সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির নেতা নিকিতা ক্রুসেভের একটা বিখ্যাত উক্তি আছে এইরকম— Politicians are the same all over. They promise to build bridges even where there are no rivers. তারা নদী না থাকলেও ব্রিজ বানানোর প্রতিশ্রুতি দেন। আর এই প্রতিশ্রুতির বন্যা দেখা যায় ইলেকশনের আগে আগে। এই যেমন, আমাদের জাতীয় সংসদ সদস্য (এমপি) প্রার্থীরা এলাকার উন্নয়নে শতশত ওয়াদা করেন, জনগণও মন খুলে সব দাবি তাদের কাছে করেন। অথচ একজন এমপির কাজ পার্লামেন্টে আনই পাস করা। এলাকার রাস্তাঘাট করা তার কাজ নয়। এগুলো লোকাল গভর্মেন্টের করার কথা। এবারের ইলেকশনেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।
মজার বিষয় হচ্ছে- এইসব ওয়াদার বিষয়ে সাধারণ ভোটারদের তেমন আগ্রহ থাকে না। বলতে গেলে তাদের কোনো আস্থাই থাকে না। এ জন্য এগুলোকে বলা হয় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, যেগুলো কখনোই আলোর মুখ দেখে না। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা গেছে। ভোটারের আঙুল থেকে কালি মোচনের আগেই নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছেন তিনি। দায়িত্ব নেওয়ার ২৮ দিনের মাথায় এমন কিছু প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন, যা কেবল ব্যতিক্রমই নয়, অসম্ভবও বটে। কিন্তু সেগুলোই দ্রুত সময়ে বাস্তবায়ন করে কথা রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, “জনগণের রায়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর ভোটের কালি নখ থেকে মোচনের আগেই আমরা আমাদের সকল প্রতিশ্রুতি ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছি। আপনারা দেখেছেন, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য আমরা এরই মধ্যেই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করেছি। পর্যায়ক্রমিকভাবে এই কার্ড সারাদেশে সবাই পাবেন। আগামী ১৪ এপ্রিল তথা ১ বৈশাখ থেকে চালু হচ্ছে ‘ফার্মার্স কার্ড’ বা ‘কৃষক কার্ড’।”
অথচ কোনো কোনো সময় প্রতিশ্রুতি রাজনীতিকদের জন্য বা রাজনৈদিক দলের জন্য বুমেরাং হয়ে উঠতে পারে। যেমন: বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের গত সরকারের আমলে মেট্রোরেল ও পদ্মাসেতুসহ বেশকিছু জনবান্ধব উদ্যোগ নেওয়া সত্ত্বেও তাদের সবচেয়ে বেশি বিতর্কের মধ্যে পড়তে হয়েছে ‘দশ টাকায়’ চাল খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা রক্ষা করতে না পারা। ফলে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্কতার বিষয় আছে। ভোটের আগে তারেক রহমান বিভিন্ন নির্বাচনি সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, কৃষি ঋণ মওকুফ, ইমাম মোয়াজ্জেমদের ভাতা প্রদান, খাল-নদী খনন, পাঁচ কোটি বৃক্ষ রোপণ, দেড় বছরে এক কোটি বেকারের কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্য।
এই কয়েকটি প্রতিশ্রুতির কথা তিনি সবকয়টি জনসভায় অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। কেন এইগুলো দেওয়া হবে, এর থেকে কারা উপকৃত হবেন, তার বিশদ ব্যাখ্যা ও যুক্তি তিনি তুলে ধরেছেন। এগুলোই ছিল তার নির্বাচনি মার্কেটিংয়ের মূল ফোকাল পয়েন্ট। এই মার্কেটিংটা তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে করতে পেরেছেন। এইসব প্রতিশ্রুতি শেখ হাসিনার ‘দশ টাকায়’ চাল খাওয়ানোর মতো হবে কি না এই প্রশ্ন বিরোধীরা তুলেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত তা হালে পানি পায়নি।
