গোটা অনুষ্ঠানজুড়েই মনের মধ্যে বাজছিলো কথাগুলো। যেনো আবু হেনা মোস্তফা কামালের সেই কবিতার মতো করেই বলি, আপনাদের সবার জন্যে এই উদার আমন্ত্রণ, সাহিত্যের এই জমজমাট আসরে একবার ঘুরে যান। আয়োজনের এমন নিখুঁততা, বিষয়ের এমন বৈচিত্র্য আপনি ডিএমভি’র আর কোনো আয়োজনে পাবেন না। সত্যিই তাই! কবিতার সাথে’র উদ্যোগে ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই ‘বাংলা সাহিত্য উৎসব ২০২৬’ ছিলো প্রাণবন্ত এক উৎসবমুখর আয়োজন। আমরা অনেকেই তা উপভোগ করেছি। মূল উৎসব ৩০ মে (শনিবার) হলেও আগের রাতেই (২৯ মে) সন্ধ্যায় যে প্রারম্ভিক হয়ে গেলো তাতে অভ্যাগত অতিথিরা বুঝে নিলো, এবারের সাহিত্য আসর এক নতুন মাত্রা যোগ করবে। রাতেই আসর জমে উঠলো গান কবিতাসহ নানাবিধ পরিবেশনায়। সে সবের মধ্য দিয়ে নতুন কবির পরিচয় যেমন মিললো, চেনা হলো নতুন নতুন আরও অনেক প্রতিভাবানদের। সর্বোপরি তারা সকলেই সাহিত্যপ্রেমি মানুষ।

প্রযুক্তিবিদ শিক্ষা উদ্যোক্তা, ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির চ্যান্সেলর আবুবকর হানিপের লেখা কবিতা ‘ডিফ্রেন্ট শেডস, সেম সোলস’ পাঠের মধ্য দিয়ে জানা হলো তার কবিতা প্রতিভার কথা। অপর প্রযুক্তিবিদ, শিক্ষক ও উদ্যোক্তা ড. ফয়সল কাদেরের গানের ভক্ত কে-না এই ডিএমভি (ডিসি, মেরিল্যান্ড, ভার্জিনিয়া)য়। তিনি শোনালেন তার সুললিত কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত, আধুনিক গান।
হলো নতুন বই এর মোড়ক উন্মোচন। ফরহাদ হোসেন, ড. হাসান মাশরিকী, অনামিকা নেওয়াজ, আবু লিয়াকত হোসাইন, ডা. গৌতম দত্ত, সামছুদ্দীন মাহমুদ তাদের বই নিয়ে ছিলেন মঞ্চে। উন্মোচন করলেন আনোয়ার ইকবাল কচি, কবিতা দিলাওয়ার, রোকেয়া হায়দার , সাদাত হোসাইন, আহমাদ মাযহার ও সরকার কবির উদ্দিন। কবিতা পড়লেন ভার্জিনিয়া পপি, ইনশা হক, মাহমুদ মেনন, ড. তানজিনা নওশিন, সৈয়দ হাই ও ফরিদা ইয়াসমিন। সঞ্চালনায় ছিলেন অ্যান্ড্রু বিরাজ।

রাতের খাবারে ছিলো পুরো বাঙালিয়ানা। সে অনুষ্ঠানের গালভরা নাম- মিট অ্যান্ড গ্রিট। শেষ হলো রাত ১১টা নাগাদ।
সাধারণ ডিএমভিবাসী অবশ্য তখনও অপেক্ষায়। পরের দিন সকাল থেকেই আয়োজকরা অনুষ্ঠানস্থলে হাজির। প্রধান আয়োজক কবিতা দিলাওয়ার ও আনোয়ার ইকবাল কচির নেতৃত্বে বেশ একটা বড় দল কাজ করছিলো এই আয়োজনে। একটি গোছানো আয়োজনের জন্য সকলের মেধা ও শ্রমের ব্যবহার ছিলো চোখে পড়ার মতো। সেই কবে থেকেই দলটি একতাবদ্ধ হয়ে, সকল কাজ এগিয়ে নিয়ে মূল অনুষ্ঠান পর্যন্ত নিয়ে আসে। এরপর মূল আয়োজন সম্পন্ন হওয়ার দিন সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তা সফলতায় রূপ নেয়। যা নেপথ্য কারিগর হিসেবে কাজ করছিলেন ভার্জিনিয়ায় অতি পরিচিত মুখ দিলাওয়ার হোসেন। আর পুরো আয়োজন মঞ্চ, শব্দ ও আলোকসজ্জ্বায় ছিলেন জামিল খান। বড় একটি ভলান্টিয়ার দল কাজ করছিল তারেক মেহেদীর নেতৃত্বে ।

