Monday 16 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘন
ভারতের ‘র’ এবং আরএসএসের ওপর নিষেধাজ্ঞা চায় মার্কিন কমিশন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৬ মার্চ ২০২৬ ২০:২৮ | আপডেট: ১৬ মার্চ ২০২৬ ২০:৩২

ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

ধর্মীয় স্বাধীনতা পরিস্থিতির চরম অবনতির অভিযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক কমিশন (ইউএসসিআইআরএফ) ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) এবং গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’র ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছে।

রোববার (১৬ মার্চ) দ্য ইকোনমিক টাইমস ও ইন্ডিয়া ডটকমের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।

মার্চের শুরুতে প্রকাশিত ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে এসসিআইআরএফ উল্লেখ করেছে, ২০২৫ সাল জুড়ে ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি ঘটেছে। নিয়মতান্ত্রিক, চলমান এবং চরম লঙ্ঘনের দায়ে আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা আইনের (আইআরএফএ) আওতায় এই প্রতিবেদন ভারতকে ‘বিশেষ উদ্বেগের দেশ’ (সিপিসি) হিসেবে তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করেছে।

বিজ্ঞাপন

ইউএসসিআইআরএফ প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে:

প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে ভারত সরকার ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং তাদের উপাসনালয়গুলোকে লক্ষ্য করে নতুন আইন প্রবর্তন ও কার্যকর করেছে। বেশ কিছু রাজ্য ধর্মান্তর-বিরোধী আইন প্রবর্তন বা আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। ওই সব আইনে কঠোর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ একদিকে নাগরিকদের এবং ধর্মীয় শরণার্থীদের ব্যাপক হারে আটক ও অবৈধ বহিষ্কারের পথ সুগম করেছে, অন্যদিকে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর চালানো নজরদারি বা স্বঘোষিত রক্ষীবাহিনীর (vigilante) আক্রমণগুলোকে প্রশ্রয় দিয়েছে। সারা বছর ধরে বিভিন্ন রাজ্যে হিন্দু জাতীয়তাবাদী জনতা কোনো প্রকার শাস্তির ভয় ছাড়াই মুসলিম ও খ্রিস্টানদের ওপর হয়রানি, উস্কানি এবং সহিংসতা চালিয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, মার্চ মাসে মহারাষ্ট্রে ১৭শ শতাব্দীর মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সমাধি অপসারণের জন্য বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ডাক দিলে সেখানে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে; পরবর্তী দাঙ্গায় কয়েক ডজন মানুষ আহত হন। জুন মাসে ওড়িশার বিজেপি কর্মকর্তারা জানান, ভিএইচপি-র নেতৃত্বাধীন ২০টি বিক্ষোভ চলাকালীন পবিত্র কুরআন অবমাননার ঘটনা ঘটেছে; এসব হামলায় আটজন আহত হলেও পুলিশ কোনো হস্তক্ষেপ করেনি।

এপ্রিল মাসে কাশ্মীরে তিন বন্দুকধারী প্রধানত হিন্দু পর্যটকদের ওপর হামলা চালায়। খবরে বলা হয়, তারা ভুক্তভোগীদের ‘কালিমা’ পাঠ করতে বলে এবং যারা তা পারেনি তাদের হত্যা করে—এতে মোট ২৬ জন নিহত হন। এই ঘটনাটি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পাঁচ দিনের একটি সংঘাতের সূত্রপাত ঘটায়। এরপর কর্ণাটক এবং উত্তরপ্রদেশেও কথিত ঘৃণ্য অপরাধের খবর পাওয়া যায়। উত্তরাখণ্ডে একটি হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর সদস্যরা কাশ্মীরের ঘটনার প্রতিশোধ নিতে একজন মুসলিম রেস্তোরাঁ মালিককে গুলি করে হত্যা করে বলে অভিযোগ ওঠে; পরবর্তীতে রাজ্য পুলিশ সেই রেস্তোরাঁটি বাজেয়াপ্ত করে।

এইসব হামলার পরবর্তী সময়ে কর্তৃপক্ষ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে গণ্য করে তাদের দেশত্যাগের (ডিপোর্টেশন) বিষয়টিকে আইনত বৈধ বলে দাবি করে।

