রংপুর: বিভাগীয় নগরী রংপুরে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অপচেষ্টা রোধে জেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়েছে। তেলের পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও বিক্রি না করা এবং বিক্রয় যন্ত্র বন্ধ রাখার অভিযোগে চারটি ফিলিং স্টেশনকে মোট ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
শনিবার (৭ মার্চ) বিকেলে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কারিমুল মওলার নেতৃত্বে নগরীর প্রায় ১০টি ফিলিং স্টেশনে এই অভিযান পরিচালিত হয়।
অভিযানে দেখা যায়, কয়েকটি স্টেশনে যথেষ্ট তেল মজুদ থাকলেও বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। কোথাও আবার পাম্পের যন্ত্র বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এসব অনিয়মের দায়ে চার প্রতিষ্ঠানকে সতর্কতামূলক জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে তেলের মজুদ, সরবরাহ পরিস্থিতি ও বিক্রয় কার্যক্রম পরিদর্শন করা হয় এবং গ্রাহকদের সচেতন করা হয়।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কারিমুল মওলা বলেন, ‘সরকার জ্বালানি তেল বিক্রির বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ ও মজুদ থাকা সত্ত্বেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী গুজব ছড়িয়ে তেল বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। এমন অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান চলমান থাকবে।’
তিনি জনসাধারণকে গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন, ‘দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত মজুদ ও সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।’ এসব অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
এদিকে বিভাগীয় নগরী রংপুরে শুক্রবার (৬ মার্চ) সকাল থেকে অর্ধশতাধিক পেট্রোল পাম্পে অকটেনের সরবরাহ একেবারে শূন্য হয়ে পড়েছে। পেট্রোল থাকলেও প্রতি গ্রাহককে সর্বোচ্চ ২০০ টাকার বেশি বিক্রি করা হচ্ছে না। ফলে মোটরসাইকেল ও গাড়িচালকরা খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন, সৃষ্টি হয়েছে চরম আতঙ্ক।
শুক্রবার সকাল থেকে শনিবার বিকেল পর্যন্ত রংপুরের বিভিন্ন পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, শাপলা চত্বরের বৃহৎ ‘শাপলা’ পাম্পসহ আজিজ পেট্রোল পাম্প, সালেক পেট্রোল পাম্প এবং আরও অনেক স্থানে অকটেন নেই বলে নোটিশ টানানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকেই অকটেন শেষ। পেট্রোলের সামান্য মজুত দিয়ে শুক্র-শনিবার চাহিদা মেটানো অসম্ভব বলে পাম্প মালিকরা প্রতি গ্রাহককে ২০০ টাকার সীমা বেঁধে দিয়েছেন।
শাপলা পাম্পের কর্মচারী জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘দুই দিন সরকারি ছুটি, রোববারের আগে ডিপো থেকে তেল আসবে না। তাই এই নিয়ম।’
গ্রাহকদের অভিযোগ, ‘২০০ টাকার পেট্রোলে দুই দিনও মোটরসাইকেল চলবে না।’ মুন্সিপাড়ার সালাম ও সিও বাজারের নজরুল ইসলাম জানান, ১২টি পাম্প ঘুরেও অকটেন পাননি। ইরান যুদ্ধের দোহাই দিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত।
এদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) শুক্রবার সন্ধ্যায় জরুরি নির্দেশনা জারি করে ফিলিং স্টেশনগুলোতে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে। এতে বলা হয়েছে, মোটরসাইকেল সর্বোচ্চ ২ লিটার পেট্রোল/অকটেন (প্রতি ট্রিপ/দৈনিক), প্রাইভেট কার সর্বোচ্চ ১০ লিটার, জিপ/এসইউভি/মাইক্রোবাস ২০-২৫ লিটার, পিকআপ/লোকাল বাস ৭০-৮০ লিটার ডিজেল, দূরপাল্লার বাস/ট্রাক/কাভার্ডভ্যান/কনটেইনার ২০০-২২০ লিটার ডিজেল। তেল কেনার সময় অবশ্যই রশিদ নিতে হবে এবং বরাদ্দের বেশি দেওয়া যাবে না।
নগরীর সালেক পাম্পের ম্যানেজার দুলু রহমান বলেন, ‘ইরান যুদ্ধের খবরে গ্রাহকরা হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন। চাহিদার তুলনায় কম মজুত থাকায় রেশনিং করতে হচ্ছে। তবে জ্বালানি তেলে কোনো সংকট হবে না।’
প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে খুচরা ব্যবসায়ীরা বড় ড্রাম নিয়ে পাম্পে ভিড় করছেন। শ্যামপুরের আব্দুল মতিন জানান, গ্রামে পেট্রোল এখন ২০০-২৫০ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে। পাম্পগুলো না বিক্রি করলে সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়বেন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় দেশজুড়ে প্যানিক বায়িং শুরু হয়েছে। ঢাকা, সাভার, রাজশাহী, সিলেট, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জেলায়ও পাম্পে ভিড় ও রেশনিং দেখা যাচ্ছে। তবে বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান স্পষ্ট জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে—যা ডিজেল ১৪ দিন, অকটেন ২৮ দিন ও পেট্রোল ১৫ দিন চলবে। মঙ্গলবার পর্যন্ত ৭টি জাহাজের আমদানির এলসি সম্পন্ন হয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জ্বালানি সংকটের কোনো শঙ্কা নেই, দাম বাড়ানোর চেষ্টা করবে না সরকার।