মঞ্চ যখন প্রস্তুত হচ্ছিলো নানাবিধ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার জন্য, ওদিকে অনুষ্ঠানস্থলে হলের চারিদিকে বসে পড়ে বইয়ের স্টল। সাহিত্য উৎসবে বই বেচাকেনা প্রধান অনুসঙ্গ। তাই বাংলাদেশ থেকে পারি জমিয়ে এসেছিলো, বাতিঘর, অন্যপ্রকাশ, ইউপিএল’র মতো প্রকাশনী সংস্থাগুলো। যুক্তরাষ্ট্রে সুপরিচিত নিউইয়র্কভিত্তিক মুক্তধারা সাজিয়েছিলো বইয়ের বিশাল পসার। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন এসময়ে তরুণ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় লেখক ও কবি সাদাত হোসাইন। এসেছিলেন বিশেষ অতিথি হয়ে ফিলিপস পুরস্কারজয়ী স্বনামধন্য সাংবাদিক আশরাফ কায়সার। লেখক আহমদ মাজহার, অভিনেত্রী শিরিন বকুলসহ আরও অনেকেই।
তাদের সকলের উপস্থিতি আর ডিএমভির সাহিত্যপ্রেমি মানুষের পদভারে মুখরিত ছিলো গোটা অনুষ্ঠানাঙ্গন। ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির বড় মিলনায়তন ৩০ মে সকাল থেকেই ভরে উঠতে শুরু করে। অনুষ্ঠান শুরু হয় সকাল ১১টায়। সকলকে শুভেচ্ছা ও স্বাগত জানান প্রধান দুই আয়োজক কবিতা দিলাওয়ার ও আনোয়ার ইকবাল। কিন্তু যখন আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি, কিংবা কি শোভা কি ছায়া গো কি স্নেহ কি মায়া গো পরিবেশনা চলছিলো মঞ্চে এক দল সঙ্গীত শিল্পীর গলায় তখন দর্শক সারির সকলেই তাতে কণ্ঠ মেলান। তাদের চোখে মুখে যেনো ফুটে ওঠে সেই বাংলা মায়ের আচল বিছানো বটের মূল নদীর কূল। আর এরপরই যখন আবার পরিবেশিত হয় ‘ ও সে ক্যান ইউ সি, বাই দ্য ডন’স আর্লি লাইট, হোয়াট সো প্রাউডলি উই হেইল’ড অ্যাট দ্য টোয়ালাইট’স লাস্ট গ্লিমিং…’ মাহদিয়া ইশাল নামের তন্বি মেয়েটি কি যে দারুণ মর্মস্পর্শী কণ্ঠে গাইলো সে গান, আর সকলেই বুকে হাত চেপে পরম ভালোবাসায় ও শুনলো কিংবা কণ্ঠ মেলালো।

সকালের আলো যেমন বলে দেয় দিনটি কেমন যাবে, তেমনি দুটি জাতীয় সঙ্গীতের পরিবেশনায় গোটা আয়োজনের মান নির্ধারণ করে দিলো। আর দর্শক অপেক্ষা করতে থাকলো তারই বাস্তব রূপ দেখবে বলে। শুরু হলো বাংলা সাহিত্য উৎসব ২০২৬। মোমবাতি প্রজ্জ্বলন হলো। ছিলো ফিতে কাটার আনুষ্ঠানিকতাও। বিশাল বই থেকে খুলে আনা ফিতে কেটে সে আনুষ্ঠানিকতা পূর্ণ করলেন প্রধান অতিথি সাদাত হোসাইন। মঞ্চে তখন বিশিষ্ট জনদের উপস্থিতি। প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথিদের সঙ্গে আরও ছিলেন ইকবাল বাহার চৌধুরী, রোকেয়া হায়দার, ড. আবদুন নূর, আবুবকর হানিপ, আনিস খান, একুশে পদকপ্রাপ্ত চিত্রশিল্পী রোকেয়া সুলতানা, তরুণ কবি তারফিয়া ফয়জুল্লাহসহ অন্য অভ্যাগত অতিথিরা। ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ধারার রাজনীতিতে অগ্রণী তরুণ স্টেট সেনেটর সাদ্দাম আজলান সেলিম। ভার্জিনিয়া স্টেটের পক্ষ বাংলা সাহিত্য উৎসবের এই আয়োজনকে সম্মানিত করতে ও স্বীকৃতি দিতে তিনি তুলে দিলেন সিনেট রেজুলেশন স্মারক। আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা কবিতা দিলাওয়ারের হাতে স্মারক তুলে দেওয়ার আগে নিজেই তা পড়ে শোনালেন উপস্থিত দর্শকদের। প্রবাসে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চায় যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারা থেকে এমন স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে এই আয়োজনকে করে তোলে অনন্য।
গোটা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানজুড়ে ব্যাকস্টেজে বেজে চলছিলো গান ‘আমি বাংলায় গান গাই’। স্বপ্নীল সজীবের গাওয়া এই গানের মাঝে মাঝেই ভেসে আসছিলো নানা চয়ন থেকে।