রংপুর: ‘মিল বন্ধ হওয়ায় ছেলেমেয়ের লেখাপড়া করানো মুশকিল হয়ে গেছে… এক লাখ টাকা আয় হতো আখ বেচে, এখন ধান বেচে আর কয় টাকা! এত কিছু হয়েছে কুশারের (আখের) জন্য। এলাকার রাস্তাঘাট, ব্যাবসা সব বন্ধ। কর্ম হারিয়ে অনেক মানুষ বেকার।’
জীবনের দু-তৃতীয়াংশ চিনিকলে সময় ব্যয় করে শেষপ্রান্তে এসে এভাবেই সারাবাংলার প্রতিবেদককে বলছিলেন রংপুরের বদরগঞ্জের কিশামত গোপালপুর গ্রামের এক সময় আখচাষি আবুল ওয়াহাব মিয়া। তার কণ্ঠে শুধুই কান্না। ছয় বছর আগে শ্যামপুর চিনিকল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে তার জীবনটা যেন শুকিয়ে গেছে। তার মতো হাজারো আখচাষি, শ্রমিক আর স্থানীয় ব্যবসায়ীর হৃদয় আজও শোকাহত ও রক্তাক্ত।
২০২০ সালের মার্চ থেকে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে রংপুরের শ্যামপুর চিনিকল, অথচ এই মিলের শেয়ারের দাম সম্প্রতি লাফিয়ে বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ! পুরোপুরি বন্ধ থাকা শ্যামপুর চিনিকল এখন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ৩৯তম সর্বোচ্চ মূল্যের শেয়ার। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এটা গুজব আর ম্যানিপুলেটরদের খেলা। কিন্তু যারা এই মিলের সঙ্গে জড়িত, তাদের জীবনের স্বপ্নগুলো আজও ধুলোয় মিশে আছে। মিল চালুর আশায় টাস্কফোর্স গঠিত হয়েছিল, সুপারিশও হয়েছিল—কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তিতে বরাদ্দ না পাওয়ায় সবকিছু থেমে গেছে।

বন্ধ থাকা যন্ত্রপাতি।
স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা
শ্যামপুর চিনিকল কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মিলটি একসময় রংপুর অঞ্চলের একমাত্র ভারী শিল্প ছিল। প্রতি বছর গড়ে ৮০,০০০ টন চিনি উৎপাদন হতো। এর জন্য ৪০,০০০ থেকে ৪২,০০০ একর জমিতে আখ চাষ হতো, প্রায় ৪০,০০০ কৃষক সরাসরি জড়িত ছিলেন। মিল কর্তৃপক্ষ আখ ক্রয় ও প্রণোদনায় খরচ করতেন ৯০০ কোটি টাকা। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় আরও ৩৫ কোটি টাকা স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রবাহিত হতো। মিল চালু থাকাকালীন এলাকায় ব্যাবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, সেবামূলক কাজ ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল।
কিন্তু ২০২০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি শেষবারের মতো ৪৪,৫২৭ টন চিনি উৎপাদনের পর লোকসানের অজুহাতে মিল বন্ধ হয়ে যায়। সেই থেকে আজও চালু হয়নি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট লোকসান ২৫ কোটি, সঞ্চিত লোকসান ৬৬৬ কোটি টাকা। বন্ধের সময় ৭০০ কর্মী ছিলেন, এখন মাত্র ৬৪ জন। মিলের ভেতরে শতাধিক ট্রাক্টর-যন্ত্রপাতি আগাছার জঙ্গলে ডুবে নষ্ট হচ্ছে।
অনুসন্ধান বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত টাস্কফোর্স শ্যামপুর ও দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ মিল দুটি ২০২৭-২৮ মৌসুম থেকে চালুর সুপারিশ করে। ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শ্যামপুরের জন্য ৫১ কোটি ৭০ লাখ টাকা চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় আপত্তি জানিয়ে বলেছে—বিএসএফআইসি লোকসানি প্রতিষ্ঠান, আগে বিপুল ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। ফলে বরাদ্দ আটকে গেছে।

