পাবনা: জেলার ঈশ্বরদীর বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান ‘পাবনা চিনিকল’-এ দীর্ঘ ছয় বছর যাবত উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। বন্ধ থাকা এ চিনিকলে কর্মচারী ও শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১২ লাখ টাকা এবং বছরে ব্যয় হচ্ছে প্রায় দেড় কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চিনিকলটিতে উৎপাদন বন্ধ থাকার পরও বর্তমানে এখানে কর্মরত ২৭ জন স্থায়ী এবং ৩০ জন অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতনের জন্য মাসে প্রায় ১২ লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়। মিলের যন্ত্রপাতি পাহারা দেওয়ার কাজে নিয়োজিত ৩০ জন নিরাপত্তা কর্মীর মাসিক বেতন বাবদ খরচ হয় প্রায় ৫ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। ২০২০ সালে মিলটি বন্ধ হওয়ার পর থেকে গত ছয় বছরে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন বাবদ সরকারের মোট ৮ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে।
এ সূত্রে আরও জানা যায়, সাধারণ সময়ে এখানে প্রায় ১ হাজার ২০০ শ্রমিক কাজ করলেও বর্তমানে শুধু প্রশাসন, কারখানা এবং নিরাপত্তা বিভাগসহ হাতেগোনা কয়েকজন নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে, মিলের এই বিপুল অংকের ব্যয় অব্যাহত থাকলেও দীর্ঘ সময় চিনিকল বন্ধ থাকায় অবহেলায়-অযত্নে প্রায় ৮০ কোটি টাকা মূল্যমানের যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয় আখ চাষিরা। ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়ায় ৬০ একর জমির ওপর অবস্থিত পাবনা চিনিকলটি এক সময় শ্রমিক-কর্মচারী ও চাষিদের কোলাহলে মুখর থাকত। কিন্তু এখন সেখানে শুনশান নীরবতা, তৈরি হয়েছে এক ভুতূড়ে পরিবেশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন পাবনা চিনিকলটি ১৯৯৬-৯৭ মাড়াই মৌসুমে পরীক্ষামূলকভাবে চিনি উৎপাদন শুরু করে। পরের বছর ১৯৯৭-৯৮ মৌসুম থেকে বাণিজ্যিকভাবে এর কার্যক্রম চালু হয়। তবে উৎপাদন শুরুর পর থেকেই ক্রমাগত লোকসান গুনতে থাকে মিলটি। পরে ২০২০ সালে শিল্প মন্ত্রণালয় দেশের আরও কয়েকটি চিনিকলের সঙ্গে পাবনা চিনিকলের আখ মাড়াই বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকেই মূলত এই অঞ্চলে আখ চাষ বন্ধ হয়ে যায়।
তবে মিলের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেছেন, দেশজুড়ে বন্ধ হওয়া মিলগুলো শীঘ্রই চালুর বিষয়ে তারা আশাবাদী।
চিনিকলের একাধিক শ্রমিক নেতা ও এলাকার আখ চাষিরা জানান, পাবনা চিনিকলটি সারাদেশের মধ্যে অন্যতম বড় একটি চিনিকল। এ চিনিকলটির ধারণক্ষমতা অন্যান্য মিলের চেয়ে অনেক বেশি। চিনির গুণগত মানও ভালো ছিল। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে চিনিকলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এই এলাকায় আর আখ চাষ হয় না। অন্যান্য ফসলের চেয়ে আখ চাষে ভালো লাভবান হওয়া সম্ভব ছিল। তাই দ্রুত এই মিলটি চালু করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
মিল এলাকার বাসিন্দা সবুজ মোল্লা বলেন, ‘চিনিকলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার কোটি টাকার মেশিনপত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অন্তবর্তীকালীন সরকারের চিনিকলটি দ্বিতীয় ধাপে চালু করার কথা ছিল। বর্তমান সরকারের কাছে বিশেষ অনুরোধ, চিনিকলটি যেন দ্রুত চালু করা হয়।’
এ বিষয়ে পাবনা চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আখতারুজ্জামান বলেন, ‘চিনিকলটি চালু করে চিনির পাশাপাশি অন্যান্য ব্যবসায়িক পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব। তাহলে চিনিকল থেকে লাভ আসবে। বর্তমানে মেশিনপত্র ও চিনিকল দেখাশোনা করার জন্য দিনে ও রাতে তিন শিফটে ১০ জন করে মোট ৩০ জন পাহারাদার রয়েছে। মালামাল চুরি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
তিনি আরও জানান, পাবনা চিনিকল যেহেতু বন্ধ রয়েছে, তাই কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মিলের কিছু যন্ত্রাংশ কয়েকটি সচল মিলে পাঠানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া চিনিকলটির ভিত্তিপ্রস্থ স্থাপন করেন।