Wednesday 04 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

বিবি গভর্নরের নিয়োগের আগে ও পরে ‘এস আলম সংশ্লিষ্ট’ কোম্পানির শেয়ার দরে বড় লাফ

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৫ মার্চ ২০২৬ ০০:০৯ | আপডেট: ৫ মার্চ ২০২৬ ০০:১২

কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য ও করপোরেট নথি অনুযায়ী, বাংলাদেশের নবনিযুক্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর মোস্তাকুর রহমান যে ছোট ও লোকসানি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডার এবং যেটি এস. আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত তার নিয়োগের আগে ও পরের কয়েক দিনে সেই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম ব্যাপক হারে বেড়েছে।

বুধবার (৪ মার্চ) নেত্র নিউজের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। সারাবাংলার পাঠকদের জন্য এখানে পুরো প্রতিবেদনের ভাবানুবাদ তুলে ধরা হলো।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি মোস্তাকুর রহমানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগের আগের দিন ইনটেক লিমিটেডের শেয়ারের দাম ১০ শতাংশ বেড়ে ৩৩ টাকা হয়। নিয়োগের পরের দিন এটি সর্বোচ্চ ৩৮ দশমিক ৫ টাকায় পৌঁছালেও বুধবার (৪ মার্চ) নাগাদ তা আবার কমে ৩২ দশমিক ৯ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে, মোস্তাকুর রহমান অন্তত ২০১০ সাল থেকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ইনটেক লিমিটেডের একজন উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডার। তবে কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থা বর্তমানে বেশ নাজুক; সর্বশেষ প্রান্তিকে ১৯ লাখ টাকা আয় করলেও প্রতিষ্ঠানটি ২৫ দশমিক ৬ লাখ টাকা নিট লোকসান গুনেছে।

মোস্তাকুরের নিয়োগকে কেন্দ্র করে শেয়ারের এই ওঠানামায় কেউ অনৈতিক সুবিধা নিয়েছে বলে কোনো প্রমাণ পায়নি নেত্র নিউজ। তা সত্ত্বেও, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম যখন বাজারে ব্যাপকভাবে বাড়ছে, ঠিক তখনই এই মূল্যবৃদ্ধির ঘটনাটি ঘটল।

ইনটেক লিমিটেড বর্তমানে এস. আলম গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সালাম ল্যাবু ও তার সহযোগীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ল্যাবু হলেন এস. আলম গ্রুপের স্বত্বাধিকারী সাইফুল আলম মাসুদের ছোট ভাই।

এস. আলম গ্রুপের একমাত্র তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান এস. আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলসের শেয়ার দরও গত বছরের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ ১৭.৬ টাকায় উঠেছে। বর্তমানে ইনটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন ল্যাবু’র ছেলে আতিকুল আলম চৌধুরী এবং ল্যাবু নিজে এর উপদেষ্টা। এ ছাড়া ইনটেকের বেশ কয়েকজন পরিচালক ল্যাবু যখন আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন, তখন সেখানে ঊর্ধ্বতন পদে কর্মরত ছিলেন।

২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে এস. আলম গ্রুপ আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকসহ বেশ কিছু ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করত। ক্ষমতা পরিবর্তনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনে আল-আরাফাহসহ আটটি ব্যাংকের পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। মোস্তাকুরের আগে দায়িত্ব পালন করা আহসান এইচ মনসুর এই গ্রুপের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছিলেন এবং এর মালিকের বিরুদ্ধে ব্যাংক থেকে কোটি কোটি ডলার পাচারের প্রকাশ্য অভিযোগ আনেন।

এই পুরো ঘটনাটি একজন সক্রিয় ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ফলে সৃষ্ট স্বার্থের সংঘাতকে স্পষ্ট করে তুলেছে। এমন একটি দেশে এটি আরও সংবেদনশীল যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা, সুদের হার নির্ধারণ এবং অর্থপাচার রোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেখানে এস. আলম গ্রুপের মতো অলিগার্কদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালাচ্ছে, সেখানে মোস্তাকুরকে এখন তার নিজের ব্যবসায়িক অংশীদারদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ সংক্রান্ত স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

