ঢাকা: তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, যারা ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় কথা বলেন আর যারা বাইরে কথা বলেন তাদের ভাষা এক হলেও মনোজগতে পার্থক্য রয়েছে। এজন্য সীমান্তের ওপারে কিংবা কলকাতায় গিয়ে বাঙালির সার্টিফিকেট নিতে হবে না।
তিনি বলেন, ‘আমরা নৃতাত্তিকভাবে বাংলাদেশি। আমাদের ক্ষণজন্মা পুরুষ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ একটি বিরাট অর্জন। আর যদি ১৪০ কোটি আর ২০ কোটি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে চান তাহলে সার্ক-এর ২২০ কোটি মানুষকেও ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। যারা এটা চাইবেনা আমরা এটাকে সন্দেহের চোখে দেখবো। আঞ্চলিকতার জন্য সার্ক এবং আন্তর্জাতিকভাবে জাতিসংঘ এভাবেই আমরা এগোতে চাই।’
শনিবার (১৩ জুন) দুপুরে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের মুক্তিযোদ্ধা মিলনায়তনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘দেশ পুনর্গঠনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন’ শীর্ষক এই আলোচনা সভার আয়োজন করে ‘আমরা বাংলাদেশি’ নামের একটি সংগঠন।
সংগঠনটির মূল উদ্যোক্তা সৈয়দ এহসানুল হুদার সভাপতিত্বে ও তমিজ উদ্দিন টিটুর পরিচালনায় আরো বক্তব্য দেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক নূর, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ, বিএনপি নেতা রাশেদ খান ও মোমিনুল আমিন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘যখন জাতি সংকটে ছিল তখনই দেশকে ঐক্যবদ্ধ করতে শুরু করেন আমাদের নেতা তারেক রহমান। তিনি বলেছিলেন ‘দেশ যাবে কোন পথে, ফয়সালা হবে রাজপথে’। তিনি আরো বলেছিলেন ‘যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ, যদি ঘুরে দাঁড়াও তবে তুমিই বাংলাদেশ।’ এসব স্লোগান কিন্তু আমাদেরকে জুলাই আন্দোলনের শক্তি ও সাহস জুগিয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে আমরা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আদায় করতে পেরেছি।’
তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘অতীতের তুলনায় বর্তমান সংসদ জনগণের জন্য কাজ করছে। তবে আমাদের বন্ধুর পথে কে আমাদের প্রকৃত বন্ধু কিংবা দীর্ঘ মেয়াদি বা স্বল্প মেয়াদি বন্ধু সেটা বের করতে হবে। সেজন্যই আমরা বাংলাদেশি সংগঠনের সূচনা। আগামী ৫ আগস্ট বাংলাদেশের সর্বশেষ মহান বিজয় ও গণঅভ্যুত্থানের দিবস পালনের দিন ‘আমরা বাংলাদেশি’ সংগঠনের যাত্রা শুরু হতে পারে। কে বন্ধু কে কার শত্রু বা সমর্থক সেদিকে গেলে আমাদের লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে পারে।’
প্রধান আলোচক হিসেবে অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘যারা অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন তারা কোন মিশন নিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন সেটা ভাবতে হবে। তবে জাতীয় ঐক্যই হচ্ছে আমাদের প্রধান হাতিয়ার। দায়িত্বজ্ঞান ও আপত্তিকর মন্তব্য পরিহার করা উচিত। আমাদের মতো দেশের জন্য এরকম বাজেট খুব বড় বাজেট নয়। তবে সামর্থ্যের ঘাটতি রয়েছে। আকাশ কিংবা পাহাড়ের চূড়ার দিকে তাকিয়ে বসে থাকলে চলবে না। সেখানে পৌঁছানোর কাজ করতে হবে।’
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক নূর বলেন, ‘জুলাই সনদ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ বিএনপির পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে যেসব বিষয়ে সম্মত হয়েছে সেগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে। তবে যেসব বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে সেগুলো বাদে। যদিও বিএনপি জনগণের ভোটে এখন সরকার গঠন করেছে তারা সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ গঠন করা যুক্তিযুক্ত নয়।’ বিএনপি সংস্কার কিংবা জুলাই বিরোধী নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। আজকে যারা জুলাই যোদ্ধা তাদেরকে তারা কয়েক বছর ধরে তৈরি করেছেন বলেও জানান তিনি।
বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটি জনবান্ধব ও কল্যাণের বাজেট। বিএনপি সরকারের শুরুর বাজেট শুভ সূচনা।’
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘জুলাই সনদে গণভোটের বিষয়টি প্রথমে ছিল না। তবে জাতীয় নির্বাচন যাতে বিঘ্নিত না হয় সেজন্য পরে একইদিনে গণভোটের বিষয়টি যুক্ত হয়েছে। পরবর্তীতে বিএনপি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা করেছে, ৫ কোটি মানুষ হ্যাঁ ভোটে রায় দিয়েছে। আজকে সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্য বেশি। তারা কিন্তু সংস্কার করতে পারে। অথচ বিএনপির অর্জনকে বিরোধীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। বিষয়গুলো সংসদে আলোচনা হওয়া দরকার।’
সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘অনেকে অপপ্রচার করছে যে, বিএনপি সংস্কারের পক্ষে নয় বা সংস্কার বিরোধিতা করছে অথবা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে বিভিন্ন রকমের নতুন চিন্তাভাবনা করছে। আসলে বিষয়টি তেমন নয়। বিএনপি জুলাই সনদের স্বাক্ষরিত অংশ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে। আমরা মনে হচ্ছে একটা ঐতিহাসিক ভুল করেছি। কেননা, আমরা যেই রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান করেছি, রক্তাক্ত যেই বিপ্লব করেছি, ১৭ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে যে সোপান তৈরি করেছি এই বিপ্লবের পরে সরকারের প্রধান হিসেবে আমরা সঠিক ব্যক্তিকে মনোনয়ন করতে পারিনি। তিনি তার সমস্ত সুবিধা আদায় করেছেন কিন্তু বিনিময়ে দেশকে একটা গভীর সংকটের মুখে ফেলে রেখে চলে গেছেন।’
সভাপতির বক্তব্যে সৈয়দ এহসানুল হুদা বলেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবার আগে বাংলাদেশ বিশ্বাস থেকেই ‘আমরা বাংলাদেশি’ সংগঠনের যাত্রা শুরু। যার মধ্যে নিহিত আছে আমাদের নেতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। ভারতের আগ্রাসন ও মৌলভীবাজারে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহতের ঘটনা আমরা মানতে চাইনা। এটা নতুন বাংলাদেশ। এটা শেখ হাসিনার স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের বাংলাদেশ না।’
জুলাই সনদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো ভিন্নমত। সেজন্য তো সনদে নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে। আজকে যারা জনগণের ম্যান্ডেট পেয়ে সরকার গঠন করেছে তারাই তো জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বিএনপি যেভাবে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে সেভাবেই হুবহু বাস্তবায়ন করবে।’