নখ থেকে ভোটের কালি না মুছতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিনটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি তড়িৎ গতিতে পূরণের উদ্যোগ নিয়েছেন, যা আমাদের দেশে নজিরবিহীন। কৃষি ঋণ মওকুফ, ফ্যামিলি কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা প্রদান কর্মসূচি উদ্বোধন করেছেন। অচিরেই কষক কার্ডও চালু হবে। এই কর্মসূচি গুলোর নির্দিষ্ট টার্গেট গ্রুপের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কৃষি ঋণ মওকুফ একটা সাহসী উদ্যোগ, কৃষক ও তার পরিবার ঋণ মুক্ত হবেন এক ঘোষণায়। কৃষি ঋণ নিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে কৃষকরা কি দুর্বিষহ পরস্থিতিতে আছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের দেশে হতদরিদ্রদের জন্য স্যোসাল সেফটিনেটের আওতায় বেশ কিছু কর্মসূচি চালু রয়েছে, সেগুলোর সুফল সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষ ভোগ করছেন। যদিও এগুলোর বিতরণে দলীয়করণের অভিযোগ রয়েছে।
তার চাইতে বড় বিষয় হচ্ছে, রাজনীতিক ও সরকারি দল সম্পর্কে মানুষের মধ্যে যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে তা দূর করতে তড়িৎ গতিতে এই উদ্যোগগুলো বুস্টার হিসেবে কাজ করবে। বিশেষ করে, ইমাম-মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, যাজক, বৌদ্ধ গুরুদের যে ভাতার ব্যবস্থা করেছেন তার সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক। তারেক রহমান অনেক দিন থেকে যে কথাটা বলে আসছেন, ভোটের মাঠেও তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বার বার বলেছেন, ‘দেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের ধর্ম ইসলাম হলেও এখানে অন্যান্য ধর্মের মানুষ আছেন। সবাই মিলে বাংলাদেশ।’ এর বাইরে আরও কিছু কাজ করেছেন তিনি। সরকারি অফিসগুলোকে যে কার্যপরিবেশ প্রায় ভেঙে পড়েছে তা পুনরুদ্ধারে তিনি উদ্যোগ নিয়েছেন। এর জন্য কোনো নির্দেশ বা ফরমান জারি করেননি। নিজে ৯টা ৫ টা অফিস করছেন। তার ব্যক্তি আচরণে সচিবালয়সহ সরকারি অফিসগুলোতে এক ধরনের কর্মপরিবেশ ফিরে আসছে।
প্রধানমন্ত্রীর আরও একটি সিদ্ধান্ত অত্যন্ত প্রশংসার দাবি রাখে, তা হচ্ছে জ্বলানির দাম না বাড়ানোর ঘোষণা। ইরানে বোমা হামলার পর সারাবিশ্বে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলালচ বন্ধ রয়েছে। এই প্রণালি দিয়ে এশিয়ার দেশগুলোতে বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল পরিবহণ হয়। এর মধ্যে প্রায় ৮৫টি দেশ জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সাহসী সিদ্ধান্ত। আমাদের মূল্যস্ফীতি এমনিতেই অনেক চড়া, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির পারদ আরও বাড়িয়ে তুলবে।
প্রতিশ্রুতি বাস্তাবায়ন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
প্রথমত, দেশের বড় সমস্যা হচ্ছে বেকার সমস্যা। আমাদের কর্মক্ষম মানুষের প্রায় ৬০ ভাগ তরুণ, এটি একদিকে যেমন আশীর্বাদ, অন্যদিকে বিপজ্জনক। এদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাও বড় চ্যালেঞ্জ। তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছেন যে, দেড় বছরে এক কোটি তরুণের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন। তরুণদের কর্মসংস্থানের বিষয় ছিল জুলাই অভ্যুত্থানের মূল দাবি। এটি নিঃসন্দেহে জটিল ও কঠিন কাজ, এই কাজের প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়ে নিজেকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দিয়েছেন। যারা জুলাই সনদ নিয়ে মাঠ গরম করছেন তারা এই বিষয় বেমালুম ভুলে গেলেও প্রধানমন্ত্রী সেটাকেই গুরুত্বের তালিকায় রেখেছেন।
এখন বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার পাশপাশি ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও অর্থিকখাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি। আর্থিকখাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে না পারলে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ সোশ্যাল সেফটি নেটের কর্মসূচিগুলো থেকে আখেরে কোনো সুফল আসবে না, উলটো অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করবে।