মে মাসে ৪০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে (যার মধ্যে ১৫ জন খ্রিস্টান ছিলেন) আটক করে মিয়ানমার সংলগ্ন আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং শুধুমাত্র লাইফ জ্যাকেট দিয়ে তাদের তীরে সাঁতরে যেতে বাধ্য করা হয়। জুলাই মাসে আসাম থেকে শত শত বাংলাভাষী মুসলিমকে বাংলাদেশে বহিষ্কার করা হয়, যদিও তারা ভারতের নাগরিক ছিলেন; বিজেপি কর্মকর্তারা তাদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে জাতীয় পরিচয়ের জন্য হুমকি বলে উল্লেখ করেন। সেপ্টেম্বর মাসে ‘ফরেনার্স অ্যাক্ট’ বা বিদেশি আইনের আওতায় নতুন বিধিমালা ট্রাইব্যুনালগুলোর ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই সন্দেহভাজন ‘বিদেশিদের’ বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি ও তাদের আটক করার সুযোগ তৈরি হয়।

সরকার ওয়াকফ সম্পত্তিগুলোর ওপরও নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। মে মাসে সংসদ ‘ওয়াকফ বিল’ পাস করে, যার মাধ্যমে মসজিদ, মাদরাসা এবং কবরস্থানের মতো ধর্মীয় এনডাউমেন্ট বা দান করা সম্পত্তির পরিচালনা বোর্ডে অমুসলিম সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর প্রতিবাদে পশ্চিমবঙ্গে প্রাণঘাতী বিক্ষোভে তিনজন নিহত হন। সেপ্টেম্বর মাসে সুপ্রিম কোর্ট এই আইনের মূল বিধানগুলো স্থগিত করে এবং ফেডারেল বোর্ডে অমুসলিম ও ওয়াকফ-বহির্ভূত সদস্য সংখ্যা সর্বোচ্চ চারজনে সীমাবদ্ধ করে দেয়। ওই একই মাসে, উত্তরাখণ্ড ‘স্টেট অথরিটি ফর মাইনরিটি এডুকেশন’ আইন পাস করে মাদরাসা বোর্ড বিলুপ্ত ঘোষণা করে এবং শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টানদের ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের অধীনে নিয়ে আসে।

মার্কিন সরকারের প্রতি ইউএসসিআইআরএফ-এর নীতিগত সুপারিশ

আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন অনুযায়ী গুরুতর ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘন এবং তা প্রশ্রয় দেওয়ার দায়ে ইউএসসিআইআরএফ ভারতকে ‘বিশেষ উদ্বেগের দেশ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করেছে। প্রতিবেদনে এই লঙ্ঘনের জন্য দায়ী ব্যক্তি ও সংস্থাগুলোর ওপর ‘লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা’ আরোপের আহ্বান জানানো হয়েছে; যার মধ্যে আরএসএস’র নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং এর সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়াও প্রতিবেদনটি ভারতকে চাপ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে যেন তারা ইউএসসিআইআরএফ এবং মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টকে দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি মূল্যায়নের অনুমতি দেয়। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহায়তা এবং বাণিজ্য নীতিকে ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতার উন্নতির সঙ্গে যুক্ত করার এবং ‘আর্মস এক্সপোর্ট কন্ট্রোল অ্যাক্ট’-এর ৬ নম্বর ধারা প্রয়োগ করে ভারতের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছে—যাতে মার্কিন নাগরিক এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর চলা ভয়ভীতি ও হয়রানি বন্ধ করা যায়।

প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে, মার্কিন কংগ্রেসে ২০২৪ সালের ‘ট্র্যান্সন্যাশনাল রিপ্রেশন রিপোর্টিং অ্যাক্ট’ পুনরায় উত্থাপন ও পাস করা উচিত। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে ভারত সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলোর ওপর একটি বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরির বিধান নিশ্চিত হবে। প্রতিবেদনে ‘আর্মস এক্সপোর্ট কন্ট্রোল অ্যাক্ট’র ৬ নম্বর ধারাটি উদ্ধৃত করা হয়েছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত ব্যক্তিদের ওপর নিয়মিত ভয়ভীতি প্রদর্শন বা হয়রানি চালিয়ে যায়, তাদের অনুকূলে কোনো প্রস্তাবপত্র (Letters of Offer), ঋণ, গ্যারান্টি বা রফতানি লাইসেন্স ইস্যু করা যাবে না।

এ ছাড়া, এই ধরনের পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসের কমিটিগুলোর কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইউএসসিআইআরএফ হলো একটি স্বাধীন এবং দ্বিপাক্ষিক (বাপার্টিসান) মার্কিন ফেডারেল সংস্থা। এটি ১৯৯৮ সালের ‘আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন’র অধীনে প্রতিষ্ঠিত। এই সংস্থার মূল কাজ হলো বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা বা বিশ্বাসের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা, বিভিন্ন দেশের লঙ্ঘনগুলো পর্যালোচনা করা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কংগ্রেসের কাছে নীতিগত সুপারিশ করা।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর