Friday 20 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

সড়কে ঝড়ল একই পরিবারের ৪ জনের প্রাণ, শোকে স্তব্ধ তালুক শাহবাজ গ্রাম

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২০ মার্চ ২০২৬ ০৯:৫০ | আপডেট: ২০ মার্চ ২০২৬ ১১:৪১

রংপুর: রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তালুক শাহবাজ গ্রামে এখন ঈদ নয়, শুধুই শোকের সাগর। ঢাকা থেকে ঈদ উদযাপনের আনন্দে বাড়ি ফিরছিলেন ১৭ জন আত্মীয়স্বজন। কিন্তু গত বুধবার (১৮ মার্চ) সকাল সাড়ে সাতটার দিকে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ছোনকা এলাকায় ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কে মাইক্রোবাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিভাজকে ধাক্কা খেয়ে উলটে যায়।

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের চার সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন—১২ বছরের শিশু তাইয়্যেবা ইসলাম, তার চাচা মমিনুল ইসলাম ওরফে রিন্টু (৪৫), চাচি মরিজন বেগম (৪০) এবং ফুফু শিউলি বেগম (৬০)। এই দুর্ঘটনায় অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক।

বিজ্ঞাপন

কাউনিয়া উপজেলার তালুক শাহবাজ গ্রামের কাঁচা রাস্তা থেকে খানিকটা নিচুতে অবস্থিত মমিনুলের বাড়ির উঠানে এখনও চারটি খাটিয়া সাজানো। উঠানের বাঁ পাশে পুরোনো কবরের পাশেই খোঁড়া হয়েছে নতুন একটি কবর। গতকাল রাতেই সেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছে ছোট্ট তাইয়্যেবা। বাকি তিনজনকে দাফন করা হয়েছে গ্রামের পার্শ্ববর্তী কাউনিয়া উপজেলা কেন্দ্রীয় গোরস্থানে। একই গ্রামের এই চার প্রাণের চলে যাওয়ায় পুরো তালুক শাহবাজ যেন নীরব হয়ে গেছে। কোথাও নেই ঈদের হাসি, নেই আনন্দের কোলাহল—শুধু চোখের জল আর বুকভাঙা হাহাকার।

গ্রামবাসী আবদুল গফুর (৬০) কণ্ঠে যেন গোটা গ্রামের বেদনা উঠে এসেছে। তিনি বললেন, ‘এতগুলো মানুষ একসঙ্গে চলে গেল। কাল থেকে আমাদের কোনো আনন্দ নেই। এই গ্রামে ঈদ নাই। সবার মন দুঃখে ভাঙি গেছে।’

পাশের বাড়ির অটোচালক সোলায়মান আলীও চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘রিন্টুর সোনার সংসারটা চোখের জলে ভেসে গেল।’

দুর্ঘটনাকবলিত পরিবারের বড় ভাই সাইফুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) রাত সাড়ে ৮টায় রাজধানীর শাহবাগ থেকে মাইক্রোবাস ভাড়া করে তারা বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। গাড়িতে ছিলেন নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ মিলিয়ে ১৭ জন আত্মীয়। সাহরির সময়ও তারা গ্রামের আত্মীয়স্বজন্দের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন। কিন্তু চালক রাস্তা চিনতে ভুল করে পাবনার দিকে চলে যান। অনেক দূর গিয়ে ফিরে আসার সময় তাড়াহুড়োয় গাড়ি চালাতে থাকেন।

সাইফুলের ভাষায়, ‘এটা দুর্ঘটনা নয়, এটা ইচ্ছা করে মানুষ মারা। রোড চেনেন না, তবু ১৩০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি ছুটছিলো। ওভারব্রিজ থেকে নামার সময়ও স্লো করেননি। শুনেছি, ড্রাইভার দুই রাত ধরে ঘুমাননি, শুধু ভাড়ার তাড়ায় ছুটছিলেন।’

দুর্ঘটনার ভয়াবহ মুহূর্তের বর্ণনা দিয়েছেন বেঁচে ফেরা তরিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দ। গাড়ি উলটে যাচ্ছে। চোখ খুলে দেখি, গাড়িতে আগুন জ্বলছে। স্ত্রী-সন্তানদের খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আগুনের তাপ বাড়ছিল। স্থানীয় লোকজন না সাহায্য করলে আমরা বাঁচতাম না।’

তরিকুল হাইকোর্টের একজন বিচারপতির ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, তার স্ত্রী অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে চাকরি করেন। কিন্তু আজ তাদের সোনার সংসারও ছিন্নভিন্ন।

দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন তাইয়্যেবার বাবা শহিদুল ইসলামসহ অনেকে। শহিদুলের স্ত্রী রুম্মান রুমীর পা ও কোমর ভেঙে গেছে, মেয়ে তাসমিয়া (২১) পায়ে আঘাত পেয়েছেন। তাদের চিকিৎসা চলছে রংপুর কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যজনকভাবে বেঁচে গেছে মাত্র ১ বছর ৪ মাসের শিশু ফাতেমা জান্নাত ইলহাম। তার বাবা তরিকুল, মা মিতু আক্তার ও ভাই আবদুল্লাহ আল আরহামও গাড়িতে ছিলেন। আহত শিশুটিকে প্রথমে বগুড়া মেডিকেলে নেওয়া হয়, পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে তার অবস্থা এখন স্থিতিশীল।

বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) রাত সাড়ে ১০টায় গাজীরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন হয়।

সারাবাংলা/এনজে
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর