Saturday 28 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

হঠাৎ বেড়ে গেছে খুন-ধর্ষণ, জনমনে উদ্বেগ

উজ্জল জিসান স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২৩:০২

প্রতীকী ছবি

ঢাকা: রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে হঠাৎ করে হামলা, জবরদখল, চাঁদাবাজি, খুন আর ধর্ষণের মতো ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় জনমনে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অচিরেই এর উত্তরণ চায় সাধারণ মানুষ। আর পুলিশ বলছে, প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হচ্ছে। বেশিরভাগ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নতি করতে কাজ করছে পুলিশ। সম্প্রতি সাধারণ মানুষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

কী ছিল নরসিংদীর ঘটনা

নরসিংদী সদর উপজেলার মাধবদী থানার মহিষাশুড়া ইউনিয়নের একটি এলাকায় ভাড়া বাসায় বাবা, মা ও ভাইয়ের সঙ্গে থাকত ওই কিশোরী। তার বাবা ও ভাই স্থানীয় একটি টেক্সটাইল মিলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। তাদের বাড়ি বরিশালে। মামলার এজাহারের বরাত দিয়ে মাধবদী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কামাল হোসেন জানান, স্থানীয়ভাবে বখাটে হিসেবে পরিচিত নূরা নামের এক তরুণের সঙ্গে কিশোরীর কথাবার্তা ছিল। ১৫ দিন আগে নূরার নেতৃত্বে পাঁচ-ছয়জন তরুণ কিশোরীকে তুলে নেয়। এরপর, তাকে ধর্ষণ করা হয় বলে পরিবারের অভিযোগ। এ ঘটনার বিচারের জন্য কিশোরীর পরিবার মহিষাশুড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহম্মদ আলী দেওয়ানের কাছে যায়। তবে পরিবারটি বিচার পায়নি। সাবেক ইউপি সদস্যের কাছে অভিযোগ করায় নূরাসহ সংশ্লিষ্ট তরুণেরা ক্ষুব্ধ হন। মেয়েটির বাবা থানাতেও আসেননি।

বিজ্ঞাপন

এমন পরিস্থিতিতে গত বুধবার রাতে মেয়েকে খালার বাড়িতে রেখে আসতে যাচ্ছিলেন বাবা। পথে বিলপাড় এলাকায় পৌঁছালে নূরার নেতৃত্বে ছয় তরুণ বাবার কাছ থেকে কিশোরীকে অপহরণ করে নিয়ে যান। রাতভর বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও মেয়েটির সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে ২৬ ফেব্রুয়ারি খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বিলপাড় ও দড়িকান্দী এলাকার মাঝামাঝি একটি শর্ষেখেতে কিশোরীর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। খবর পেয়ে মাধবদী থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে। এ ঘটনায় কিশোরীর মা বাদী হয়ে মাধবদী থানায় একটি ধর্ষণ ও হত্যা মামলা করেন।

কিশোরীর পরিবারের অভিযোগ, ধর্ষণের বিচারের দায়িত্ব নিয়ে আহম্মদ আলী দেওয়ান অপরাধীদের সঙ্গে দফারফা করে মোটা অংকের অর্থ আত্মসাৎ করেন। এর পর কোনো বিচার না করেই ঘটনাটি ধামাচাপা দেন। সেইসঙ্গে কিশোরীর পরিবারকে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে চাপ দেন। বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। এর জেরেই গত বুধবার রাতে বাবার সামনে থেকে কিশোরীকে অপহরণের পর সরিষা খেতে নিয়ে হত্যা করা হয়।

যেভাবে গ্রেফতার ধর্ষক

কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাটি দেশব্যাপী আলোড়ন তুলেছে। শুরু হয়েছে ঘৃণা, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ। ধর্ষকদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আদালতে ফাঁসির দাবি উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সোচ্চার রয়েছে ফেসবুক ব্যবহারকারীরা। এরই মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোকেও ব্যাপকভাবে ধর্ষকদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার হতে দেখা গেছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতেই চারজনকে গ্রেফতার করে নরসিংদী পুলিশ। আর শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনোয়ার পাশার নেতৃত্বে এক অভিযানে গাজীপুর থেকে ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি নুরাকে গ্রেফতার করা হয়। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনোয়ার পাশা সারাবাংলাকে বলেন, ‘ধর্ষণের পর নুরা আত্বগোপনে চলে যায়। পুলিশ ও ডিবির একাধিক টিম মাঠে কাজ শুরু করে। এরপর সবশেষ অবস্থান জানা যায় গাজীপুরে। একইসঙ্গে পুলিশ ও ডিবির বেশ কয়েকটি টিম অভিযান শুরু করে। এক পর্যায়ে নুরাকে ধরতে দুই কিলোমিটার দৌড়াতে হয়। এরপর সে ধরা পড়ে। নুরাসহ এই মামলার নয় আসামির মধ্যে সাত জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’ তিনি জানান, নুরাকে গতকাল রাতেই গ্রেফতার করা না হলে সে ভারতে পালিয়ে যেত।