কারখানা বন্ধ থাকায় চারপাশ সুনসান নিরব।
এবিষয়ে জানতে টাস্কফোর্সের সদস্য মোশাহিদা সুলতানা বলেন, ‘চিনিকল লাভজনক করতে তিন মৌসুম লাগে। অন্তর্বর্তী সরকার দেরি করে দুটি মৌসুম নষ্ট করেছে।’
স্থানীয় কৃষক হরকান্ত বর্মণ, মজিবর রহমান, তরিকুল ইসলাম চৌধুরীসহ অনেকেই বলেন, আখ চাষ ছেড়ে ধান-আলু চাষ করে লাভ কম, সচ্ছলতা হারিয়ে যাচ্ছে।
শ্যামপুর রেলস্টেশন বাজারের আখচাষিরা বলেন, আগে এখানে ছয় হাজার একরে আখ চাষ হতো, এখন মাত্র ৬০০ একরে নেমেছে। মিল চালুর খবর শুনে আবার আখ লাগিয়েছিলেন, কিন্তু আশা আবার ভেঙে গেছে।
সম্প্রতি শ্যামপুর চিনিকল সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ১১১ দশমিক ৪৫ একর জমি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত এই কারখানার চারপাশে এখন সুনসান নীরবতা। মিলের ভেতরেও আগাছার স্তূপ। নষ্ট হচ্ছে অত্যাধুনিক সব যন্ত্রপাতি।
চিনিকলের সহকারী ব্যবস্থাপক (ভাণ্ডার) দেবাশিষ সিংহ রায় জানান, কার্যক্রম চালু থাকাকালীন এই চিনিকলে সর্বশেষ ৪৯৩ জন স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিলেন। এটি বন্ধের পর অনেকে অবসরে গেছেন। কিছু জনবল অন্যান্য চিনিকলে বদলি করা হয়েছে। বর্তমানে শ্যামপুর চিনিকলে ৬৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন।
মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘শ্যামপুর চিনিকল এ অঞ্চলের অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। স্থানীয়রা দীর্ঘদিন ধরে চালুর দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে সরকার এখনও সিদ্ধান্ত নেয়নি। দেশের অধিকাংশ চিনিকল লোকসানে চলছে।’

ব্যবহার না থাকায় মরিটা পড়ে নষ্ট হচ্ছে সব যন্ত্রপাতি।
এদিকে শেয়ারের অস্বাভাবিক উত্থান নিয়ে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিতে পড়ছেন। কম সংখ্যক শেয়ার থাকায় ম্যানিপুলেটররা সহজেই দাম বাড়িয়ে লাভ তুলে নিচ্ছেন। কিন্তু যাদের জীবন-জীবিকা এই মিলের সঙ্গে জড়িত, তাদের হৃদয়ে এখন শুধুই বেদনা।
টাস্কফোর্সের আরেক সদস্য ও রংপুর জেলা কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলতাফ হোসেন বলেন, চিনিকল হলো একটা কৃষিভিত্তিক শিল্প। যার সঙ্গে চাষি, কৃষিশ্রমিক, কারখানার শ্রমিক জড়িত। তাই চিনিকল চালু থাকলে দেশের বেকার সমস্যার কিছুটা হলেও সমাধান হয়। দেশের চিনির ঘাটতি পূরণ ও স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা থাকে। এসব বিষয় চিন্তা করে শ্যামপুর চিনিকল চালু করতে সরকারের দ্রুত বিনিয়োগ করা উচিত।
এই চিনিকলের সাবেক শ্রমিক নেতা আকতারুল বাদশাসহ স্থানীয়রা বলছেন, ‘মিল চালু হলে হাজারো পরিবারের মুখে আবার হাসি ফুটবে—এই আশায় আজও অপেক্ষায় আছেন শ্যামপুরের মানুষজন।’
মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘লাভজনক করতে চিনির পাশাপাশি জৈব সার ও কোল্ড স্টোরেজ চালু করা দরকার।’