নেত্র নিউজ থেকে যোগাযোগ করা হলে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান উত্তর দেওয়ার জন্য এক সপ্তাহ সময় চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে তাকে দুই দিন সময় দেওয়া হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

এস. আলম গ্রুপের সঙ্গে ইনটেক লিমিটেডের গভীর সম্পর্ক লক্ষ করা গেছে। ২০২১ সালে গ্রুপটির প্রতিনিধি হিসেবে আল-আরাফাহ ব্যাংকের সাবেক দুই পরিচালক এবং ইনটেকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক বদিউর রহমানের স্ত্রী এই কোম্পানির শেয়ার কেনেন। যদিও সে সময় এস. আলম গ্রুপ এই কোম্পানিতে বিনিয়োগের বিষয়টি অস্বীকার করেছিল।

গভর্নরের স্ত্রী আকতার সানজিদা কাসেম ‘এ. কাসেম অ্যান্ড কোং’-এর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। নেত্র নিউজের প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালে এস. আলম গ্রুপ যখন ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে শুরু করে, তখন তাদের দুটি প্রতিষ্ঠান অডিটের জন্য কাসেমের ফার্মটিকে নিয়োজিত করেছিল। যদিও সানজিদা কাসেমের ব্যক্তিগত কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবে এ বিষয়ে ফার্মটি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

আইএমএফ-এর সাবেক অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমান মনে করেন মোস্তাকুরের উচিত নিজের গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখতে স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে এমন সব কোম্পানি থেকে নিজের শেয়ার সরিয়ে নেওয়া। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের যেকোনো ধরনের সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে।

‘নিষ্ক্রিয় ভূমিকা’

ইনটেকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বর্তমান পরিচালক উবায়দা আসাদী ফোনে জানান, তিনি ব্যক্তিগতভাবে মোস্তাকুরকে চেনেন না। আসাদীর বাবা লিয়াকত আলী চৌধুরী চট্টগ্রামের একটি জাহাজ নির্মাণ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং ল্যাবুর সময়ে তিনি আল-আরাফাহ ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রধান ছিলেন।

ইনটেক লিমিটেডের কোম্পানি সচিব জাইদুল ইসলাম প্রথমে দাবি করেছিলেন, তাদের কোম্পানির উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডার মোস্তাকুর রহমান এবং নবনিযুক্ত গভর্নর একই ব্যক্তি নন। তবে পরে তিনি স্বীকার করেন, তিনি ওই শেয়ারহোল্ডারকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না এবং তার পরিচয় নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না।

ইনটেক লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান পরিচালক এটিএম মাহবুবুল আলম নিশ্চিত করেছেন, ওই উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডারই বর্তমান গভর্নর। তিনি গভর্নরকে তার একজন পারিবারিক বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

মাহবুব নামে পরিচিত আলম স্পষ্ট করেছেন, ইনটেক লিমিটেডে মোস্তাকুরের শেয়ারের পরিমাণ সবসময়ই খুব সামান্য ছিল। নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কোম্পানিটিতে তার মালিকানা মাত্র ০.৫ শতাংশের কিছু বেশি।

মাহবুবের মতে, ২০১০ সালের শুরুর দিকে মোস্তাকুর সক্রিয় থাকলেও কোম্পানির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তার হাতে ছিল না। তবে তিনি মাহবুব ও তার সহযোগীদের পরিচালনা পর্ষদে আসতে সাহায্য করেছিলেন, যার ফলে মাহবুব একসময় চেয়ারম্যান হয়েছিলেন।

