Saturday 18 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ইরান যুদ্ধের ‘তিন ঘড়ি’, সময়ের আবর্তে কার ভাগ্য কোন দিকে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:০৮

যেকোনো যুদ্ধে কামানের গোলার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ক্যালেন্ডারের পাতা। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যকার বর্তমান যুদ্ধের ক্ষেত্রেও এটি সমভাবে প্রযোজ্য। এই সংঘাতের প্রতিটি পক্ষই এখন সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক ঘড়ি ভিন্ন দিকে চলছে এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ মরণপণ সময়সীমার মুখোমুখি।

ওয়াশিংটন: মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঘড়ি

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন পুনরায় ক্ষমতায় আসেন, তার দর্শন ছিল ‘দ্রুতগতির কূটনীতি’ এবং যুদ্ধের চেয়ে ‘ডিলের’ (চুক্তির) দিকে তার ঝোঁক ছিল বেশি। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, ইরানের নেতৃত্বের ওপর একটি প্রচণ্ড আঘাত হানতে পারলে কয়েক দিনের মধ্যেই তেহরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটবে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি।

বিজ্ঞাপন

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন মেয়ারশেইমার মনে করেন, ‘ট্রাম্প একটি বিশাল ভুল করেছেন।’ যুদ্ধটি এখন দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের দিকে মোড় নিয়েছে, যেখানে সময় আসলে ইরানের পক্ষে।
অভ্যন্তরীণভাবে ট্রাম্প চরম রাজনৈতিক মাশুল গুনছেন

জ্বালানির দাম: যুদ্ধের আগে তেলের দাম ছিল ব্যারেল প্রতি ৬৭ ডলার, যা এখন ৯০ ডলার ছাড়িয়েছে।

মূল্যস্ফীতি: যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতি ৩.৩ শতাংশে পৌঁছেছে।

জনপ্রিয়তা: অর্থনীতির ওপর ট্রাম্পের জনসমর্থন এখন সর্বনিম্ন ২৯ শতাংশে নেমে এসেছে।

নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র সাত মাস বাকি। ভোটাররা যদি পাম্পে গিয়ে তেলের দামের এই জ্বালা সহ্য করতে থাকে, তবে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

তেহরান: জ্বলন্ত কয়লা আঁকড়ে ধরা

ইরানের কৌশল ওয়াশিংটনের ঠিক উল্টো। ট্রাম্প যেখানে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে চান, তেহরানের টিকে থাকার মূলমন্ত্র হলো ‘ধৈর্য’। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান চরম আঘাত সহ্য করেছে: সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু, শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ড এবং পারমাণবিক অবকাঠামোয় বোমাবর্ষণ। তবুও ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি।

বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ জেফরি স্যাকস এই যুদ্ধের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক চুক্তিটি ছিঁড়ে ফেলে এবং তাদের ধর্মীয় নেতাকে হত্যা করে একটি ভয়াবহ আঞ্চলিক অস্থিরতা তৈরি করেছেন।

ইরানের বর্তমান অবস্থা হলো ‘হাতের তালুতে জ্বলন্ত কয়লা’ ধরে রাখার মতো। অসহ্য যন্ত্রণা হওয়া সত্ত্বেও তেহরান সেটি ছেড়ে দিচ্ছে না। তাদের কৌশল হলো—যতক্ষণ না তেলের দাম ১০০ বা ১৫০ ডলারে পৌঁছায় এবং ট্রাম্পের ঘরোয়া জনসমর্থন ধসে না পড়ে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই আঘাত সহ্য করে যাওয়া। তারা জানে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ রেখে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর তারা যে চাপ তৈরি করেছে, তাতে শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনকেই পিছু হটতে হবে।

তেল আবিব: যে যুদ্ধ শেষ হওয়ার নয়

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘড়ি আবার ওয়াশিংটনের ঠিক বিপরীত দিকে চলছে। ঘরোয়া আইনি জটিলতা এবং আসন্ন নির্বাচনের মুখে নেতানিয়াহুর জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে লাভজনক। যুদ্ধ তাকে সমালোচকদের হাত থেকে রক্ষা করে এবং জাতীয়তাবাদের আবেগে ভোটারদের ঐক্যবদ্ধ রাখে।

এমনকি যখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির আলাপ চলছে, নেতানিয়াহুর দপ্তর স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এই সমঝোতায় লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়। প্রবীণ সাংবাদিক গিডিওন লেভি মনে করেন, নেতানিয়াহুর কাছে সামরিক সমাধানই প্রথম পছন্দ, কূটনীতি নয়। ইসরায়েল এখন লেবাননের মানচিত্র পুনর্গঠন এবং হিজবুল্লাহকে নির্মূল করার জন্য যুদ্ধের এই সুযোগকে পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করতে চায়।

যখন তিন ঘড়ি তিন দিকে চলে

এই সংঘাতের জটিলতা এখানেই যে, তিন পক্ষ তিন ভিন্ন সময়সীমায় কাজ করছে। ট্রাম্প নভেম্বরের আগেই একটি সমাধান চান। ইরান চায় নভেম্বর পর্যন্ত টিকে থেকে ট্রাম্পকে ক্লান্ত করে দিতে। নেতানিয়াহু চান যুদ্ধকে যতটা সম্ভব দীর্ঘায়িত করতে।

অধ্যাপক মেয়ারশেইমারের মতে, ইরান ইতোমধ্যে নৈতিকভাবে জিতে গেছে। কারণ তারা প্রাথমিক প্রচণ্ড আঘাত সহ্য করে টিকে গেছে এবং ওয়াশিংটনকে পিছু হটার রাস্তা খুঁজতে বাধ্য করেছে।

[আল-জাজিরার প্রতিবেদনের ভাবানুবাদ]

সারাবাংলা/এইচআই