্মিং লোন’ (এনপিএল) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং ২৩ কোটি টাকা (মূল ২২ কোটি + সুদ) মাফ করার (রাইট-অফ) প্রস্তাব করেছেন। এই মাফের পেছনে ঘুষের লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। দলিলে স্বাক্ষরকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ ব্যক্তি।
তবে এসব অভিযোগের পর দায়সারা বক্তব্য দিচ্ছেন সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তারা। সোনালী ব্যাংক পিএলসির নারায়ণগঞ্জের প্রিন্সিপাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মোবারক হোসেন বলেন, ‘আমি এখন কিছু বলবো না। অফিসে আসেন একদিন সামনা-সামনি কথা বলি। ফোনে এসব কথা বলা যাবে না।’
সোনালী ব্যাংকের নথিতে আরও দেখা গেছে, ২১ কোটি ২৩ লাখ টাকা মওকুফ করা হয়েছে। বিপরীতে আদায়যোগ্য রাখা হয়েছে মাত্র ৬ কোটি ৩৪ লাখ ৬২ হাজার ৬২৬ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ঋণ প্রদানের সময় কোনো জামানত রাখা হয়নি, যা ব্যাংকিং নিয়মের সরাসরি লঙ্ঘন। ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং দুর্নীতির অভিযোগ অভিযোগ উঠেছে যে, ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা ঘুষ নিয়ে এই ঋণ মঞ্জুর করেছেন এবং পরবর্তীতে মাফের প্রক্রিয়া চালিয়েছেন। এই কর্মকর্তারা অসচ্চলতার মাধ্যমে ঋণ পূরণের কাজ করেছেন বলে অভিযোগ। ফলে ব্যাংকের নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল) বেড়েছে, যা সরাসরি জনগণের জমা টাকার উপর প্রভাব ফেলে। সোনালী ব্যাংকের মতো সরকারি ব্যাংকের এই ধরনের কার্যকলাপ অগ্রহণীয়, কারণ এটি জনগণের টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুসারে, এনপিএল লোনের জন্য জামানত বাজেয়াপ্ত করা উচিত, কিন্তু এখানে উল্টো মাফ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবশ্যই ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে সাবধান হতে হবে এবং সহনীয় হতে হবে। ব্যাংকগুলোর চিহ্নিত করতে হবে যে মাঠ পর্যায়ের উদ্যোক্তা কারা রয়েছেন। এসএমইদের মধ্যে যারা ভালো উদ্যোক্তা রয়েছেন তাদের চিহ্নিত করতে হবে। রপ্তানির পার্ফরমেন্সের ক্ষেত্রেও সোনালী ব্যাংককে আরও বেশি শক্তিশালী করতে হবে।
সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাখাওয়াত আলী খান-কে বার বার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেন নি। এর আগে তার অফিসে গিয়েও সাক্ষাৎ পাননি।
পারফেক্ট নীটওয়্যার প্রাইভেট লিমিটেড-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক (এমডি) রাফাত হোসেনের বাংলাদেশি ফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া গেছে। ওই নম্বরে তাকে হোয়াটসঅ্যাপেও পাওয়া যায়নি।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইএনএফ)-এর সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘এই জালিয়াতি সাধারণ মানুষের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। সোনালী ব্যাংক সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায়, এর ক্ষতি ভর্তুকি হিসেবে ট্যাক্সপেয়ারের টাকা থেকে দেওয়া হয়। এনপিএল বাড়লে ব্যাংকের লাভ কমে, যা জনগণের সুদের হার এবং সেবায় প্রভাব ফেলে। ’
তিনি আরও বলেন, ‘এখানে সুশাসনের অভাবে এই ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। তাই পুরো ব্যাংক খাতেই সুশাসন চালু করা দরকার। ’