Wednesday 17 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ভারত জোর করে বাঙালিদের বাংলাদেশে ‘পুশ-ইন’ করছে: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

সারাবাংলা ডেস্ক
১৭ জুন ২০২৬ ২৩:০১

বিএসএফ-এর পুশ-ইন প্রচেষ্টার সময় আটকে পড়া মানুষেরা।

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) দেশটির পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী বাঙালিদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাদেশে পুশ-ইন করছে বলে অভিযোগ তুলেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। বাংলাদেশে ঠেলে দিতে চাওয়া এসব বাঙালির অধিকাংশ মুসলিম বলেও জানা গেছে। এ ঘটনায় সংস্থাটি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

মঙ্গলবার (১৬ জুন) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এইচআরডব্লিউ জানায়, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বহু মানুষকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করছে। তবে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়া তাদের প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ায় অনেকে সীমান্তের মধ্যবর্তী এলাকায় আটকে পড়ছেন। আটকে পড়া পরিস্থিতিতে তারা মানবেতর অবস্থায় দিনযাপন করছেন।

বিজ্ঞাপন

বিজিবির তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ১ জুন থেকে এ পর্যন্ত বিএসএফের অন্তত ২১টি পুশ-ইন প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় শিশুসহ দুই শতাধিক ব্যক্তিকে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।

এদিকে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির আওতায় শত শত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’-কে আটক এবং প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে ফেরত পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

এইচআরডব্লিউর এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরিবারগুলোকে নির্মমভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে অথবা সীমান্তে আটকে রাখছে, যা তাদের মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। সরকারকে অবৈধ বহিষ্কার বন্ধ করতে হবে এবং নাগরিকত্ব যাচাইয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।’

সংস্থাটি জানায়, তারা এমন নয়জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য নিয়েছে, যারা দাবি করেছেন যে রাতের বেলায় বিএসএফ বিভিন্ন দলকে সীমান্তে নিয়ে গিয়ে কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে বাংলাদেশের দিকে পাঠানোর চেষ্টা করেছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে বিজিবি বাধা দিলে তাদের পুনরায় ভারতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

প্রতিবেদনে পঞ্চগড় সীমান্তের একটি ঘটনারও উল্লেখ রয়েছে। এতে বলা হয়, ৫ জুন শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে প্রায় ৭৫ ঘণ্টার অচলাবস্থা তৈরি হয়। স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তিরা বাংলাদেশের ভেতরে কিছুটা প্রবেশ করলেও পরে বিজিবি তাদের থামিয়ে দেয়। পরবর্তীতে তারা সীমান্তের মাঝামাঝি এলাকায় অবস্থান নেন।

রুবেল হোসেন বলেন, ‘প্রথম রাতেই তারা প্রবল বৃষ্টি ও বজ্রপাতের মধ্যে খোলা আকাশের নিচে ছিলেন। দ্বিতীয় দিনে বিএসএফ তাদের কিছু শুকনো খাবার দেয়। কয়েক দফা পতাকা বৈঠকে সমাধান না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বিএসএফ তাদের ভারতে ফিরিয়ে নেয়।’

একই ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটে ৬ জুন ঠাকুরগাঁও সীমান্তে। সেখানে দুইটি বাঙালি মুসলিম পরিবারের ছয় সদস্যকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। বিজিবি তাদের প্রবেশে বাধা দিলে এবং বিএসএফও ভারতে ফিরতে না দিলে তারা দীর্ঘ সময় সীমান্তে অবস্থান করেন। পরে তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

এ ছাড়া, ৮ জুন ঠাকুরগাঁওয়ের জিরো লাইনে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা আটকে থাকার পর এক গর্ভবতী নারী ও তার সন্তানসহ ১১ জনকে বিএসএফ ফেরত নিয়ে যায় বলে জানিয়েছে বিজিবি।

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গে মার্চ মাসের নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় দ্রুত ও বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় ৯০ লাখের বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়। এর ফলে বহু মানুষের মধ্যে আটক ও বহিষ্কারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংস্থাটি স্মরণ করিয়ে দেয়, ২০১৯ সালে আসামের নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ার পর ১৯ লাখের বেশি মানুষ রাষ্ট্রহীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছিল।

উল্লেখ্য, আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা একাধিকবার বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সম্প্রতি তিনি দাবি করেন, অনেককে সীমান্ত এলাকায় নিয়ে গিয়ে সরাসরি সীমান্ত পার করে দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কেউ স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে যেতে চাইলে তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে জোরপূর্বক বহিষ্কার বা চাপ প্রয়োগ করে প্রত্যাবাসন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের পরিপন্থী।

এইচআরডব্লিউর দাবি, পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে শত শত সন্দেহভাজন বাংলাদেশি অভিবাসীকে বিভিন্ন আটককেন্দ্রে রাখা হয়েছে। তাদের অধিকাংশ মুসলিম হলেও কিছু হিন্দুও রয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পরই গ্রেফতার বা আটকের ঘটনা ঘটেছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার এরইমধ্যে জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠিত আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া সীমান্তে ঠেলে দেওয়া কাউকে গ্রহণ করা হবে না। নাগরিকত্ব যাচাই ও প্রচলিত প্রত্যাবাসন পদ্ধতি অনুসরণ করেই যে কোনো প্রত্যাবর্তন সম্পন্ন হতে হবে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী ভারত প্রত্যেক ব্যক্তির অধিকার সুরক্ষায় বাধ্য। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক বা বহিষ্কার করা মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। একই সঙ্গে খাদ্য, পানি, আশ্রয় ও চিকিৎসাসেবা ছাড়া মানুষকে সীমান্তে আটকে রাখা নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘কোনো মানুষের নাগরিকত্ব যাই হোক না কেন, তাকে দুই দেশের সশস্ত্র সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাঝখানে খোলা মাঠে রাত কাটাতে বাধ্য করা উচিত নয়। ভারতকে এসব নির্মম বহিষ্কার বন্ধ করতে হবে এবং উভয় দেশকে নিশ্চিত করতে হবে যে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কখনওই মানুষের মৌলিক মর্যাদার বিনিময়ে পরিচালিত হবে না।’