Monday 24 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

নীলফামারীতে পাট চাষে আগ্রহ কমছে কৃষকের

রাশেদুল ইসলাম আপেল
২৪ আগস্ট ২০২৬ ১১:৫৭

নীলফামারী: একসময় নীলফামারীর গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল পাট। ‘সোনালী আঁশ’ হিসেবে পরিচিত এই ফসল ছিল কৃষকের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল। পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, শুকানো ও বাজারজাতকরণকে ঘিরে বর্ষাকালে গ্রামাঞ্চলে তৈরি হতো বাড়তি কর্মচাঞ্চল্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে কৃষকের সেই চেনা হিসাব। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট, জাগ দেওয়ার জন্য উপযুক্ত পানির অভাবসহ বিভিন্ন অনিশ্চয়তার কারণে পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অনেক কৃষক।

অন্যদিকে তুলনামূলক কম সময়ে ঘরে তোলা, পরিচর্যার ঝামেলা কম এবং বাজারে চাহিদা থাকায় কৃষকের কাছে বাড়ছে ভুট্টার আকর্ষণ। ফলে নীলফামারীর বিভিন্ন এলাকায় পাটের জমিতে জায়গা করে নিচ্ছে ভুট্টা। কৃষকের এই ফসল পরিবর্তন শুধু একটি ফসলের জায়গায় আরেকটি ফসলের আবাদ নয়; বরং এটি উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে লাভ-ঝুঁকির নতুন হিসাবেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে এখন আর আগের মতো পাট চাষ দেখা যায়নি। অনেক জমিতে চাষ করা হয়েছিল ভুট্টা। এরপর সেই জমিতে ধান চাষ করা হয়েছে।

কৃষকেরা বলছেন, ফসল নির্বাচন এখন আর শুধু অভ্যাসের ওপর নির্ভর করছে না। উৎপাদন খরচ, সময়, শ্রম, বাজারদর এবং বিক্রির নিশ্চয়তা-সবকিছু হিসাব করেই জমিতে ফসল নির্বাচন করছেন তারা।

এ বিষয়ে কৃষক জলিল মিয়া বলেন, ‘পাট চাষ এখন আর আগের মতো করা হয় না। এর প্রধান কারণ হচ্ছে জাগ দেওয়া। পাট কাটার পর আঁশ পচানোর জন্য দীর্ঘ সময় পানিতে জাগ দিতে হয়। কিন্তু অনেক এলাকায় প্রয়োজনীয় গভীর ও পরিষ্কার পানি পাওয়া যায় না। ফলে পাট চাষিকে কখনো দূরের জলাশয়ে নিয়ে যেতে হয়, আবার কখনো কৃত্রিমভাবে জাগ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়।’

আরেক কৃষক অরবিন্দু রায় বলেন, ‘পাট চাষ করলে এখন ক্ষতির দিকে যেতে হচ্ছে। কারণ, পাট চাষের পর হঠাৎ বৃষ্টি হয়ে যদি জমিতে পানি জমে যায়, এ ক্ষেত্রে জমির পাট যতটুকু হয়, ওইটুকুই থেকে যায়। বড় হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। এক কথায় বলা চলে, এটি বৈরী আবহাওয়া।’

তিনি আরও বলেন,‘পাট চাষে খরচ অনেক, শ্রমিকের বাড়তি খরচ। পাট কাটা, আঁটি বাঁধা, বহন, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া ও শুকানোর প্রতিটি ধাপেই শ্রমের প্রয়োজন হয়। শ্রমিকের মজুরি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব কাজের ব্যয়ও বেড়েছে।’

কৃষকদের দাবি, পাটের দাম ভালো থাকলেও অতিরিক্ত শ্রমিকের খরচ, বৈরী আবহাওয়া, ফলন কমসহ প্রত্যাশিত দাম না পেলে লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়। এ কারণে অনেক কৃষক তুলনামূলক কম ঝুঁকির ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।

