Friday 27 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

উপকূলে ফিরছে জলদস্যুতা
জীবিকার উৎস সাগরই এখন ‘মৃত্যুফাঁদ’

ইমরান হোসাইন, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:০৮

গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার ট্রলার। ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজার: বিকেলের শেষ আলো নিয়ে তখনো সমুদ্রের ঢেউ পড়ছে উপকূলে। ট্রলারের ডেকে বসে জাল গোটাচ্ছিলেন শাহাদাত হোছাইন খোকন (৩৫)। হঠাৎ দ্রুতগামী একটি বোট এসে পাশে ভেড়ে। কোনো কথাবার্তা নয়; চিৎকার, গালাগাল, তারপর গুলির শব্দ। সহকর্মীরা ছুটে এসে দেখেন খোকন ডেকে পড়ে আছেন, শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। তড়িঘড়ি করে অন্য একটি ট্রলারে তুলে তীরে ফেরার চেষ্টা। কিন্তু না, শেষ রক্ষাও হলো না। জীবিকার জন্য যে সমুদ্রকে করে নিয়েছিলেন আপন, সেই সমুদ্রের কোলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন খোকন।

বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে বঙ্গোপসাগরের কুতুবদিয়া উপকূলে জলদস্যুদের গুলিতে নিহত হন খোকন। তিনি কুতুবদিয়া উপজেলার উত্তর ধুরুং ইউনিয়নের মনসুর আলী হাজীর পাড়া এলাকার বাসিন্দা। তার পরিবারে রয়েছে স্ত্রী ও দুই সন্তান। স্বজনদের আহাজারিতে ওইদিন রাতেই উত্তর ধুরুং গ্রাম স্তব্ধ হয়ে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

গভীর সাগরে অতর্কিত হামলা

উত্তর ধুরুং আকরবলী ঘাটের জসিম উদ্দিনের মালিকানাধীন ফিশিং বোট ‘এফবি আজুফা আকতার মানু’ তিন দিন আগে ১৯ মাঝিমাল্লা নিয়ে সমুদ্রে যায়। ২৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় পাশের একটি ট্রলার থেকে মালিককে জানানো হয়, বোটে ডাকাতি হয়েছে। একজন জেলে গুলিবিদ্ধ। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ৮/১০ জনের সশস্ত্র একটি দল দ্রুতগতির বোটে এসে ট্রলারে উঠে পড়ে। মাছ ও জাল লুটের সময় বাধা দিলে গুলি ছোড়ে তারা।

কুতুবদিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ওমর ফারুক বলেন, ‘বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) মরদেহ কুতুবদিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনা হয়। পরে, ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে।’

কুতুবদিয়া উপজেলা মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘গত এক মাসে ডাকাতির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। জেলেরা সমুদ্রে যেতে ভয় পাচ্ছেন। নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডকে জানিয়েও স্থায়ী সমাধান মিলছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘অন্তত ২০-২৫টি ট্রলার সাম্প্রতিক লুটের শিকার হয়েছে। যার বেশিরভাগেরই আনুষ্ঠানিক অভিযোগে আসেনি।’

বাঁশখালী, কুতুবদিয়া উপকূলেও তাণ্ডব

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপকূল থেকে প্রায় ২ নটিক্যাল মাইল দূরে ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে নোঙর করা একটি জাহাজে ১২ জনের সশস্ত্র দল উঠে পড়ে। প্রহরী টর্চলাইট ফেলতেই তারা হামলা চালায়। চাপাতি, রামদা, ছুরি হাতে কেবিনে কেবিনে তাণ্ডব চালিয়ে প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে লুটপাট করে।

জাহাজ কোম্পানির কর্মকর্তা নাছির উদ্দিন বলেন, ‘ক্রুদের মারধর করে আলাদা কেবিনে আটকে রাখা হয়। নগদ দেড় লাখ টাকা, ১০টি মোবাইল ফোন, কম্পাস, ছয় সেট ব্যাটারি, ৫০০ লিটার জ্বালানি, তিনটি গ্যাস সিলিন্ডার ও দুটি ওয়াকিটকি নিয়ে যায়। এতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ টাকা।’

তিনি আরও বলেন, ‘৯৯৯ এ ফোন করার পর বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয় ও জব্দ তালিকা তৈরি করে। তবে থানায় জিডি করতে গিয়ে দেখা দেয় জট। ২৩ ফেব্রুয়ারি অনলাইনে জিডি করা হলেও এখনো তা পেন্ডিং।’

কুপিয়ে আহত করা হয় কুতুবদিয়ার আরও ৫ জেলেকে

৫ জানুয়ারি দিবাগত রাতে ‘জাহাজের হারি’ পয়েন্টে বড়ঘোপ এলাকার একটি ট্রলারে ৯-১০ জনের সশস্ত্র দল হামলা চালায়। এতে পাঁচ জেলে আহত হন। গুরুতর আহত নুরুল হুদাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠাতে হয়। ট্রলার মালিক সেলিম উদ্দিন বলেন, ‘মাছ, জাল, জ্বালানি সব লুট করা হয়েছে। এতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় চার লাখ টাকা।’

