ঢাকা: ঈদ মানেই খুশি, ঈদ মানেই আনন্দ। কিন্তু সেটা সবার জন্য নয়। বিশেষ করে পিতা-মাতাহীন পথ শিশুদের জন্য ঈদের দিন আরেকটা দিনের মতোই। তবে কেউ কেউ ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিকভাবে শিশুদের জন্য আলাদাভাবে ব্যবস্থা নিয়েছিল। ফলে একদিন কিছু সময়ের জন্য হলেও খুঁজে পেয়েছিল আনন্দ। তবে ছিন্নমূল মানুষের ঈদের আনন্দ ঈদের আগের রাতের বৃষ্টির কারণে কিছুটা ম্লান হয়েছে।
নাসির হোসেন (১২) নামের এক পথ শিশু শহীদ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঈদের পরদিন রোববার (২২ মার্চ) একশ টাকায় একটি মোরগের বেলুন কিনে মনের সুখে উড়াচ্ছিল। তার ভাষায়, ঈদের দিন তার কাছে খুব বেশি নতুন কোন বিষয় নয়। যথারীতি আরেকটা দিনের মতোই কেটেছে। কারণ বাবা-মা ও পরিবার ছাড়া তার ঈদ একদম ভাল কাটে না। বছরের অন্যদিনে পানির বোতল হাতে নিয়ে বিক্রি জন্য বের হলেও ঈদের দিন পানি বিক্রি করেনি নাসির। নাসির বলে, প্রতিদিন তো পানি বিক্রি করি। এবার ঈদে বোতল হাতে নেয়নি। অন্যান্য শিশুদের সাথে খেলা ধুলায় কাটিয়েছে নাসির।
আসমা আক্তার (১০) একই উদ্যানে ২০ টাকায় বরফ কিনে খাচ্ছিল। আসমা বলেছে, এবারের ঈদ তার ভাল কেটেছে। ঈদের আগে ফুল বিক্রি করে, আসমা বেশ কিছু টাকায় আয় করেছে। সেই টাকা দিয়ে নতুন জামা-কাপড় কিনেছে বাজার থেকে। নতুন জামায় ঈদের আনন্দ বেড়েছে আগের বছরের চেয়ে।
কিছু ছিন্নমূল শিশুর শরীরে নতুন জামা দেখা গেলেও অনেকের ভাগ্যে তা জোটেনি। এসব ভাসমান পরিবারের প্রধানদের কাছে ঈদ যেন হতাশার আরেক নাম। কারণ, ঈদ এলে শিশুদের নতুন জামা, ভালো খাবার বা ঘোরার বায়না থাকে। কিন্তু দিনমজুরির টানাপোড়েন কিংবা ভিক্ষার ওপর নির্ভরশীল জীবনে সেই চাহিদা পূরণ করা অনেক সময়ই অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে উৎসবের দিনও তাদের কাছে রয়ে যায় বর্ণহীন।
এছাড়া সমাজের এক বড় অংশ—ছিন্নমূল ও অসহায় মানুষদের কাছে এই আনন্দ খুব কমই ধরা দেয়। ভালো খাবার কিংবা নতুন জামা-কাপড় তাদের জীবনে অনেক সময়ই অধরা থেকে যায়। অনেকের ঈদের দিন কাটে ফুটপাতে বসে বা শুয়েই, অন্য দিনের মতোই।
সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ঈদের ছুটিতে ঢাকা শহর অনেকটাই ফাঁকা। কিন্তু ফুটপাত, পার্ক কিংবা রাস্তার পাশে যাদের থাকা-খাওয়া ও ঘুম—তারা রয়েছেন নগরীতেই। অন্য দিনের মতোই তাদের ঈদের দিন কেটেছে। রাস্তার পাশে থাকা পরিবারগুলোর শিশুরা পথচারীদের কাছে সাহায্য চাইছে। কেউ কেউ ঈদ উপলক্ষে তাদের দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন।
এসব হতদরিদ্র মানুষ জানান, প্রতিদিনই টিকে থাকার সংগ্রামে ব্যস্ত থাকতে হয় তাদের। অনেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী। কেউ টাকা দিলে তা দিয়ে খাবার কিনে খেতে হয়। কোনও কোনও দিন খাবার না পেলে শুধু পানি খেয়েই কাটাতে হয় দিন।
হাইকোর্ট এলাকায় দেখা যায় ছিন্নমূল দম্পতি রহিম মিয়া ও আছিয়া বেগমকে। পাশে তাদের চার বছরের সন্তান বৃষ্টি। রহিম মিয়া বলেন, আমরা এখানেই থাকি। ঈদের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকে। অন্যদের ঘরে উৎসব থাকলেও আমাদের সেই উৎসব নেই। ভিক্ষা করেই জীবন চলে।
রাহেলা বেগম বলেন, ঈদ এলে অন্যরা নতুন জামা-কাপড় কিনে, ভালো খাবার খায়, ঘোরে। আমরা গরিব মানুষ—সদরঘাটের ফুটপাতে থাকি, ফুটপাতেই খাই।”
তাঁতীবাজারের ফুটপাতে থাকা জুলেখা বলেন, “দুই সন্তান নিয়ে রাস্তায় থাকি। বাঁচতেই তো কষ্ট হয়। আমাগোও ঈদ করতে ইচ্ছা করে। কিন্তু কী করমু? টাকা-পয়সা নাই। থাকলে ঈদে নতুন কাপড় কিনতাম।”
রমজান ও ঈদের সময় অন্য সময়ের তুলনায় ভিক্ষা কিছুটা বেশি পেয়েছেন বলে জানান জামাল আলী। তবে ঈদ উপলক্ষে তিনি অন্য কোনো সহায়তা পাননি।
সদরঘাট, ভিক্টোরিয়া পার্ক, রায়সাহেব বাজার, তাঁতীবাজার, লক্ষীবাজার ও কলতাবাজারসহ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এসব জায়গার ফুটপাতে বসে বা শুয়ে আছেন অনেক মানুষ। ঈদের দিনেও তাদের জীবনে নেই উৎসবের ছোঁয়া। কেউ কিছু দেবে—এই আশায় অপেক্ষা করছেন তারা। ভিক্ষা কিংবা সামান্য সহায়তার জন্য এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ছুটছেন।