ঢাকা: এক পাম্প থেকে তেল সংগ্রহের পর ফের আরেক পাম্পে গিয়ে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। সেখান থেকে তেল নিয়ে মজুতের পর আবার যাচ্ছেন অন্য আরেকটি পাম্পে। এভাবে সারাদিন ঘুরে বেশ কয়েকটি পাম্প থেকে তেল সংগ্রহ করছে কয়েকটি চক্র। সেই তেল বাজারে বাড়তি দামে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বাইকাররা।
সাধারণ বাইকারদের অভিযোগ, শুধু মোটরসাইকেল চালকই নন, এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রাইভেটকারের চালকরাও। তারা তেল সংগ্রহ করে বেশি দামে বিক্রির পর গ্যাস ভরে গাড়ি চালাচ্ছেন। সম্প্রতি তেল সংকট দেখা দেওয়া কিছু মোটরসাইকেল চালক ও প্রাইভেটকারের কিছু ড্রাইভার অবৈধভাবে এই চক্রের হয়ে কাজ শুরু করে। রাজধানীর বেশ কয়েকটি পাম্পে ঘুরে ও বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
সোমবার (৬ এপিল) দুপুর ১২টা। রাজধানীর মৎসভবন এলাকা। প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের লাইন প্রায় এক কিলোমিটারে গিয়ে ঠেকেছে। যে লোকগুলো লাইনে দাঁড়িয়ে তাদের মধ্যে একটি বড় অংশের কোনো নড়াচড়ার শব্দ নেই। তাদের শরীরের ভাষায় মনে হয়েছে, লাইনে দাঁড়িয়েছি, তেল যখন দেয় দেবে। কিন্তু অন্যান্যরা নানাভাবে আফসোস করছেন যে, কখন তেল নেবে আর কখন ট্রিপ মারবে। আবার কেউ কেউ বলছেন, তেল নিয়ে অফিসে বা বাসায় যাবেন কখন।
এ রকম দেখে কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করলে আরাফাত হোসেন সবুজ নামে একজন সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি লাইনে দাঁড়িয়ে থাকব, যখন তেল দেবে তখনই নেব। আমার কোনো তাড়া নেই। আমার কাজই এটা।’ তিনি জানান, কোনো এক খুচরা বিক্রেতার হয়ে তিনি মোটরসাইকেল নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। দিনে ৪/৫ বারে দুই হাজার বা তারও বেশি টাকার তেল কিনে দিতে পারলে বিনিময়ে ৫০০ টাকা মজুরি পান। সেই তেল দোকানে খুচরা বিক্রি করা হয় লিটার প্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। আবার কেউ কেউ বিক্রি না করে মজুত করে রাখছেন বলেও জানান ওই মোটরসাইকেল চালক।
তার কাছে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, ‘লাইনে দাঁড়ানো অনেককে দেখেন তাদের কোনো অফিস নেই, কাজও নেই। যারা পাঠাও চালায় তারা ভোরবেলা তেল নেন, অথচ দেখেন কতজন অলস বসে সময় পার করছে। একবার এক পাম্পে নেওয়ার পর আরেক পাম্পে গিয়ে দাঁড়ান সবাই। তেলও মিলছে। আবার অনেক খুচরা দোকানিও রয়েছেন যারা তেল কিনে মজুত করছেন। পরে বেশি দামে বিক্রি করছেন।’
আরাফাত জানান, মৎস্যভবন মোড়ে রমনা ফিলিং স্টেশনে তেল নেওয়ার আগে তিনি ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে টাঙ্কি ভর্তি করে তেল নিয়েছেন। মোটরসাইকেলটি কার? নিজের নাকি তেল মজুতদারের?- এর উত্তরে তিনি জানান, মোটরসাইকেলটা তার নিজের। কখনো ভাড়া মারছেন, আবার কখনো তেল কেনার পর মজুতদারকে দিচ্ছেন।
৬ এপ্রিল, দুপুর ২টা। রাজধানীর পরীবাগে সোনার বাংলা তেল পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মোশারফ হোসেন লিটন সারাবাংলাকে বলেন, ‘ভাই সবাই তেল কিনছে আর বিক্রি করছে। তাছাড়া, এত তেল যায় কোথায়?’ একই ব্যক্তি বিভিন্ন স্টেশন থেকে তেল কিনছেন- এরকম কয়েকজনকে তিনি দেখেছেন। তার মধ্যে তিনিও একজন বলে স্বীকার করেন। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আমি অন্যান্যদের মতো তেল মজুদ করছি না। আমি তেল কিনে বেশি দামে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় বিক্রি করছি। ১২০ টাকা লিটার কিনছি, ২৫০ টাকা লিটার বিক্রি করছি। এতে আমার সারাদিনে এক থেকে দেড় হাজার টাকা আসে।’
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) রাজধানীর মতিঝিল করিম অ্যান্ড সন্স পাম্প থেকে তেল নিচ্ছিলেন প্রাইভেটকার চালক ইব্রাহিম হাসান। সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘এই পাম্প থেকে ২ হাজার টাকার তেল কিনব। এর পর একটা ভাড়া শেষ করে তেল ঢেলে রেখে ট্রাস্ট পাম্পে গিয়ে লাইনে দাঁড়াব। সেখান ২ ঘণ্টা থাকলে ৫ হাজার টাকার তেল পাব। কারণ, সেখানে আনলিমিটেড নেওয়া যায়।’
