ঢাকা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের করেছে বিএনপি। সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু না হলেও এরই মধ্যে সরকারের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। তবে জাতীয় নির্বাচনের পর এবার ঢাকার উত্তর-দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা জোরালো হয়ে উঠেছে। যদিও দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই ঢাকাসহ ছয় সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে নতুন সরকার। আর এ বিষয়ে বিরোধীদলগুলোর আপত্তির মধ্যেই সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের নাম ঘিরে চলছে আলোচনা।
জানা গেছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আয়োজন করতে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের চিঠি পেয়ে নির্বাচন কমিশন তিন সিটির নির্বাচন করার বিষয়ে আলোচনাও শুরু করেছে। আবার স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও ঘোষণা দিয়েছেন, ‘যেসব সিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে সেখানে দ্রুতই নির্বাচন হবে।’ এ ক্ষেত্রে ঢাকার দুই সিটি ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত সংসদে নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর মেয়র, চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলরদের পদত্যাগের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার ১২টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০ পৌরসভা, ৪৯৭টি উপজেলা পরিষদ এবং ৬৪টি জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করে। ফলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদটি শূন্য হয়ে যায়।
প্রায় ১৮ মাস মেয়র শূন্য সিটি করপোরেশন চলেছে প্রধান নির্বাহীর অধীনে। এদিকে বিএনপি সরকার শপথের পাঁচ দিনের মাথায় গত ২২ ফেব্রুয়ারি এক প্রজ্ঞাপনে দলীয় নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালামকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। তার পরও রাজনৈতিক মহলে ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র পদে সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে চলছে আলোচনা।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। সেই নির্বাচনে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের শেখ ফজলে নূর তাপস। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতে আত্মগোপনে চলে তিনি।
এদিকে ২০২০ সালের ২ জুন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সে অনুযায়ী গতবছরের ১ জুন এই সিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। সংসদ নির্বাচনের ব্যস্ততার কারণে এতদিন নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে এই দুই সিটির ভোট আয়োজনের তাগিদ দিয়ে ইসিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আব্দুস সালাম। তিনি গত ২২ ফেব্রুয়ারি এক প্রজ্ঞাপনে ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক পদে নিয়োগ পেয়েছেন। নিয়োগের পর সিটি করপোরেশনে যোগদান করে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
এ ছাড়াও, যাদের নাম আলোচনায় আছে তারা হলেন- বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল এবং মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। এরই মধ্যে ইশরাক হোসেন দক্ষিণ সিটিতে মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।তিনি বলেছেন, ‘দল যদি তাকে মনোনয়ন দেয় তাহলে তিনি নির্বাচন করবেন।’
বর্তমানে ডিএসসিসির প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা আব্দুস সালাম বলেছেন, ‘দল মনোনয়ন দিলে তিনি নির্বাচনে অংশ নেবেন।’ অতীতে ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চান।’ আর হাবিব উন নবী খান সোহেল বলেন, ‘প্রার্থী হওয়া না হওয়া সম্পূর্ণ দলের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।’
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু এ বিষয়ে সারাবাংলাকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী চূড়ান্ত করার বিষয়ে এখনো দলীয়ভাবে আলোচনা হয়নি।’ আর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস সারাবাংলাকে জানান, তফসিল ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে।
এদিকে জামায়াতে ইসলামী এর আগে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে দলের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুলকে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছিল। কিন্তু, তিনি এরই মধ্যে চাপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে ঢাকা দক্ষিণে তারা প্রার্থী পরিবর্তন করে ঢাকা-৮ আসনের প্রত্যাহার করে নেওয়া প্রার্থী ড. হেলাল উদ্দিন অথবা ঢাকা-৬ আসনে পরাজিত ড. আবদুল মান্নান কিংবা এনসিপিকে সমর্থন দিতে পারে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ও এনসিপি ১১দলীয় জোটের নির্বাচনি ঐক্য করে ভোটের মাঠে নেমেছিল। সামনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে তাদের সেই ঐক্য অটুট থাকবে কি না সে বিষয়ে কোনো দলের নেতা এখনো কিছু বলেননি। তবে বিভিন্ন সূত্র বলছে, ঢাকার দুই সিটিতে জামায়াত ও এনসিপি জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। সেক্ষেত্রে ঢাকা উত্তরে জামায়াত এবং ঢাকা দক্ষিণে এনসিপি প্রার্থী দিতে পারে। আর এমনটি হলে, ঢাকা দক্ষিণে মেয়র পদে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন এনসিপি নেতা সাবেক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
এ ছাড়াও, ঢাকা দক্ষিণে নির্বাচনে অংশ নেবেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একজন প্রার্থী। এ বিষয়ে দলের প্রচার বিভাগের প্রধান শেখ ফজলুল করীম মারুফ সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের দলের পক্ষ থেকে প্রার্থী এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে ঢাকার দুই সিটিতে আমাদের হাতপাখা প্রতীকে প্রার্থী থাকবে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিপির একজন কেন্দ্রীয় নেতা গণমাধ্যমকে জানান, ‘রমজানের পর সিটি করপোরেশন নির্বাচন হবে, তা ধরে নিয়ে নিজেদের প্রার্থিতা ঠিক করছে এনসিপি। এই নির্বাচনেও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে সমঝোতা করে অংশ নেবেন তারা। সেই আলোকে প্রার্থী ঠিক করা হয়েছে।’ এমনকি কাউন্সিলর প্রার্থী ঠিক করে সেই তালিকা নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা বৈঠকে বসবে বলেও দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।