Saturday 27 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেলপথ প্রকল্প / ব্যয় বাড়ছে ৭০০০ কোটি টাকা, মেয়াদ ৪ বছর

আশরাফুল ইসলাম জয়, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৭ জুন ২০২৬ ০৮:১৫

সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেলপথ প্রকল্প। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

সিরাজগঞ্জ: সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রকল্প সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেলপথ নির্মাণে নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ প্রায় আট বছর নানা জটিলতায় আটকে থাকা প্রকল্পটির কাজ এগোনোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা এ প্রকল্পের সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) এরই মধ্যে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন প্রক্রিয়া শেষ হলে আগামী একনেক সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হবে বলে জানা গেছে।

তবে প্রকল্পের কাজে গতি ফিরলেও বেড়েছে ব্যয়ের চাপ। শুরুতে যেখানে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা, সংশোধিত প্রস্তাবে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৪৪২ কোটি ৫৫ লাখ টাকায়। অর্থাৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রয়োজন হচ্ছে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। নতুন অর্থায়ন কাঠামো ও বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রকল্পের ব্যয় পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদও বাড়ছে আরও চার বছর। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী প্রকল্প শেষ করার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত।

বিজ্ঞাপন

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন পায়। তখন প্রকল্পে অর্থায়নের বড় অংশ দেওয়ার কথা ছিল ভারতের ঋণ সহায়তা থেকে। প্রায় ৩ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিবর্তনের কারণে ভারতীয় অর্থায়ন থেকে সরে যায়। ফলে প্রকল্পটি দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। পরবর্তী সময়ে বিকল্প অর্থায়ন হিসেবে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) এগিয়ে আসে।

প্রকল্পের মূল মেয়াদ ছিল ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। কিন্তু পরামর্শক নিয়োগ, নকশা প্রণয়ন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে পরামর্শক নিয়োগের পর ২০২৩ সালের জুনে চূড়ান্ত নকশা প্রস্তুত হয়। এরপর প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছিল। এখন সংশোধিত প্রস্তাবে আবারও চার বছর সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। অনুমোদন পেলে প্রকল্পটি শেষ হবে ২০৩১ সালের ৩০ জুন।

প্রকল্প কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৮ সালে যে ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছিল তা সে সময়ের বাজারদর অনুযায়ী। কিন্তু গত কয়েক বছরে নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে ব্যয় বেড়েছে। তারা আরও বলেন, প্রকল্পের বড় অংশের ব্যয় যাচ্ছে ভূমি অধিগ্রহণে। মূল ডিপিপিতে ৯৬০ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৯২১ কোটি টাকা। পরে চূড়ান্ত অ্যালাইনমেন্ট নির্ধারণের পর প্রয়োজনীয় জমির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৯০১ দশমিক ৭৭ একর।

তবে জমির বর্তমান মূল্য বিবেচনায় সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া জেলা প্রশাসনের প্রাক্কলনে ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ২৪৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ শুধু জমি কেনার খাতেই বেড়েছে প্রায় ৩২৩ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ভূমি অধিগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ এরই মধ্যে দুই জেলার প্রশাসনের কাছে দেওয়া হয়েছে এবং জমি বুঝে নেওয়ার কাজ চলছে।

প্রকল্প পরিচিতি। এআই দিয়ে তৈরি

প্রকল্প পরিচিতি। এআই দিয়ে তৈরি

প্রকল্প পরিচালক আবু জাফর মিঞা সারাবাংলাকে জানান, সংশোধিত ডিপিপি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়ার পর দরপত্রসহ অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষ করে মূল নির্মাণকাজ শুরু করতে প্রায় নয় মাস সময় লাগতে পারে। নতুন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৮৭ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ করা হবে।

এই রেলপথ চালু হলে বর্তমান পথের তুলনায় দূরত্ব কমবে প্রায় ১১৪ কিলোমিটার। যাত্রার সময় কমবে প্রায় তিন ঘণ্টা। বর্তমানে সড়কপথে বগুড়া থেকে ঢাকা যেতে যেখানে প্রায় ছয় ঘণ্টা লাগে, ট্রেনে সেখানে সময় লাগে ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সিরাজগঞ্জ হয়ে বগুড়া থেকে ঢাকায় প্রায় পাঁচ ঘণ্টায় পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে আশা করছে রেলওয়ে।

প্রাথমিক পরিকল্পনার পাশাপাশি প্রকল্পে নতুন কিছু কাজ যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রানীরহাট জংশন থেকে বগুড়া শহরের পরিবর্তে গাবতলী পর্যন্ত নতুন প্রায় ১৫ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ। এ জন্য অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ, আন্ডারপাস, ওভারপাস, রানীরহাট জংশনে বাইপাস এবং গাবতলী রেলস্টেশন আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব কাজের জন্য অতিরিক্ত প্রায় এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ার মধ্যে আধুনিক ডুয়েলগেজ রেলযোগাযোগ স্থাপন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে- ৮৭ কিলোমিটার নতুন রেললাইন নির্মাণ, ৩৩ কিলোমিটার লুপ লাইন, করতোয়া নদীর ওপর ২৮৬ মিটার রেলসেতু, ইছামতী নদীর ওপর ২০৫ মিটার সেতু, ২২১টি ছোট-বড় সেতু নির্মাণ, ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের ওপর রেল ওভারপাস, বগুড়া-নাটোর মহাসড়কে রোড ওভারপাস, সিরাজগঞ্জ ও রানীরহাটে দুটি জংশন, কৃষ্ণদিয়া, রায়গঞ্জ, চান্দাইকোনা, ছনকা, শেরপুর ও আড়িয়াবাজারে নতুন স্টেশন, বগুড়া, কাহালু ও সদানন্দপুর স্টেশন পুনর্নির্মাণ। এ ছাড়া রানীরহাট এলাকায় ‘ওয়াই’ আকৃতির রেললাইন নির্মাণ করা হবে, যার একটি অংশ বগুড়া এবং অন্যটি কাহালুর দিকে যাবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেলপথ শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপিত হলে কৃষিপণ্য পরিবহন, শিল্প বাণিজ্য এবং পর্যটন খাতে নতুন সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে রাজধানী ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ সহজ হবে। কমবে পরিবহণ খরচ, বাড়বে পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা।

দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর প্রকল্পটি আবারও বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। তবে বিশাল অঙ্কের ব্যয় বৃদ্ধি, সময়ক্ষেপণ এবং অর্থায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করাই এখন বড় পরীক্ষা। স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা আর যেন কোনো জটিলতায় থেমে না যায় বহু প্রতীক্ষিত এই রেলপথ নির্মাণ।