Thursday 26 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

কক্সবাজারে অগ্নিকাণ্ড
স্বপ্ন আর জীবিকার অবলম্বন পুড়ে ছাই, এক কাপড়ে রাস্তায় পরিবার

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:১০ | আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:১৭

৩০ পর্যটকবাহী জিপ পুড়ে ছাই হয়েছে।

কক্সবাজার: কক্সবাজার শহরের পর্যটন জোন কলাতলীর আদর্শগ্রামে নবনির্মিত একটি এলপিজি গ্যাস ফিলিং স্টেশনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের পর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে আশপাশের এলাকা। আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও বাতাসে এখনো পোড়া গন্ধ, মানুষের চোখে আতঙ্ক আর ক্ষতিগ্রস্তদের কণ্ঠে হাহাকার।

বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ‘এন আলম’ নামের ফিলিং স্টেশনটির একটি ১৪ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ট্যাংক থেকে গ্যাস লিকেজ শুরু হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে গ্যাস বাতাসে মিশে আশপাশের অন্তত এক কিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা ফায়ার সার্ভিসে খবর দেন। কর্মীরা বালু ও পানি ছিটিয়ে প্রাথমিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু রাত ১০টার দিকে হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তেই আগুন দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

দিবাগত রাত প্রায় ৩টার দিকে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর নয়টি ইউনিটের টানা পাঁচ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে ততক্ষণে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে স্বপ্ন, সঞ্চয় আর জীবিকার অবলম্বন।

গ্যারেজে ছাই ৩০ পর্যটকবাহী জিপ

ঘটনাস্থলের পাশেই ছিল পর্যটকবাহী জিপের একটি বড় গ্যারেজ। সেখানে পার্কিংয়ে থাকা ৪০টি জিপের মধ্যে মাত্র ১০টি সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। অন্তত ৩০টি জিপ আগুনে পুড়ে যায়।

জিপ মালিক ও চালক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রায় ৯ লাখ টাকা খরচ করে আড়াই মাস আগে গাড়িটা তৈরি করেছিলাম। পর্যটন মৌসুমে আয় করে ঋণ শোধ করব ভেবেছিলাম। এখন সব শেষ।’ ধোঁয়ায় কালো হয়ে যাওয়া লোহার কাঠামোর দিকে তাকিয়ে তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে।

স্থানীয়রা জানান, আগুনে পর্যটক পরিবহণে ব্যবহৃত গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুরো গ্যারেজ এখন ধ্বংসস্তূপ।

পাম্প মালিক আলম বলেন, জীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে গ্যাস পাম্পটি নির্মাণ করেছিলাম। উদ্বোধনের একদিন পর এ দুর্ঘটনা আমার সব শেষ করে দিয়েছে। এরপরও আমি হতাহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করছি।

বসতঘর পুড়ে ছাই, এক কাপড়ে রাস্তায় পরিবার

ফিলিং স্টেশনটির তিন পাশে ঘনবসতি। আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের অন্তত ১০টি বাড়িতে। তিনটি ঘর সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত মুন্নী বেগম বলেন, ‘বাচ্চাদের নিয়ে কোনোমতে বের হতে পেরেছি। বসতির ভেতরে পাঁচ ভরি সোনা আর তিন লাখ টাকা ছিল। সব পুড়ে গেছে। এখন থাকার জায়গাও নেই।’ তার চোখে অশ্রু, পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে সন্তানরা।

আরেক বাসিন্দা রমিজ উদ্দিন বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিসের নির্দেশনায় এখনো চুলায় আগুন জ্বালাতে ভয় পাচ্ছি। রাতে আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে সেহরি খেয়েছি। এখনো আতঙ্ক কাটছে না।’

দগ্ধদের লড়াই

এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৫ জন। তাদের মধ্যে ৯ জন দগ্ধ। গুরুতর আহতদের কয়েকজনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। ছয়জন ভর্তি রয়েছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে।

চিকিৎসকেরা জানান, তাদের শরীরের ২০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত দগ্ধ হয়েছে। দুজনকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালেও কয়েকজন চিকিৎসাধীন। হাসপাতাল সূত্র জানায়, অন্তত তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

অনুমোদনহীন পাম্প, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার ঘাটতি

ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে গ্যাস লিকেজ থেকেই বিস্ফোরণ। ফিলিং স্টেশনটির কোনো বৈধ অনুমোদন ছিল না এবং অগ্নিনির্বাপণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও ছিল না। মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত চার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে।

তদন্ত ও ক্ষতিপূরণের আশ্বাস

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাইদুর রহমান খান। জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, এ অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতির পরিমাণ ৪-৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও কলাতলী এলাকার মানুষ এখনো শঙ্কিত। আবার কোনো লুকানো বিপদ যেন ফিরে না আসে। পোড়া গন্ধ আর ছাইয়ের স্তূপে দাঁড়িয়ে মানুষ নতুন করে বেঁচে থাকার সাহস খুঁজছেন।

সারাবাংলা/এইচআই
বিজ্ঞাপন

রাউটার রাখার সঠিক জায়গা
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৭:০৯

আরো

সম্পর্কিত খবর