কৃষকদের মতে, ভুট্টার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তুলনামূলক স্বল্প সময়ে ফসল ঘরে তোলা যায়। পাটের মতো জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো কিংবা দীর্ঘ প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রয়োজন হয় না। ভুট্টা শুকিয়ে সংরক্ষণ ও পরিবহণও তুলনামূলক সহজ। পাশাপাশি পশুখাদ্য ও পোলট্রি ফিড তৈরিতে ভুট্টার ব্যাপক চাহিদা থাকায় স্থানীয় বাজারেও এর ক্রেতা পাওয়া যায়।

কৃষকরা জানান, ভালো ফলন ও বাজারদর থাকলে ভুট্টা থেকে দ্রুত অর্থ ফেরত পাওয়া যায়। ফলে একই জমিতে পরবর্তী ফসল আবাদ করার সুযোগও তৈরি হয়। এই বিষয়টিও কৃষকের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

নীলফামারীর ডোমার উপজেলার কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা আগে নিয়মিত পাট চাষ করলেও এখন জমির একটি বড় অংশে ভুট্টা আবাদ করছেন।

এ বিষয়ে কৃষক জামিয়ার রহমান বলেন, ‘পাট চাষ করলে সব সময় আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। প্রথমত নিড়ানি ব্যয়, সার, এরপর আসে সবচেয়ে বড় যুদ্ধ-কাটা এবং জাগ দেওয়া নিয়ে যত সমস্যা। আর ভুট্টা লাগানোর পর নিড়ানি, সার-সবকিছু নিজেই করা যায়। এরপর তুলে আনার পর ভাঙার জন্য এখন মেশিন পাওয়া যায়। তাই পাটের মতো বিভিন্ন চিন্তায় থাকতে হয় না ভুট্টা নিয়ে।’

আরেক কৃষক লোকমান হোসেন বলেন, ‘কৃষক এখন লাভের হিসাব করে চাষ করেন। যে ফসলে সময় কম লাগে, খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং বিক্রি করে দ্রুত টাকা পাওয়া যায়, স্বাভাবিকভাবেই সেদিকেই কৃষকের আগ্রহ বেশি।’

তবে পাট চাষে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকা কৃষকদের কেউ কেউ বলছেন, পাটের বাজারদর এবং আবহাওয়া ভালো থাকলে এখনো এটি লাভজনক ফসল হতে পারে। কিন্তু ন্যায্যমূল্য ও বাজার ব্যবস্থাপনায় অনিশ্চয়তা থাকায় অনেকেই ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।

এ বিষয়ে ডোমার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ডোমার উপজেলায় পাট চাষ হয়েছে ৯৫০ হেক্টর জমিতে। তবে এ বছর পাটের দাম মোটামুটি ভালোই আছে। তবে বিগত ২-৩ বছর ধরে প্রায় সারা দেশে একটি সমস্যা দেখা দিচ্ছে, সেটি হচ্ছে পাট জাগ দেওয়া নিয়ে। আর আগ্রহ কমার কারণ হতে পারে বর্তমান আবহাওয়া-হঠাৎ বৃষ্টি হয় বা এ ধরনের বিষয়। যেমন, আপনি পাটের বীজ ফেললেন, এর পর হঠাৎ বৃষ্টি চলে এলো, তখন আপনার বীজগুলো নষ্ট হয়ে যাবে। এরকম কিছু কারণ, জাগ দেওয়া নিয়ে সমস্যা, শ্রমিক সংকট-বিভিন্ন সমস্যার কারণে কৃষকদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।’

একসময় যে পাট ছিল নীলফামারীর কৃষকের অর্থনৈতিক স্বপ্নের অংশ, সেই জমিতেই এখন সারি সারি ভুট্টা। মাঠের এই পরিবর্তন তাই শুধু কৃষিপণ্যের পরিবর্তন নয়-এটি কৃষকের বদলে যাওয়া অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। কৃষক এখন আবেগ নয়, হিসাবের ভিত্তিতে ফসল বেছে নিচ্ছেন। সেই হিসাব পাটের পক্ষে ফেরাতে হলে উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কৃষকের ঝুঁকি কমানোই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সারাবাংলা/এএ
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর