ঢাকা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে আগামী ১২ মার্চ। সংসদের নিয়ম অনুযায়ী এদিন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। প্রথম অধিবেশনের প্রথম সভায় স্পিকারের দায়িত্ব পালন করার কথা ছিল বিদায়ী স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরীর। কিন্তু ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর তিনি পদত্যাগ করেছেন। ফলে এই অধিবেশনে বিদায়ী ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুর সভাপতিত্ব করার কথা থাকলেও তিনি কারাগারে রয়েছেন।
এ পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি দলের কোনো একজন সিনিয়র সদস্য প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন। তার সভাপতিত্বে নতুন স্পিকার নির্বাচিত হবে। তাকে শপথ পাঠ করাবেন রাষ্ট্রপতি। এরপর নতুন স্পিকারের সভাপতিত্বে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন হবে। যেহেতু সরকারি দল বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে সেজন্য তারা যার নাম প্রস্তাব করবে তিনিই হবেন পরবর্তী ডেপুটি স্পিকার।
জুলাই সনদে এবারের সংসদে দু’জন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের কথা রয়েছে। তার মধ্যে একজন সরকারি দলের অন্যজন বিরোধীদলের। সেজন্য এরই মধ্যে একজন ডেপুটি স্পিকারের নাম প্রস্তাব করতে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বিরোধীদলকে আহবান জানানো হয়েছে। কিন্তু বিরোধীদলের পক্ষ থেকে সেই আহবান গ্রহণ করা হয়নি। তারা বলেছে, সরকারি দল যদি লিখিতভাবে আমাদের প্রস্তাব দেয়, তাহলে আমরা সেটা নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।
এদিকে প্রধান বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামীর একটি সূত্র জানায়, সংসদের প্রধান বিরোধীদল জামায়াতের ভাবনা গণভোটে অনুমোদিত জুলাই জাতীয় সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের পরিষ্কার রূপরেখা ছাড়া তারা আপাতত এই পদ নেবে না।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মাওলানা আব্দুল হালিম সারাবাংলাকে বলেন, ‘বিষয়টি জুলাই জাতীয় সনদের সঙ্গে জড়িত। ক্ষমতাসীন দল বিএনপি জুলাই সনদ কার্যকরে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। কেবল একজন ডেপুটি স্পিকার দিলেই সংস্কার প্রস্তাব, অথবা জুলাই সনদের অঙ্গীকার পরিপূর্ণ হবে না। বিরোধীদল থেকে ডেপুটি স্পিকার মনোনয়ন দেওয়া সংস্কার প্রস্তাবের খণ্ডিত অংশ। সংস্কারের অনেকগুলো প্রস্তাব আছে। সেসব বিষয়ে পরিষ্কার করতে হবে। নচেৎ প্রশ্ন থেকে যাবে।’
গত ২ মার্চ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা জুলাই জাতীয় সনদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতে যেটা সমঝোতায় এসেছি, রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে সেটার বাস্তবায়ন এখন থেকেই শুরু করতে চাই। আমাদের দলের পক্ষ থেকে আমরা প্রধান বিরোধীদলকে মৌখিকভাবে ও সাক্ষাতে অফার করেছি, তারা যেন ডেপুটি স্পিকার ঠিক করে। সেটা জাতীয় সংসদে স্পিকার নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে নির্বাচিত হতে পারে।’
এ প্রসঙ্গে গত ৫ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘আমাদের বর্তমান সংবিধানে লেখা আছে জাতীয় সংসদে একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার থাকবেন। আর আমরা যে সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিলাম সেখানে একজন স্পিকার থাকবেন, দুজন ডেপুটি স্পিকার থাকবেন। সেই দু’জনের মধ্যে একজন সরকারি দলের, একজন বিরোধী দলের। তারা (সরকারি দল) যদি মনে করে, জুলাই সনদের অংশ হিসেবে একজন ডেপুটি স্পিকার আমাদের দেবে, একজন তাদের থাকবে- জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ সংস্কার বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত এটার কোনো বৈধতা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘সংস্কার পুরোটা বাস্তবায়ন হলে যদি দু’জন ডেপুটি স্পিকার হয়, একজন আমাদের অফার করে, তখন আমরা আইনি ভিত্তিতে পর্যালোচনা করে দেখব। আর বর্তমান অবস্থায় যদি ডেপুটি স্পিকার দিতে চায়, তাহলে লিখিতভাবে প্রস্তাব দিলে বিবেচনা করব। কোনো একজন ব্যক্তি বা মন্ত্রী মৌখিকভাবে বললে সেটা রেসপন্স করা ডিফিকাল্ট। উই নিড অফিসিয়াল প্রপোজাল।’
এদিকে গত ৬ মার্চ গুলশানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘জামায়াতকে ডেপুটি স্পিকারের প্রস্তাব দিয়ে বিএনপি উদারতা দেখিয়েছে। যেটা আমরা না বললে পারতাম। সেটা আমরা অফার করেছি, তারা প্রত্যাখান করেনি। তবে দুয়েকজনের বক্তব্য শুনেছি, লিখিত প্রস্তাব চাচ্ছে। লিখিত প্রস্তাব দেওয়ার মতো কোনো বিধানতো নেই। মাননীয় সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইফতার মাহফিলের দাওয়াতে বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে কথা বলেছেন। আমিও উপস্থিত ছিলাম। সেই হিসেবে তাদের সেই প্রস্তাবটা গ্রহণ করা উচিত বলে আমি মনে করি। এখানে সবকিছু লিখিত দিতে হবে তেমনতো নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা উদারতা প্রদর্শন করতে চেয়েছিলাম যে, জুলাই জাতীয় সনদের যা কিছু আমরা সম্মত হয়েছি, তা এখন থেকেই প্রাকটিস করি। তবে উনারা সঠিক বলেছেন যে, সংবিধান সংশোধিত হবে। দুইটা ডেপুটি স্পিকারের পদ সৃষ্টি হবে। তারপরে একজন ডেপুটি স্পিকার তারা পাবেন, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু আমরা এখন থেকে আমাদের উদারতা প্রদর্শন করে বিদ্যমান ডেপুটি স্পিকারের যে পদটা আছে-যেটা দিতে চেয়েছি, সেটা তাদের উদারভাবে দেখা উচিত।’
জামায়াতের দলীয় সূত্র জানায়, গণভোটের ফল অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের নিশ্চয়তা পাওয়ার পরই জামায়াত ডেপুটি স্পিকার পদ নিতে চায়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ইফতার মাহফিলের পর চা-চক্রে বিএনপি’র চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই মনোভাব জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। অবশ্য বিদ্যমান আইনে যদি সরকারি দল বিরোধীদলকে ডেপুটি স্পিকার পদটি দিতে চায় সেক্ষেত্রে জামায়াত তা গ্রহণ করবে কি না তা জানার জন্য ১২ মার্চ প্রথম অধিবেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।