লোমহর্ষক ঘটনা পাবনার ঈশ্বরদীতেও

শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে পাবনার ঈম্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়া ইউনিয়নের ভবানিপুর উত্তরাপাড়া গ্রামে নিজ বাড়ির উঠান থেকে দাদির রক্তাক্ত ও সরিষা ক্ষেত থেকে নাতনির বিবস্ত্র মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহতরা হলেন, ভবানিপুর উত্তরপাড়া গ্রামের নজিমুদ্দিনের স্ত্রী সুফিয়া খাতুন (৬৫) ও তার নাতনি জামিলা আক্তার (১৫)।

ঈশ্বরদী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মমিনুজ্জামান জানান, কারা, কী কারণে তাদের হত্যা করেছে তা জানা যায়নি। পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য পাবনা জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

আশেপাশের বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, মধ্যরাতে হঠাৎ কান্নাকাটির আওয়াজ শুনে বের হন স্থানীয়রা। পরে কান্নার আওয়াজ থেমে গেলে বাড়িতে চলে যান তারা। সকালে বাড়ির উঠানে সুফিয়া খাতুনের রক্তাক্ত মরদেহ পাওয়া যায়। নাতনি জামিলাকে খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে বাড়ির পাশে সরিষার খেতে বিবস্ত্র অবস্থায় তার মরদেহ পাওয়া যায়।

স্থানীয়রা জানিয়েছে, বাবা-মা না থাকায় কিশোরীটি দাদির কাছে থেকেই বড় হচ্ছিল। কিন্তু হায়েনারা কিশোরীটিকে নিতে এলে ঢাল হয়ে দাঁড়ান দাদি। পথের বাধা দুর করতেই দাদিকে হত্যা করে নাতনিকে নিয়ে যায় হায়েনারা। এরপর কিশোরীকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করে সরিষা ক্ষেতে ফেলে রেখে যায়। এ ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সাধারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্ষক ও হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির দাবি করছে।

আরও কিছু ঘটনা

এর আগে ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর হাতিরঝিল উলন রোডে এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় থানা ঘেরাও করে এলাকাবাসী। পরে এক ধর্ষককে গ্রেফতার করে পুলিশ। অন্যদিকে ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদের পাশ থেকে দু’টি কাটা হাত এবং স্কাউট ভবনের পাশ থেকে একটি ও কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের পাশ থেকে আরেকটি কাটা পা উদ্ধার করেছে পুলিশ। ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে পুলিশ জানতে পেরেছে, ওবায়দুল্লাহ নামে এক ব্যক্তির দেহের অংশ এগুলো।

পল্টন থানার ওসি মোস্তফা কামাল খান জানান, বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ ও উত্তর গেটের মাঝামাঝি এলাকায় রাস্তায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় দু’টি হাত পাওয়া যায়। এছাড়া স্কাউট ভবনের সামনের রাস্তা থেকে উদ্ধার করা হয় একটি বিচ্ছিন্ন পা। খণ্ডিত অপর পা’টি পাওয়া গেছে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে।

তিনি জানান, হাতের ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করে জানা যায়, ওবায়দুল্লাহ নামে এক ব্যক্তির দেহের অংশ এই হাত ও পা। তার বাড়ি নরসিংদীর শিবপুর উপজেলায়। দেহের অংশ বিশেষ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল (ঢামেক) কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। দেহের বাকি অংশ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

যা বলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিশেষজ্ঞরা

নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও উন্নতির দিকে, তাহলে হঠাৎ কেন খুন-ধর্ষণ বেড়ে গেল? এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি মিডিয়া ) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন সারাবাংলাকে বলেন, ‘সম্প্রতি দুটি আলোচিত ঘটনা ঘটেছে, এর একটি নরসিংদীতে, অন্যটি ঈশ্বরদীতে। দু’টি ঘটনার মধ্যে নরসিংদীরটাতে মামলা হয়েছে। এতে মূল আসামিসহ সাত জন গ্রেফতার হয়েছেন। ঘটনা ডিটেক্ট হয়েছে, দ্রুত চার্জশিট দেওয়া হবে। আর ঈশ্বরদীর ঘটনায় এখনো কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। তদন্তে নেমেছে পুলিশ। জেলা ডিবি পুলিশও কাজ করছে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তে।’

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘এ ধরণের ঘটনা আগেও ছিল, এখনো আছে, ভবিষ্যতেও হয়তো থাকবে। তবে নরসিংদীর আর ঈশ্বরদীর ঘটনা একেবারেই বিবেকবর্জিত। এভাবে চলতে থাকলে সমাজটা অন্ধকারে চলে যাবে। সেই জাহেলিয়াতের যুগের মতো মনে হচ্ছে। মানুষ কি কন্যা সন্তান নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকবে, নাকি কন্যা সন্তান নেবে না। কাজেই এটি বন্ধ করতে হবে রাষ্ট্রকেই। এসব বন্ধে সবধরণের উদ্যোগ নিতে হবে।’

সারাবাংলা/ইউজে/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

উজ্জল জিসান - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর