Tuesday 03 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহিদ ‘শংকু’র নামে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ও দিবস পালনের দাবি

রাব্বী হাসান সবুজ, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৩ মার্চ ২০২৬ ১৭:৪০

শহিদ শংকু। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

রংপুর: রংপুরের গুপ্তপাড়ার সেই ১২ বছরের কিশোর শংকু সমজদার আজও মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহিদ হিসেবে স্মরণীয়। এ ছাড়া, রংপুর অঞ্চলের পাশাপাশি সারাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্বীকৃত প্রথম শহিদও। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ হরতালের মিছিলে অবাঙালি ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে ছোড়া গুলিতে শহিদ হন তিনি। তবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলেও স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও তার মৃত্যুদিন সরকারিভাবে পালন হয় না। এমনকি তার নামে নির্মিত হয়নি কোনো ম্যুরাল বা স্মৃতিস্তম্ভও। শহিদ পরিবারের দাবি— জেলা প্রশাসন বা সরকারি উদ্যোগে ৩ মার্চ ‘শহিদ শংকু দিবস’ হিসেবে ঘোষণা এবং তার স্মৃতি রক্ষায় স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তোলা হোক।

বিজ্ঞাপন

জানা যায়, একাত্তরের ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলে সারাদেশের মতো রংপুরও উত্তাল হয়ে ওঠে। ৩ মার্চ হরতাল পালিত হয়। ওইদিন সকাল ৯টায় কাচারিবাজার থেকে ছাত্র-জনতার বিশাল মিছিল বের হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে রফিকুল ইসলাম গোলাপ, অলক সরকার, মুকুল মুস্তাফিজসহ অনেকে মিছিলের সামনে ছিলেন। কৈলাশ রঞ্জন উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র শংকু সমজদার বড় ভাই কুমারেশ সমজদারের হাত ধরে গুপ্তপাড়ার বাড়ি থেকে মিছিলে যোগ দেন।

মিছিল তেঁতুলতলা (বর্তমান শাপলা চত্বর) পেরিয়ে আলমনগরে অবাঙালি ব্যবসায়ী সরফরাজ খানের বাড়ির সামনে পৌঁছলে শংকু দেওয়ালে উর্দুতে লেখা সাইনবোর্ড দেখে তা নামাতে যান। তখনই বাড়ির ছাদ থেকে গুলি ছোড়া হয়। গুলিতে ঘায়েল হন শংকু। মুসলিম উদ্দিন কমিশনার (মুসলিম কমিশনার) তাকে পাঁজাকোলা করে হাসপাতালের দিকে ছুটলেও পথেই তার মৃত্যু হয়।

শংকুর রক্তাক্ত দেহ দেখে রংপুরে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। জনতা অবাঙালিদের দোকানপাট ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এতে ইপিআর বাহিনী বাধা দিলে ওই দিনই আরও দু’জন শহিদ হন। তাদের একজন আবুল কালাম আজাদ, অপরজন ওমর আলী। গুলিবিদ্ধ হয়ে পরে মারা যান শরিফুল ইসলাম মকবুল। এ ছাড়া, পায়ে গুলি খেয়ে বেঁচে যান মোহাম্মদ আলী।

সেদিন মিছিলের প্রত্যক্ষদর্শী কবি-সাংবাদিক নজরুল মৃধা এবং মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা সদরুল আলম দুলু ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সারাবাংলাকে বলেন, ‘শংকুর মৃত্যু রংপুরে বিদ্রোহের আগুনে জ্বালিয়ে দেয়। বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে রংপুরের এই ৩ মার্চের ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন, যা মুক্তিকামী জনতাকে নতুন উদ্দীপনা জোগায়।’

শহিদের একমাত্র জীবিত বোন ঝর্না ব্যানার্জি বর্তমানে রংপুর নগরীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘তখন আমার বয়স চার-পাঁচ। ভাইয়ের মরদেহও দেখতে পাইনি। মা দীপালি সমজদার (মৃত্যু ২০২৩) ও বড় ভাই কুমারেশ সমজদার (মৃত্যু ২০২১) শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত চেয়েছিলেন ৩ মার্চ সরকারি উদ্যোগে পালিত হোক এবং একটি স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে উঠুক। আমার ভাই দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে শহিদ হয়েছেন—এটা গর্বের। সরকার শহিদের মর্যাদা দিয়েছে, কিন্তু ভাতা দেয়নি।’

২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে রংপুর জেলা প্রশাসন শংকুর স্মৃতি রক্ষায় কামাল কাছনা এলাকায় ১০ শতক জমির দলিল হস্তান্তর করে। ওই বাড়ির দেওয়াল ও গেটে স্মৃতিফলক লাগানো হয়। পরে বাড়িটি সংস্কারও করা হয়েছে। তবে ম্যুরাল বা স্মৃতিস্তম্ভ এখনো অপূর্ণ। তার নামে রয়েছে ‘শহীদ শংকু সমজদার বিদ্যানিকেতন’ নামে একটি বেসরকারি বিদ্যাপীঠ।

উল্লেখ্য, প্রতি বছর ৩ মার্চ ‘শহিদ শংকু দিবস’ হিসেবে রংপুরবাসী স্মরণ করে। আজও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন স্মরণসভার আয়োজন করেছে। শংকুর সাহস ও আত্মত্যাগ আজও অম্লান। তার পরিবারের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা—সরকারি স্বীকৃতির পূর্ণতা। রংপুরের মাটিতে প্রথম রক্তদানকারী এই কিশোরের স্মৃতি যেন চিরকাল জাগ্রত থাকে এটাই প্রত্যাশা করেন বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ রংপুরবাসী।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর