ঢাকা: দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং শরিয়াহ্ মান্যতা শক্তিশালী করতে বড় ধরনের সংস্কারের ইঙ্গিত দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংক-এর গভর্নর।
তিনি বলেছেন, শরিআহ বোর্ডের সদস্যরা স্বাধীনভাবে কাজ করবেন, সেন্ট্রাল ব্যাংক তাদের পূর্ণ সুরক্ষা প্রদান করবে।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) বাংলাদেশ ব্যাংক এ তথ্য জানায়।
গত ৩০ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল ভবনে অনুষ্ঠিত “ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বর্তমান পরিস্থিতি, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয়” শীর্ষক মতবিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি দেশের শীর্ষস্থানীয় শরিয়াহ্ বিশেষজ্ঞ, আলেম-উলামা এবং প্রায় সব ইসলামী ব্যাংকের শরীয়াহ্ বোর্ডের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
গভর্নর বলেন, অতীতে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অর্থপাচারের ঘটনা ঘটেছে। এর অন্যতম কারণ ছিল যথাযথ তদারকির অভাব।
তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকিং মূলত সম্পদভিত্তিক কাঠামোর উপর পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেই কাঠামো পুরোপুরি অনুসরণ না হওয়ায় ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে, যা উদ্বেগজনক।
শরিয়াহ বোর্ডকে ক্ষমতায়নের ওপর জোর দিয়ে গভর্নর বলেন, ইসলামী ব্যাংকিং সঠিক পথে ফেরাতে হলে শরিয়াহ বোর্ডকে কার্যকর ও শক্তিশালী করতে হবে।তাদের সিদ্ধান্তকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে,পরিচালনা পর্ষদের প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে ওস্বাধীনভাবে কাজের আইনি নিশ্চয়তা দিতে হবে।
তিনি মনে করেন, শক্তিশালী শরিয়াহ গভর্ন্যান্স নিশ্চিত হলেই প্রকৃত তদারকি ফিরে আসবে।
সভায় অংশ নেওয়া আলেম-উলামারা ইসলামী ব্যাংকিং খাতের সংকট উত্তরণে ২০ দফা সুপারিশ তুলে ধরেন। উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবগুলো হলো-
১. মৌলিক নীতির বাস্তবায়ন:সুদমুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা,প্রতারণামুক্ত লেনদেন ও লাভ-ক্ষতি ভাগাভাগি ভিত্তিক বিনিয়োগ।
২. তদারকি ও কাঠামোগত সংস্কার: শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটি, সেক্রেটারিয়েট ও অডিট শক্তিশালী করা,বড় বিনিয়োগে অন্তত ৩ সদস্যের শরিয়াহ অনুমোদন বাধ্যতামূলক ওমুরাকিবদের (শরিয়াহ অডিটর) সুরক্ষা নিশ্চিত।
৩. আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা:স্বতন্ত্র “ইসলামী ব্যাংকিং আইন” প্রণয়ন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জন্য আলাদা ডেপুটি গভর্নর ওপৃথক কমপ্লায়েন্স বিভাগ গঠন।
৪. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা:বছরে অন্তত একবার বাহ্যিক শরিয়াহ অডিট,Shariah Compliance Rating চালু ও আলাদা কোর ব্যাংকিং সিস্টেম ।
৫. মানবসম্পদ উন্নয়ন:ব্যাংক পরিচালক ও এমডিদের শরিয়াহ জ্ঞান বাধ্যতামূলক,আলেমদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ব্যাংকে অন্তর্ভুক্তি ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী অর্থনীতি বিভাগ চালু।
৬. আর্থিক ও বাজার সংস্কার:শরিয়াহসম্মত মুদ্রাবাজার উপকরণ চালু,তারল্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা ও খেলাপি বিনিয়োগ দ্রুত আদায়ে নীতিমালা।
৭. কঠোর শাস্তির দাবি:অর্থপাচার ও বড় দুর্নীতিকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে গণ্য করার আহ্বান,কঠোর ফৌজদারি শাস্তির দাবি ও ইসলামী ব্যাংকিং হাব গড়ার পরিকল্পনা।
আলোচনায় বাংলাদেশকে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাবও উঠে আসে। এজন্য-গবেষণা কেন্দ্র ও সমৃদ্ধ লাইব্রেরি স্থাপন,আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজন, বিশ্বখ্যাত শরিয়াহ স্কলারদের আমন্ত্রণ ও কনভেনশনাল ব্যাংকেও ইসলামী সেবা।
বক্তারা প্রস্তাব দেন, ধীরে ধীরে সব কনভেনশনাল ব্যাংককে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে রূপান্তরের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি, সব ব্যাংকের শাখায় ইসলামী ব্যাংকিং সেবা চালুর কথাও বলা হয়।
গভর্নর তার বক্তব্যে ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ব্যাংক ও হাসপাতাল—দুটি খাতই মানুষের সেবার জন্য, তাই এগুলোকে সব ধরনের প্রভাবমুক্ত রেখে পরিচালনা করতে হবে।
সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের শরীয়াহ অ্যাডভাইজরি বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে অধ্যাপক ড. আবু বকর রফিক, মুফতী শাহেদ রহমানী, ড. মুফতী ইউসুফ সুলতানসহ শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকের শরীয়াহ বোর্ডের চেয়ারম্যান ও প্রতিনিধিরা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ইসলামিক স্কলার ও খ্যাতিমান আলেম-উলামারা সভায় অংশ নেন।