ভোলা: ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত মধ্যরাত থেকে শুরু হচ্ছে ভোলার মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীর ১৯০ কিলোমিটারে ইলিশসহ সবধরনের মাছ ধরার ওপর টানা দুই মাসের সরকারি নিষেধাজ্ঞা। এতে আগামী দুই মাস কর্মহীন হয়ে পড়বেন ভোলার ৭ উপজেলার প্রায় ২ লাখেরও বেশি জেলে।
এদিকে আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে নিষেধাজ্ঞার খবরে চরম দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে জেলে পল্লিগুলোতে। আর এ পরিপ্রেক্ষিতে নিষেধাজ্ঞার শুরু থেকেই জেলেদের ঋণের কিস্তি বন্ধ ও প্রথম সপ্তাহে সরকারি খাদ্য সহায়তার দাবি জানিয়েছেন জেলেরা।
জেলা মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, টকা সংরক্ষণ ও ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে দুই মাসের (মার্চ-এপ্রিল) নিষেধাজ্ঞা শুরু হবে শনিবার ২৮ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ১২টা থেকে, শেষ হবে আগামী ৩০ এপ্রিল দিবাগত রাত ১২টায়। এ দুই মাস ভোলার মেঘনা নদীর চর ইলিশা থেকে চর পিয়াল পর্যন্ত ৯০ কিলোমিটার ও তেঁতুলিয়া নদীর চর ভেদুরিয়া থেকে চর রুস্তম পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটারসহ মোট ১৯০ কিলোমিটার এলাকায় ইলিশের অভয়াশ্রমে সবধরনের মাছ শিকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে।
মৎস্য বিভাগ বলছে, জেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজার ২৮৩ জন। এর মধ্যে ভোলা সদর উপজেলায় জেলে রয়েছেন ২২ হাজার ৪১২ জন, দৌলতখানে ২৪ হাজার ৩ জন, বোরহানউদ্দিনে ১৯ হাজার ৮৩৮ জন, তজুমদ্দিনে ১৯ হাজার ৫৭২ জন, লালমোহনে ২৪ হাজার ৮০৬ জন, চরফ্যাশনে ৪৪ হাজার ৩১১ জন ও মনপুরা উপজেলায় নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন ১৫ হাজার ৩৪১ জন। তাদের অনুকূলে মাসে ৪০ কেজি করে ৯০ হাজার ২০০ শত জেলে পরিবারের জন্য ভিজিএফ চাল বরাদ্দ পেয়েছে মৎস্য বিভাগ।
সরেজমিনে সদর উপজেলার শিবপুরের ভোলার খাল ও ধনিয়ার তুলাতুলি মেঘনা তীরে ঘুরে দেখা যায়, নিষেধাজ্ঞার খবরে সারি সারি নৌকা-ট্রলার নিয়ে তীরে ফিরছেন জেলেরা। তীরে আসার পর তাদের ট্রলার নিরাপদ স্থানে এনে ট্রলার থেকে ইঞ্জিন জালসহ মাছধরার সকল সরঞ্জামাদি উঠিয়ে নিচ্ছেন। কেউ জাল মেরামত করছেন, কেউ কেউ প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যেন চলছে এক মহাকর্মযজ্ঞ। তবে, কারও মুখেই নেই হাসি।
জেলে মো.ইউনুস, কামাল হোসেন, ফিরোজসহ কয়েকজন বলেন, এ বছর গাঙ্গে আশানুরূপ ইলিশসহ অন্যান্য মাছ পাইনি। বিগত দিনের দেনা রয়েই গেছে, সুদও বাড়ছে। আজ রাত থেকে দুইমাসের অভিযান শুরু হবে, খুবই চিন্তায় আছি। চলছে রমজান মাস, আবার সামনে আসতেছে ঈদ। কিভাবে যে সংসার চালাব বুঝতেছি না। জেলের কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজও আমরা জানি না। অভিযান চলাকালে আড়তদারের দেনার জন্য চাপ না দিলেও এনজিওর লোকজন বাড়িঘর থেকে যায় না। তারপরও সরকারের আদেশ মেনে জাল ট্রলার নিয়ে নদী থেকে উঠে গেছি। অভিযান চলাকালে আর গাঙ্গে যাব না।
তারা আরও বলেন, ‘গাঙ্গে অভিযান মানেই আমরা কর্মহীন, অনেক কষ্টে দিন কাটাতে হয়। অভিযানের সময় মাসে ৪০ কেজি করে আমাদের চাল দেওয়া হয়, তা আবার সঠিক সময়েও পাই না। তাছাড়া শুধু চালে তো আর সংসার চলে না। সরকারের কাছে অভিযান শুরুর প্রথম সপ্তাহে চালসহ ঋণের কিস্তি বন্ধ রাখার দাবি জানাই।’ এ ছাড়া, চালের সঙ্গে ডালসহ অন্যান্য নিত্যাপণ্যের দাবি জানান তারা। কারণ, ঘরে অভাব দেখা দিলে জেলেরা বাধ্য হয়েই অভিযানের মধ্যে গাঙ্গে মাছ ধরতে যায়।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, ‘এবারের অভিযান সফল করতে এরই মধ্যে ব্যাপক প্রচার ও সচেতন সভা করেছি। ফেব্রুয়ারি থেকে মে, চারমাসের প্রতিমাসে প্রতিজন জেলে ৪০ কেজি করে ভিজিএফ চাল পাবে। আমরা এরই মধ্যে চালের বরাদ্দ পেয়েছি। অভিযানের প্রথম সপ্তাহে চাল বিতরণ করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ বছরই প্রথম ইলিশ সম্পদ প্রকল্পের আওতায় ভোলার ১৩ হাজার ৬০০ জেলেকে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হবে। সর্বোপরি অভিযান সফল করতে সবপ্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। এ ছাড়া, জেলেদের ঋণের কিস্তি বন্ধ রাখার দাবির বিষয়ে জেলা টাস্কফোর্স কমিটির সভায় আলোচনা হয়েছে। আশা করি, শিগগিরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে ‘