একঘেয়ে যান্ত্রিক জীবন থেকে মুক্তি পেতে প্রকৃতির ছোঁয়া কার না ভালো লাগে? কিন্তু অনেকেরই হাতে সময় থাকে কম আর বাজেট থাকে সীমিত। যদি এমন হয় যে, মাত্র একদিনের ছুটিতেই আপনি একই সাথে পাহাড়, নদী আর সবুজ বনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন, তাও আবার খুব কম খরচে? শুনতে অসম্ভব মনে হলেও ঢাকার খুব কাছেই নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর (বিরিশিরি) আপনাকে দিচ্ছে এই দারুণ সুযোগ। যেখানে একই ফ্রেমে বাঁধা আছে চিনা মাটির পাহাড়, সোমেশ্বরী নদী আর সবুজ বনাঞ্চল।
যাত্রার শুরু ও যাতায়াত পরিকল্পনা
একদিনে ঘুরে আসতে চাইলে আপনাকে রাতের ভ্রমণ বেছে নিতে হবে। ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন রাতের শেষভাগে দুর্গাপুরের উদ্দেশ্যে সরাসরি বাস ছেড়ে যায়। মহাখালী থেকে দুর্গাপুরের বাস ভাড়া জনপ্রতি ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা। পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে, অর্থাৎ ভোরে আপনি পৌঁছে যাবেন দুর্গাপুরের সুসং দুর্গাপুর এলাকায়। সারাদিন ঘুরে দেখার জন্য সুসং দুর্গাপুর বাজার থেকে একটি অটোরিকশা বা মোটরসাইকেল ভাড়া করে নেওয়া সবচেয়ে সুবিধাজনক এবং সাশ্রয়ী। ৪-৫ জন মিলে একটি অটোরিকশা সারাদিনের জন্য রিজার্ভ করে নিলে খরচ পড়বে ১,২০০ থেকে ১,৫০০ টাকা (জনপ্রতি ৩০০ টাকার মতো)। আর যদি মোটরসাইকেলে ঘুরতে চান, তবে চালকসহ সারাদিনের জন্য ১,০০০ থেকে ১,২০০ টাকা খরচ হবে।
চিনা মাটির পাহাড় ও নীল জলের হ্রদ
দুর্গাপুরের মূল আকর্ষণ হলো এখানকার চিনা মাটির পাহাড়। অটোরিকশা নিয়ে প্রথমেই চলে যেতে পারেন বিজয়পুর চিনা মাটির পাহাড়ে। এখানকার ছোট-বড় পাহাড়গুলোর গায়ে লেগে থাকা সাদা ও হালকা গোলাপী রঙের মাটি চোখ জুড়িয়ে দেয়। আর এই পাহাড়ের পাদদেশেই রয়েছে অসাধারণ সুন্দর নীল ও সবুজাভ জলের হ্রদ। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে চারপাশের সবুজ প্রকৃতি আর নিচে শান্ত নীল জলের রূপ আপনাকে মুগ্ধ করবেই। এখানে ছবি তোলার জন্য দারুণ সব স্পট পেয়ে যাবেন।
সোমেশ্বরী নদী ও রানীখং চার্চ
চিনা মাটির পাহাড় দেখা শেষে আপনার পরবর্তী গন্তব্য হবে সোমেশ্বরী নদী। এই নদীর রূপ একেক ঋতুতে একেক রকম। তবে সবসময়ই এর স্বচ্ছ জল আর বালুকাময় তীর পর্যটকদের আকর্ষণ করে। সোমেশ্বরী নদী পার হতে নৌকায় জনপ্রতি ১০-২০ টাকা খরচ হয়। নদী পার হয়ে কাছেই পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত ঐতিহাসিক রানীখং চার্চ বা রানীখং গির্জা দেখে নিতে পারেন। ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই পুরোনো গির্জার চত্বর থেকে নিচে বয়ে চলা সোমেশ্বরী নদী এবং ওপারে ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়গুলোর দৃশ্য এক অপূর্ব ক্যানভাসের সৃষ্টি করে।
সবুজ বন ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতি
বিকেলের দিকে আপনি ঘুরে দেখতে পারেন দুর্গাপুরের সবুজ বনাঞ্চল ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি। দুর্গাপুরের সীমান্ত ঘেঁষা এলাকায় রয়েছে ছোট ছোট টিলা আর ঘন সবুজ গাছপালা, যা বনের আবহ তৈরি করে। বনের বুক চিরে হেঁটে বেড়ানো আর পাখিদের কোলাহল আপনার সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে দেবে। এছাড়া এখানকার গারো ও হাজং সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা এবং তাদের সংস্কৃতি কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতাও বেশ চমৎকার।
একনজরে সম্ভাব্য খরচ ও কিছু প্রয়োজনীয় টিপস
৪ থেকে ৫ জনের গ্রুপে গেলে এই ট্যুরটি সবচেয়ে সাশ্রয়ী হয়। নিচে জনপ্রতি সম্ভাব্য খরচের একটি হিসাব দেওয়া হলো:
ঢাকা-দুর্গাপুর-ঢাকা বাস ভাড়া: ৯০০ – ১,০০০ টাকা।
সারাদিনের অটোরিকশা ভাড়া (গ্রুপে শেয়ারড): ৩০০ টাকা।
নৌকায় নদী পারাপার ও অন্যান্য: ৫০ টাকা।
সকাল, দুপুর ও রাতের খাবার: ৪০০ – ৫০০ টাকা (সুসং দুর্গাপুর বাজারের স্থানীয় হোটেলগুলোতে ১৫০-২০০ টাকার মধ্যে দারুণ দুপুরের খাবার পাওয়া যায়)।
সর্বমোট আনুমানিক বাজেট: ১,৬৫০ – ১,৮৫০ টাকা (জনপ্রতি)।
বিকেলের দিকে ঘোরাঘুরি শেষ করে রাতের বাসে (ভাড়া ৪০০-৫০০ টাকা) করেই আবার ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া যায়। ফলে কোনো হোটেলে রাত্রিযাপনের খরচ ছাড়াই পাহাড়, নদী আর বনের এক চমৎকার মিশেল উপভোগ করে পরদিন সকালেই ফিরে আসা সম্ভব কর্মব্যস্ত জীবনে।