বদলেছে কৌশল, টার্গেট গভীর সাগরে

ভুক্তভোগী জেলে শাহ আলম বলেন, ‘জলদস্যুতার ধরণ এখন আরও সংঘবদ্ধ ও কৌশলগত। আগে উপকূলঘেঁষা বিচ্ছিন্ন হামলা হলেও এখন গভীর সমুদ্রে পরিকল্পিত আক্রমণ হচ্ছে। হামলাকারীরা জিপিএস ব্যবহার করে ট্রলার শনাক্ত করে, টহলের ফাঁক বুঝে আক্রমণ চালায়। অনেক সময় মাছ ও জ্বালানি ছাড়াও জিপিএস, মোবাইল, ওয়াকিটকি নিয়ে যায়। যাতে জেলেরা দ্রুত সাহায্য চাইতে না পারে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এক কোস্টগার্ড কর্মকর্তা বলেন, ‘চক্রগুলো সমুদ্রপথ, কোস্টগার্ড-নৌবাহিনীর টহলের সময়সূচি ও জেলেদের রুট সম্পর্কে জানে। ফলে, তাদের দমন কঠিন হয়ে পড়ছে।’

অভিযান ও পাল্টা অভিযান

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি মহেশখালী উপকূলে ‘জাহাঙ্গীর বাহিনী’র প্রধান জাহাঙ্গীরসহ (২৮) নয় জলদস্যুকে আটক করে কোস্ট গার্ড। জব্দ করা হয় তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র, চার রাউন্ড কার্তুজ ও ছয়টি দেশীয় অস্ত্র। উদ্ধার করা হয় ডাকাতির কবলে পড়া ট্রলার ও চার জেলেকেও। এর আগে ৯ জানুয়ারি কলাতলী সমুদ্র এলাকায় অভিযানে ১৯ জন জলদস্যু আটক হয়। জলদস্যুরা পালটা গুলি চালায়। এতে জলদস্যু মো. আনিসের মৃত্যু হয়। উদ্ধার করা হয় বিপুল অস্ত্রশস্ত্র।

কোস্ট গার্ড পূর্ব জোনের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে ৯৯টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১৩৯টি দেশীয় অস্ত্র ও ৪ হাজার ৩১০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। আটক হয়েছে ১১০ জন সন্ত্রাসী ও জলদস্যু।

মাদক ও পাচারের রুট হিসেবে সাগর

কক্সবাজার–টেকনাফ উপকূল দীর্ঘদিন ধরে মাদক পাচারের ঝুঁকিপূর্ণ রুট। গত একবছরে কোস্ট গার্ড পূর্ব জোন উদ্ধার করেছে ৩৫ লাখের বেশি ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ, ফেনসিডিল ও অন্যান্য মাদক। আটক হয়েছে ১৪০ জন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সাগরপথে জ্বালানি তেল, ভোজ্য তেল ও নিত্যপণ্য পাচার রাষ্ট্রীয় রাজস্বে বড় ক্ষতি করছে। এক বছরে জব্দ হয়েছে প্রায় ১৩ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল ও ১১ মেট্রিক টন ভোজ্য তেলসহ বিভিন্ন পণ্য।

নাফ নদীতে আরেক আতঙ্ক

নাফ নদীসংলগ্ন এলাকায় গত ১০ মাসে ৩৭৫ জন বাংলাদেশি জেলে অপহরণের অভিযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে ১৮৯ জন ফিরলেও বাকিরা নিখোঁজ। ফলে টেকনাফ–সেন্ট মার্টিন এলাকায় ভরা মৌসুমেও বহু ট্রলার ঘাটে পড়ে থাকে।

জীবিকা, নিরাপত্তা ও অর্থনীতির প্রশ্ন

কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম উপকূলে কয়েক লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ–পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতে নির্ভরশীল। নিরাপত্তাহীনতায় ট্রলার কম সময় সমুদ্রে থাকছে, আহরণ কমছে, বাড়ছে লোকসান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গভীর সাগরে স্থায়ী টহল, বাধ্যতামূলক ভেসেল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস), জরুরি এসওএস ব্যবস্থা, গোয়েন্দা সমন্বয় ও দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘সমুদ্রের নিরাপত্তা কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়। এটি জাতীয় অর্থনীতি, পরিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন।’

তিনি আরও বলেন, ‘শাহাদাত হোছাইন খোকনের মৃত্যু সেই বাস্তবতাকেই আবারও স্পষ্ট করে দিল। যে সাগর হাজারো পরিবারকে বাঁচায়, নিরাপত্তাহীনতায় সেই সাগরই হয়ে উঠছে মৃত্যুফাঁদ। এখন উপকূলবাসীর প্রত্যাশা, কথা নয়, দৃশ্যমান নিরাপত্তা ও স্থায়ী সমাধান।’

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর