ঢাকা: খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের নাকের ডগায় দেদারছে কেনাবেচা হচ্ছে নতুন নোট। সেখানে হাজার বা লাখ টাকায় ব্যবসা সীমাবদ্ধ নয়। কোটি টাকার ব্যবসা চলছে। আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে নতুন টাকার ব্যবসা রমরমা আর ধারণ করেছে। মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ইমতিয়াজ আহমেদ মাসুম ও নার্গিস সুলতানার বিশেষ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে টাকার জোগান দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এদের মাধ্যমে বাড়তি দরে করপোরেট লেভেলেও টাকার সরবরাহ করা হয়। এমনকি অগ্রিম টাকা পরিশোধে বাড়তি টাকার জোরে অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিমা ও করপোরেট লেভেলেও টাকা পৌঁছে যায়। এভাবে টাকার ব্যবসা ওপেন সিক্রেটই পৌঁছেছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর মতিঝিল, গুলিস্তানসহ বিভিন্ন লেভেলে অবৈধ টাকার হাট গড়ে উঠেছে। আর এই টাকার উৎস কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কারেন্সি বিভাগের সঙ্গে জড়িত একটি সিন্ডিকেট। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি অফিসার (সিও) ও মতিঝিল অফিসের নির্বাহী পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ মাসুম ও পরিচালক নার্গিস সুলতানা নতুন নোট ইস্যু করে বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাফ স্টাফের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের আটট গেট সংলগ্ন বটতলা, গুলিস্তানসহ ঢাকা শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে দালালদের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে অবাধে টাকা সরবরাহ করছেন।
জানা যায়, সদ্য সাবেক কারেন্সি অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) নার্গিস সুলতানার সইয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন নোট ইস্যু করা হচ্ছে। ইস্যু ডিপার্টমেন্ট থেকে পরিচালক নার্গিস সুলতানা ৯ তারিখে বদলি হলেও ১১ ও ১২ তারিখেও তিনি টাকা ছাড়ার রশিদে সই করেন। সেখানে অন্যের সিল ব্যবহার করেছেন, যা রীতিমত জালিয়াতি। একইসঙ্গে টাকার জন্য ইস্যুকৃত স্লিপগুলোতে বর্তমান কারেন্সি অফিসার ইমতিয়াজ আহমেদ মাসুমের সিল থাকলেও সিলের ওপরে তার সই নেই। সেখানে নিজের সই দিয়েই নতুন নোট সরবরাহ করছেন নার্গিস সুলতানা। এভাবে একজনের সই এবং অন্যের সিল ও তারিখের গড়মিলের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিসের সার্কুলারে বর্তমান ও অবসর-উত্তর ছুটিতে গমনকারী নিজস্ব কর্মকর্তা/কর্মচারীদের নির্ধারিত হারে নতুন নোট বিতরণের কথা থাকলেও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থেকে শুরু করে এমএলএসএস অরনেট পর্যন্ত সবাইকে কোটার বাইরে অতিরিক্ত হারে নতুন নোট দেওয়া হচ্ছে। এভাবে টাকা বিতরণের ফোকফাকরে কিরেন্সি বিভাগের একটি সিন্ডিকেট মতিঝিলের বটতলা, গুলিস্তান, মিটফোর্ড, শ্যামপুরসগ সারা দেশে নতুন টাকা সরবরাহ করছেন। কেউ কেউ বিশেষ যোগাযোগের মাধ্যমে বাড়তি দরে বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিমা, করপোরেট প্রতিষ্ঠানে নতুন টাকার ব্যবসা করছেন।
টাকা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকসংলগ্ন বটতলা এলাকার ফুটপাতে দালাল চক্রের টাকা বিক্রেতাদের নিজস্ব রেজিস্টার্ড সমিতি আছে। তারাই নতুন নোটের দাম নির্ধারণ করে দেয়। ফলে ফুটপাত থেকে চড়া দামে নতুন নোট কিনতে হয় সাধারণ মানুষকে। অথচ অনেকের নতুন নোট কেনার সাধ আছে, সাধ্য নেই। ফুটপাতেই বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে দালালদের সাথে দর-কষাকষি করে নতুন নোটের সাপ্লাই করতে দেখা গেছে। মূলত মতিঝিল অফিসের ইস্যু বিভাগে কাকে কোথায় পদায়ন করা হবে সেটা নিয়ন্ত্রণ করে বটতলার দালাল সিন্ডিকেট। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতর থেকে এই সিন্ডিকেটের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রাখেন অরনেটের মো. রাকিব হোসেন (অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগ, আইডি-২৬৪৯, ও শোভন, আইডি-৩১৫৩। তাদের সহযোগী শাকিল, হাসান মোল্লা, শাহরিয়ার মোহাম্মদ আলভী (ভল্ট দারোয়ান), আকবর আলী (ভল্ট দারোয়ান), বারিক মোল্লা (সুপারভাইজার, ক্যাশ) সহ আরও অনেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে এসব দোকানের সামনে গিয়ে টাকা বিক্রি করতে এসে ‘সারাবাংলা’র ক্যামেরায় ধরা পড়েছেন ব্যাংকের জড়িত ডজনখানেক কর্মকর্তা। এমনকি কর্মকর্তারা হুমকিও দিয়েছেন দেখে নেওয়ার। তবে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা অবশ্য স্বীকারও করেছেন, কারা কারা রয়েছেন এসব টাকা বিক্রির সিন্ডিকেটে। তবে অরনেট রাকিব হোসেন হুমকি দিয়ে বলেন, ‘টাকা বিক্রি করেছি তো কী হয়েছে। আপনি ছবি তুললেন ক্যান। ছবি ডিলিট করেন এখনেই। আমার যদি চাকরি চলে যায়, আপনারে দেখে নিব।’
অপর অরনেট শোভন বলেন, ‘সাংবাদিক হয়েছেন তো কী হয়েছে? আমার বাবা জাতীয়তাবাদী দলের নেতা। কার কী করার আছে, আপনি করেন।’ তিনি দু’টি আইডি কার্ড নিয়ে টাকা বিক্রি করছিলেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘ব্যাংকের যে আই কার্ড সেটা আমার বাবার, অরনেটের যে আইডি কার্ড সেটা আমার।’
ক্যাশ বিভাগের ভল্টের নিয়াজিত দারোয়ান আলভি ও আকবরকে নতুন নোটের ব্যবসার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘বড় স্যার’ ও ‘আউটসোর্সিং’ কর্মচারীদের ওপর দায় চাপান। তারা বলেন, ‘আমরা নিম্নস্তরের (সিডি ক্যাটাগরির) কর্মচারী। আমাদের নতুন নোট দেওয়া হয় মাত্র ১০ হাজার টাকা। আমরা ব্যবসা করব কিভাবে? অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সার্কুলার অনুযায়ী সিডি ক্যাটাগরির কর্মচারীদের ১০ হাজার টাকা নয়, ৬৮ হাজার টাকা বিতরণ করার জন্য অফিস অর্ডার জারি করা হয়েছে। বারিক মোল্লা (সুপারভাইজার, ক্যাশ) সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বিষয়টি অস্বীকার করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানায়, বারিক মোল্লা ওলামা-লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি। সে টাকা বিক্রিকে অন্যায় মনে করেন না। তিনি আরও বলেন, ‘বারিক মোল্লা নতুন টাকা বিক্রির সাথে জড়িত। তার সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজন আছে। তারা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।’
হিউম্যান রিসোর্সেস ডিপার্টমেন্ট-১-এর পরিচালক শহীদ রেজা সারাবাংলাকে বলেন, ‘যে চার জনের নামে অভিযোগ, তার মধ্যে দুই জন আমাদের আন্ডারে কাজ করেন। রাকিব ও শোভন বাকি দু’জন আমাদের অধীন না। এদের হযতোবা কে কেউ ব্যবহার করছে। তাছাড়া এত টাকা পাবে কই তারা। এ বিষয়ের সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত থাকতে পারে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘অরনেটরা যে স্লিপগুলা নেয়, সবগুলাই সিও স্যার (ক্যাশ) পাশ করায়। আবার কিছু স্লিপ নির্বাহী পরিচালক, পরিচালকদের কাছ থেকে নিয়ে আসে। আমাদের এখানে কিছু করার নাই।’ নির্বাহী পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ মাসুম ও পরিচালক নার্গিস সুলতানার সাথে বেশ কয়েকবার কথা বলতে গেলে তারা সরারসি কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। মুঠোফোনে কল দেওয়া হলেও তারা কল রিসিভ করেননি।
একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সাবেক একজন কারেন্সি অফিসার বিশেষ বিধি প্রণয়ন করে নতুন নোটের ব্যবসা বন্ধের উদ্যোগ নিলেও অভ্যন্তরীণ ও দালাল সিন্ডিকেটের চাপে সে উদ্যোগ এখন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্যাশ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না কারার শর্তে জানান, কেউ স্লিপ আনলে টাকা দেওয়া ছাড়া কিছু করার নাই। স্যাররা স্লিপ পাস করে দেয়। তখন আমরা টাকা দিতে বাধ্য। আর অরনেটরা বিভিন্ন স্যার এর কাছে স্লিপ পাস করায়। তারা এখানে টাকার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে বিশৃঙ্খলা করে।’
৩ মার্চ ইস্যু বিভাগের পরিচালক নার্গিস সুলতানার সই করা একটি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা ফ্রেশ নোট নিতে পারবেন। সেই প্রজ্ঞাপনে নির্বাহী পরিচালক, পরিচালক ও উপ-পরিচালকগণ ১ লাখ ৮৩ হাজার টাকা পরিমাণের ফ্রেশ নোট সংগ্রহ করতে পারবেন। এমনকি সিকিউরিটি গার্ড, অফিস সহকারি, ক্লিনারসহ ৬৮ হাজার টাকা মূল্যের ফ্রেশ নোট নিতে পারবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী কর্মকর্তা/কর্মচারীদের ব্যবসা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও নতুন নোটের ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো নজির নেই বাংলাদেশ ব্যাংকের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সারাবাংলাকে বলেন, ‘সই ও সিল ভিন্ন ব্যক্তির হওয়ার প্রশ্নই আসে না। এমনটা হলে সেটা অবৈধ। আমি মাসুম সাহেবের সঙ্গে কথা বলব। নতুন টাকা বিক্রির সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কেউ জড়িত থাকলে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’