সিলেট: চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে সিলেটের রাজপথে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় গুলিতে প্রাণ হারান দৈনিক নয়া দিগন্ত ও জালালাবাদ পত্রিকার রিপোর্টার এটিএম তুরাব। তিনি সিলেটের ইতিহাসে প্রথম পুলিশের গুলিতে নিহত শহীদ সাংবাদিক এবং সিলেটের যেকোনো আন্দোলন-সংগ্রামের মাঠে কোনো সাংবাদিকের নিহত হওয়া ঘটনাও এটি প্রথম।
এটিএম তুরাবের স্মৃতি রক্ষার্থে সিলেট প্রেসক্লাব প্রবর্তিত সাংবাদিক ‘এটিএম তুরাব স্মৃতি পদকে’ এ বছর ভূষিত হয়েছেন সিলেটের সিনিয়র সাংবাদিক ও দৈনিক নয়া দিগন্তের সিলেট ব্যুরোচিফ আবদুল কাদের তাপাদার।
শনিবার (১৮ জুলাই) বিকেলে সিলেট প্রেসক্লাবে আয়োজিত আলোচনা সভা ও পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে পদক ও সম্মাণনার অর্থ পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিকের হাতে তিনি তুলে দেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, জুলাই আন্দোলনে দেড় হাজার মানুষের রক্তের বিনিময়ে আমরা এ জায়গায় এসেছি। শহিদ তুরাবের রক্ত সিলেটের মাটিতে ঝরেছে। তুরাব হত্যার বিচার বিলম্বিত হবার বিষয়ে আলোকপাত করে তিনি বলেন, এ নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে তিনি আগামী ২/৩ দিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন। যাতে তুরাবসহ এ ধরনের জঘন্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতরা দ্রুত গ্রেফতার হয় এবং তাদের উপযুক্ত শাস্তি হয়।
সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিমালার বিষয়ে আলোকপাত করে তিনি বলেন, সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে তুরাব শহিদ হয়েছেন। গত ১৫ বছর অপতথ্যের মাধ্যমে দেশকে তথ্য সন্ত্রাসে পরিণত করা হয়েছিল। বর্তমানে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দাফন হয়ে গেছে। বিগত নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে মিডিয়া স্বাধীনভাবে তার কার্যক্রম চালাচ্ছে।
অপরাধীদের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের কলম ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভেদাভেদ থাকতে পারে। কিন্তু দেশের ব্যাপারে আমাদের সকলকে এক থাকতে হবে। দেশপ্রেমের চেতনা নিয়ে দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানান তিনি।
‘এটিএম তুরাব স্মৃতি পদকে ভূষিত হয়ে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করেন পদকপ্রাপ্ত সিনিয়র সাংবাদিক আবদুল কাদের তাপাদার। তিনি বলেন, সিলেটের সাংবাদিকতার ইতিহাসে তুরাব হত্যার ঘটনা একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনা। যুদ্ধের ময়দানেও প্রেস জ্যাকেট এপ্রোন ব্যবহার সাংবাদিকদের হত্যা করা হয় না। অথচ সেদিন প্রেস জ্যাকেট গায়ে থাকা অবস্থায়ও তাঁকে টার্গেট কিলিং করা হয়।
সাংবাদিক কাদের তাপাদার বলেন, আমাদের সহকর্মী এটিএম তুরাবের রক্তদান বৃথা যায়নি। তার মৃত্যু চলমান ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়, হয়ে ওঠে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক। শহীদ সাংবাদিক এটিএম তুরাব’রা নিজেদের জীবন দিয়ে সেই নতুন সকালের পথ তৈরি করে দিয়ে গেছেন।
সিলেট প্রেসক্লাব সভাপতি মুকতাবিস উন নূরের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সিলেট -৬ আসনের সংসদ সদস্য আ্যডভোকেট এমরান আহমেদ চৌধুরী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট মহানগর জামায়াতের আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, সিলেটও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসাইন চৌধুরী ও সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাঈদা পারভীন, প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ইকবাল সিদ্দিকী ও ইকরামুল কবির, সিনিয়র সহ-সভাপতি এম এ হান্নান, সিলেট মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা বদর, সাবেক কোষাধ্যক্ষ কবীর আহমদ সোহেল, ক্লাবের সহ-সাধারণ সম্পাদক খালেদ আহমদ, ফটো জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হুমায়ুন কবির লিটন।
বক্তারা ১৮ জুলাইকে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এবং গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে উল্লেখ করেন এবং একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনে নিহত আরও পাঁচ সাংবাদিককে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করেন।
আলোচনা শেষ পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক আবদুল কাদের তাপাদারের হাতে ক্রেস্ট ও সম্মাননা তুলে দেন প্রধান অতিথিসহ অন্য অতিথিরা।
পদকপ্রাপ্ত সিনিয়র সাংবাদিক আবদুল কাদের তাপাদার সিলেটে সাড়ে ৩ দশক ধরে বিভিন্ন সাড়া জাগানো রিপোর্টের কারণে আলোচিত। অনুসন্ধানী রিপোর্টের কারণে তিনি বহু বার মামলার আসামি হয়েছেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সিলেট নগরীর কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন দৈনিক নয়া দিগন্তের তৎকালীন সিলেট ব্যুরো প্রধান আবু তাহের মো. তুরাব (এটিএম তুরাব)। তার স্মৃতি রক্ষার্থে সিলেট প্রেসক্লাব সাংবাদিক ‘এটিএম তুরাব স্মৃতি পদক’ প্রবর্তন করেছে।