ইব্রাহিম বলেন, ‘কিছু তেল মজুত করেছি সংকটে কাজে লাগানোর জন্য। আর বেশিরভাগ বিক্রি করছি বেশি দামে।’ কারা কিনছেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘খুচরা বিক্রেতারা বেশি দামে কিনে তার চেয়েও বেশি দামে বিক্রি করছেন। সবার ঘরে তেল আছে। এই কাজে সরকারি দলের অনেক লোকও জড়িত।’ ওরা জড়িত না হলে কেউ রাখতে পারত না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মিরপুর ৬০ ফিট সড়কে অনেকেই খুচরা হিসেবে তেল বিক্রি করেন। এর আগে স্বাভাবিক সময়ে তেল বিক্রি করতেন পাম্পের চেয়ে ৫-১০ টাকা বেশি। ক্রাইসিস শুরুর পর থেকে অনেকে তেল বিক্রি বন্ধ করে দেয়। আবার অনেকে প্রকাশ্যে বেশি দামে বিক্রি করছে। কারও কারও বিরুদ্ধে অপ্রকাশ্যে দ্বিগুণেরও বেশি দামে তেল বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
৬০ ফিট সড়কের কলাপাতা রেস্টুরেন্টের পর মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের বিপরীত পাশে অকটেন খুচরা বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকা লিটার। কিন্তু কোনো মোটরসাইকেলকেই একলিটারের বেশি দেন না দোকানদার। সরাসরি বলে দেন, ‘এখানে তেল নাই।’ কোথা থেকে তেল আনছেন? জানতে চাইলে আওলাদ হোসেন মন্টু সারাবাংলাকে বলেন, ‘আপনাদের মতো মানুষদের কাছ থেকেই নিই। আমরাও বেশি দামে কিনি। ওনারা রাত দিন খেটে ঝড়-বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করে আমাদের দেয়। বিনিময়ে তারাও কিছু পায় আমরাও কিছু ইনকাম করি।’
করণীয় কী? জানতে চাইলে দোকানি মন্টু বলেন, ‘এই মুহূর্তে প্রাইভেটকারে তেল দেওয়া বন্ধ করা দরকার। সেইসঙ্গে মোটরসাইকেলও বন্ধ করা দরকার। তেল পাবে শুধু গণপরিবহন। কিছুদিন পর প্রয়োজনে কার্ড সিস্টেম করে ফের তেল দেওয়া চালু করবে সরকার। তবে এই মুহূর্তে তেলের রিজার্ভ বাড়াতে সব বন্ধ করা দরকার বলে মনে করছি।’
এসব বিষয়ে পাম্প মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার তেল দিচ্ছেন এরপরেও চাহিদা মিটছে না কেন? জবাবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউশন এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক সারাবাংলাকে বলেন, ‘যতক্ষণ থাকছে ততক্ষণ তেল দেওয়ার অনুমতি দেওয়া আছে। তেল নেওয়ার পর তা মজুত করছে কিনা সেটি জানি না। বিষয়টি নিয়ে সরকার বা সরকারের সংস্থাগুলো কাজ করবে। তদারকি করার দায়িত্ব তাদের।’
তিনি বলেন, ‘তবে এই মুহূর্তে একটি কঠোর নীতিমালা করা জরুরি বলে মনে করছি। এর আওতায় এমার্জেন্সি সংস্থা ছাড়া কাউকে তেল না দেওয়াটাই উত্তম বলে মনে করছি। তাছাড়া প্রাইভেটকারগুলোতে কোনোভাবেই তেল দেওয়া উচিত না। কারণ, তারা গ্যাসে গাড়ি চালাচ্ছে, আবার তেলও নিচ্ছে। এই তেলটাই হয়তো কেউ কেউ মজুত করছে।’
নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে সভাপতি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ যদি আরও দীর্ঘমেয়াদী হয়ে যায়, তাহলে পাম্পগুলোর জন্য নিরাপত্তা দরকার পড়বে। এমনকি ট্যাঙ্ক লরিগুলোর জন্যও। নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ ও সেনা সদস্য মোতায়েনের দাবি জানিয়েছি সরকারের কাছে।’ এছাড়া, জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত রোধে রেশনিং পদ্ধতি চালুর পরামর্শসহ বিভিন্ন দাবি ও মতামত তুলে ধরার কথাও জানান তিনি।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের মধ্যেও দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বলেন, ‘মজুত থাকা জ্বালানির মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ডিজেল। এর পরিমাণ ১ লাখ ৬৪ হাজার ৬৪৪ টন। এ ছাড়া, অকটেনের ১০ হাজার ৫০০ এবং পেট্রল ১৬ হাজার টন মজুত রয়েছে।’
এপ্রিলে আরও জ্বালানি আসার তথ্যও উপস্থাপন করেন তিনি। তেলের দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করে গত মাসে দাম বাড়ায়নি সরকার। তবে মে মাসের জ্বালানির দাম নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। মন্ত্রিপরিষদে আলোচনার মধ্যমে প্রয়োজন মনে করলেই কেবলমাত্র দাম বাড়বে।’