মাহবুব আরও জানান, উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডার হিসেবে এবং পরিচিত কিছু লোক শেয়ারহোল্ডার তালিকায় থাকায় মোস্তাকুরকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে একটি ভূমিকা পালন করতে হতো।

মাহবুব আরও জানান, ২০২০ সালে আবদুস সালাম ল্যাবুর পরিবার ও সহযোগীদের কোম্পানিতে যুক্ত করা ছিল তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত। তারা পুঁজিবাজারের প্রভাবশালী ব্যক্তি হওয়ায় এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী উদ্যোক্তাদের ন্যূনতম ৩০ শতাংশ শেয়ার থাকার বাধ্যবাধকতা পূরণ করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

মাহবুবের দাবি অনুযায়ী, ল্যাবু পরিবারের সদস্যদের শেয়ারহোল্ডার হিসেবে যুক্ত করার বিষয়ে মোস্তাকুরের কোনো সায় বা ভূমিকা ছিল না। এদিকে, একটি আইটি প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও কৃষি খাতে বিনিয়োগ করায় ইনটেক লিমিটেড কঠোর নজরদারির মুখে রয়েছে; এ ছাড়া বিভিন্ন অনিয়মের কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এর আগে কোম্পানিটি ও এর পরিচালকদের কয়েক দফা জরিমানাও করেছে।

‘বড় চ্যালেঞ্জ’

পেশায় কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট মোস্তাকুরের একটি মাঝারি মানের সোয়েটার কারখানা রয়েছে। তিনি বিজিএমইএ-এর প্রতিনিধি হিসেবে সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে কাজ করা একটি কমিটিতেও ছিলেন। এ ছাড়া পর্যটন ও আবাসন খাতেও তার বিনিয়োগ রয়েছে। তার এই ব্যবসাগুলোর সাফল্য মূলত বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার ও সুদের হারের ওপর নির্ভর করে—যেগুলো নির্ধারণ করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরই মূল কাজ।

স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার কয়েক মাস আগেই মোস্তাকুরের পোশাক কারখানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৮৯ কোটি টাকার একটি ঋণ বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ অনুমতিতে পুনঃতফসিল করা হয়েছিল। এরপর দায়িত্ব নেওয়ার পর তার অন্যতম প্রধান কাজ ছিল রফতানিমুখী শিল্পগুলোর (মূলত পোশাক খাত) জন্য শ্রমিকদের বেতন দিতে বিশেষ ঋণ সুবিধার ব্যবস্থা করা।

অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমান মনে করেন, যেসব সিদ্ধান্তে গভর্নরের ব্যক্তিগত বা তার ব্যবসায়িক সহযোগীদের স্বার্থ জড়িয়ে আছে, সেগুলো থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখে তিনি বিতর্ক এড়াতে পারেন। তবে মোস্তাকুরের সামনে এর চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রাতিষ্ঠানিক বা কাঠামোগত সমস্যাগুলো মোকাবিলা করা।

জ্যোতি রহমান বলেন, যেকোনো ব্যবসায়ীর মতো মোস্তাকুরও সুদের হার কম রাখার পক্ষে থাকতে পারেন, যা ব্যবসার জন্য সহায়ক হলেও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। একইভাবে, রফতানিকারক হিসেবে তিনি টাকার মান কমিয়ে রাখতে চাইতে পারেন যাতে রফতানি আয় বাড়ে; কিন্তু এতে আমদানির খরচ বেড়ে যাবে, যা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সঙ্গেও মোস্তাকুরের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলটির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তিনি বিএনপির ৪১ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে ছিলেন এবং গত নির্বাচনের প্রচারণার সময় নিয়মিত দলীয় কার্যালয়ে যাতায়াত করতেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতার মতে, মোস্তাকুর বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাকে প্রায়ই নজরুল ইসলাম খান এবং ইসমাইল জবিউল্লাহর সঙ্গে দেখা যেত, যারা বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বরত এবং মন্ত্রী পদমর্যাদা ভোগ করছেন।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর