ঢাকা: ইট-পাথরের ব্যস্ত নগরে বন্দি শিশু-কিশোরদের মোবাইলের ডিজিটাল স্ক্রিন থেকে বের করে খেলার মাঠের মুক্ত বাতাসে ফিরিয়ে আনার জোর দাবি উঠেছে জাতীয় সংসদে। একইসঙ্গে দেশের সব বিভাগীয় ও জেলা শহরের খেলার মাঠ ও পার্কগুলো দখলদারদের থাবা এবং মাদকসেবীদের কবল থেকে মুক্ত করে জনসাধারণের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ করার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
সোমবার (৮ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনির কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধি অনুসারে আনা এক জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের জবাবে মন্ত্রী এই কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। মন্ত্রী আশ্বস্ত করে বলেন, মাঠ ও পার্কগুলো পুনরুদ্ধার এবং আধুনিকায়নে সরকার বদ্ধপরিকর এবং এর মধ্যেই ঢাকাসহ সারা দেশে ব্যাপক উচ্ছেদ ও উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি দেশের খেলার মাঠগুলোর বেহাল ও আশঙ্কাজনক চিত্র সংসদের সামনে তুলে ধরে বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের পার্ক ও খেলার মাঠগুলো এক সময় ছিল শিশু-কিশোরদের দৌড়ঝাঁপ ও খেলাধুলা আর বয়স্কদের বিকেলে অবসরের প্রিয় ঠিকানা। দুঃখজনকভাবে এখন সেখানে মাদকের কারবার, হকারের উৎপাত আর বখাটেদের আড্ডা চলছে।
তিনি বলেন, কোথাও চলছে প্রকাশ্য অবৈধ দখল, আবার কোথাও শিশু পার্কের নামে বাণিজ্যিক ব্যবহার করে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মূল উপযোগিতা ধ্বংস করা হয়েছে। খেলার মাঠকে নগরের ফুসফুস ও গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য অবকাঠামো হিসেবে উল্লেখ করে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন যে, দীর্ঘদিন ধরে মাঠ ও পার্কগুলোকে নিজেদের সম্পদ ভেবে ভাড়া খাওয়া হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঢাকা সিটির দুই কর্পোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডে মাত্র ২৩৫টি খেলার মাঠ রয়েছে, যা ওয়ার্ড প্রতি দুটিরও কম।
তিনি আরোও বলেন, এর মধ্যে সাধারণ মানুষ কোনোমতে মাত্র ৪২টি মাঠ ব্যবহার করতে পারে, যা মোট মাঠের মাত্র ১৮ শতাংশ। বাকি ৬০ শতাংশ মাঠই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও অবৈধ দখলদারদের কবলে রয়েছে, যেখানে গড়ে উঠেছে ক্লাব, মার্কেট এমনকি হাটবাজার। তিনি আরও বলেন, ২০২৫ সালের একটি রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী ঢাকার ১২৬টি মাঠ হারিয়ে গেছে। তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ আবহে ফিরিয়ে নিতে বই-খাতা আর খেলার মাঠকেই প্রধান সহায় করার জোর দাবি জানান।
নিলুফার চৌধুরী মনির এই জরুরি নোটিশ ও বক্তব্যের জবাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর উত্থাপিত তথ্যের বেশিরভাগই সত্য বলে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক ও দলীয় কারণে দেশের বেশিরভাগ খেলার মাঠ ও ফাঁকা জায়গা দখল করে নেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সেসব মাঠ ও পার্ক উদ্ধার করে জনসাধারণের উপযোগী করার কাজ শুরু করেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ২৫৬টি পার্ক ও খেলার মাঠের উন্নয়ন ও কাজ পর্যায়ক্রমে চলছে। এক সময়ের হকার, ভবঘুরে ও অপরাধীদের আস্তানা গুলিস্থানের শহীদ মতিউর রহমান পার্কটি এখন সম্পূর্ণ হকারমুক্ত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন একটি আদর্শ পার্কে পরিণত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, মলিহালা পার্ক, মতিঝিল পার্ক, নবাবগঞ্জ পার্ক, রসুলবাগ মাঠ, খিলগাঁও-বাসাবো মাঠ, সাদেক হোসেন খোকা মাঠ, হাজারীবাগ পার্ক ও আমলীগোলা খেলার মাঠসহ অসংখ্য বিনোদন কেন্দ্রের উন্নয়ন কাজ চলমান বা শেষ পর্যায়ে রয়েছে। একইভাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ৩৮টি পার্ক ও মাঠকে আধুনিকায়ন করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে এবং উচ্ছেদ অভিযান নিয়মিত চালানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, ঢাকার বাইরেও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ডে পর্যায়ক্রমে খেলার মাঠ ও পার্ক নির্মাণের প্রকল্প চলমান রয়েছে এবং খুলনা সিটি করপোরেশনের হাদিস পার্ক, জাতিসংঘ শিশু পার্ক ও নিরালা আবাসিক এলাকার পার্কসহ প্রধান প্রধান বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখতে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় এখন প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে ইন্টার স্কুল ফুটবল ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা দেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে, যা তৃণমূল পর্যায়ে খেলাধুলার গতিকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। পরবর্তী সময়ে সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি মাঠগুলোতে বিশেষ করে সকাল ও সন্ধ্যায় মাদকসেবীদের অবস্থান নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে সম্পূরক প্রশ্ন করেন। মাদকসেবীদের সান্নিধ্যে এসে যেন কোমলমতি শিশুরা মাদকের বিষাক্ত ছোবলে আক্রান্ত না হয়, সে বিষয়ে স্বরাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ জানতে চান তিনি।
এই প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মাদককে একটি বড় জাতীয় সামাজিক ব্যাধি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনায় ইতোমধ্যে মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের আইনের আওতায় আনার কাজ জোরদার করা হয়েছে। তিনি বলেন, শুধু আইনি বা পুলিশি তৎপরতা দিয়ে এই ব্যাধি দূর করা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, মাদক পরিহার ও এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য দেশে একটি বড় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। বর্তমান সরকার যুব সমাজ এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে একটি বড় সামাজিক সচেতনতা ও আন্দোলন গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। মন্ত্রী আশ্বস্ত করে বলেন, সরকারের এই সমন্বিত উন্নয়ন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে মাঠগুলো অচিরেই পুরোপুরি নিরাপদ ও অবমুক্ত হবে এবং যুবসমাজের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হবে।