বিএনপির সরকারের সামনে আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে- ঢাকার ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফিরে আনা এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। এই দু’টি কাজ দ্রুত করতে পারলে তা মাইলস্টোন হিসেবে বিবেচিত হবে। বিশেষ করে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ছাড়া নদী খাল খনন ও বৃক্ষরোপন কর্মসূচি পরিবেশ রক্ষায় পূর্ণতা পাবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কথা কম বলে যেভাবে কাজে নিয়োজিত, তিনি এই চ্যালেঞ্জগুলোও দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করবেন কোন আপস ছাড়াই- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
প্রধানমন্ত্রীর ২৮ দিনের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের মাত্র ২৮ দিনে, রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি মুহূর্তে তিনি নির্বাচনি অঙ্গীকার পূরণে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। তার মধ্যে অন্যতম হলো-
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি : ৩৭ হাজার ৫৬৭ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা হয়েছে। প্রতিটি কার্ডে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা সহায়তা।
ইমাম-মুয়াজ্জিন ও ধর্মীয় সেবকদের সম্মানী: দেশের ৪ হাজার ৯০৮ মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন, ৯৯০ মন্দিরের পুরোহিত, ১৪৪ বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ এবং ৩৯৬ গির্জার যাজক ও পালকরা মাসিক সম্মানী পাচ্ছেন।
ঈদে ত্রাণ ও উপহার বিতরণ: নির্বাচনি এলাকার অসহায় ও গরিবদের জন্য শাড়ি, থ্রিপিস ও হাজি রুমাল বরাদ্দ। সকল পরিচ্ছন্নতা কর্মীর জন্য ঈদ উপহার।
প্রাতিষ্ঠানিক জাকাত ব্যবস্থা: দরিদ্রদের কাছে সম্পদ পৌঁছানো ও কল্যাণমূলক কার্যক্রমে সহায়তার জন্য আলেম মাশায়েখদের সঙ্গে আলোচনার প্রেক্ষিতে প্রাতিষ্ঠানিক জাকাত ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ।
কৃষক কার্ড ও কৃষিঋণ মওকুফ : প্রায় ২৭ হাজার কৃষককে কৃষক কার্ড প্রদানের মাধ্যমে শিগগিরেই কার্যক্রম শুরু হবে। প্রায় ১২ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফ।
দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি: ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলাশয় খনন। এরই মধ্যে ৫৪ জেলায় এই কর্মসূচি শুরু হয়েছে।
ভিভিআইপি প্রটোকল হ্রাস: প্রধানমন্ত্রীর অতি সাধারণ চলাফেরায় ট্রাফিক ব্যবস্থায় নজিরবিহীন পরিবর্তন এসেছে। এতে জনগণও ট্রাফিক আইন মেনে চলতে উৎসাহিত হচ্ছে। এর ফলে রাজধানীর রাস্তায় শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে।
বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকতা সীমিত: প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর ও ফেরার সময় বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকবেন কেবলমাত্র একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী, চিফ হুইপ, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব। আগে পুরো মন্ত্রিপরিষদসহ বড় বহর উপস্থিত থাকতো।
এমপিদের বিশেষ সুবিধা বাতিল: শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট গ্রহণ না করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমবে, জনগণের আস্থা পুনঃস্থাপিত হবে।
বিমানবন্দর ও চলন্ত ট্রেনে ফ্রি ইন্টারনেট: ঢাকা, চট্রগ্রাম ও সিলেটে শাহজালাল, শাহ আমানত ও এম এ জি ওসমানী বিমানবন্দরে উন্নত দেশের মতো ফ্রি ওয়াইফাই ব্যবস্থার নির্দেশ ও সৈয়দপুর বিমানবন্দরে উদ্বোধন করা হয়েছে।