ঢাকা: কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার চত্বর যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস। সেখানে বড়দের গম্ভীর শ্রদ্ধার পাশাপাশি নজর কাড়ছে একদল খুদে প্রাণ। কারো কপালে লাল-সবুজের পট্টি, কারো গালে আঁকা শহিদ মিনার আর বর্ণমালার আলপনা। সাদা-কালো পোশাকে সাজানো এই শিশুদের হাতে ধরা একগুচ্ছ রক্তলাল গোলাপ যেন জানান দিচ্ছে ৫২-র চেতনা হারাবার নয়, বরং তা সঞ্চারিত হচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
রাজধানীর ধানমন্ডি থেকে আসা পাঁচ বছরের শিশু আরিয়ান। মা সামিয়া রহমানের হাত শক্ত করে ধরে সে ভিড়ের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে মূল বেদির দিকে। সামিয়া জানালেন, আগের রাত থেকেই আরিয়ানের প্রস্তুতি শুরু। টিভিতে প্রভাতফেরির গান শুনে ও বারবার বলছিল ‘মা, আমি কখন ফুল দিতে যাব?’ সকালে ঘুম থেকে উঠেই ওর প্রথম কাজ ছিল বর্ণমালা আঁকা টি-শার্টটা খুঁজে বের করা। এই যে ও নিজে হাতে ফুল নিয়ে বেদিতে রাখল, এটাই ওর বড় হওয়া। ও অন্তত জানুক, আমরা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছি।
শহিদ মিনার সংলগ্ন এলাকায় দেখা মিলল সাত বছরের রূপকথার সঙ্গে। তার বাবা মেয়ের গালে শহিদ মিনারের প্রতিকৃতি আঁকিয়ে দিয়েছেন। নুসরাত আধো আধো কণ্ঠে বলল, ‘সালাম-বরকত দাদুরা রক্ত দিয়ে আমাদের কথা বলা শিখিয়েছেন। তাই আমি আজ তাদের জন্য ফুল নিয়ে এসেছি।’
একুশে ফেব্রুয়ারির সকালে দেখা গেছে অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানদের শহিদ মিনারের পাদদেশে দাঁড়িয়ে ভাষা আন্দোলনের গল্প শোনাচ্ছেন। উত্তরা থেকে আসা এক দম্পতি তাদের ছয় বছরের সন্তান রোদেলা-কে বোঝাচ্ছিলেন কেন আজ সবাই খালি পায়ে। রোদেলার মা বললেন, ‘ও এখন বাংলা অক্ষরগুলো চিনতে শিখেছে। বর্ণমালার প্রতি ওর এই মমত্ববোধ তৈরি করতেই ওকে আজ জনস্রোতের মাঝে নিয়ে আসা। আমরা চাই ও বড় হয়ে অন্য ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোক, কিন্তু নিজের মায়ের ভাষাকে রাখুক সবার ওপরে।’
১৯৫২ সালের সেই উত্তাল দিনগুলোতে যারা রাজপথে প্রাণ দিয়েছিলেন, তারা হয়তো জানতেন না তাদের এই ত্যাগ একদিন শিশুদের উৎসবে পরিণত হবে। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে শহিদ মিনারে শিশুদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, একুশের চেতনা কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়।
শিশুদের কচি হাতের ছোঁয়ায় শহিদ মিনারের বেদি যখন ফুলে ফুলে ভরে ওঠে, তখন মনে হয় একুশ মরে না, একুশ বেঁচে থাকে প্রতিটি শিশুর প্রথম উচ্চারিত বর্ণমালার মাঝে।