ঈদুল আজহার আনন্দের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে কোরবানির মাংসের হরেক রকম পদের স্বাদ নেয়া। তবে মাংস কাটার পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় তা সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা। সবার ঘরে ফ্রিজ থাকে না, আবার ফ্রিজ থাকলেও কোরবানির বিপুল পরিমাণ মাংসের চাপে অনেক সময় জায়গা সংকুলান হয় না। এর ওপর গ্রীষ্মের তীব্র গরম আর লোডশেডিংয়ের ঝামেলা তো রয়েছেই।
তবে ফ্রিজের সুবিধা না থাকলেও দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। আমাদের বাঙালি সংস্কৃতিতে যুগ যুগ ধরে প্রাকৃতিকভাবে মাংস ভালো রাখার বেশ কিছু অসাধারণ ও ঘরোয়া কৌশল প্রচলিত আছে। নিচে ফ্রিজ ছাড়াই মাংস দীর্ঘদিন সতেজ রাখার অত্যন্ত কার্যকর কিছু পদ্ধতি আলোচনা করা হলো:
মশলা দিয়ে ফুটিয়ে বা জ্বাল দিয়ে রাখা
এটি আমাদের গ্রামীণ জনপদের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রাচীনতম একটি পদ্ধতি। মাংস কাটার পর তা পরিষ্কার করে ধুয়ে সম্পূর্ণ পানি ঝরিয়ে নিতে হবে। এরপর মাংসে পরিমাণমতো হলুদের গুঁড়ো এবং স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি পরিমাণে লবণ মাখিয়ে কোনো পানি ছাড়াই চুলায় চড়িয়ে দিতে হবে। মাংস থেকে যে নিজস্ব পানি বের হবে, তাতেই মাংস চমৎকার সেদ্ধ হয়ে যাবে। এই মাংস প্রতিদিন সকাল ও রাতে নিয়ম করে দুইবার ভালো করে ফুটিয়ে বা জ্বাল দিয়ে নিতে হবে। এই নিয়মে ফ্রিজ ছাড়াই মাংস অনায়াসে ৪ থেকে ৫ দিন পর্যন্ত পুরোপুরি ভালো রাখা যায়।
আধা-ভাজি করে রাখা
মাংসের টুকরোগুলোকে কিছুটা বড় আকারে কেটে সামান্য লবণ ও মসলা সহযোগে কড়াইয়ের অল্প তেলে হালকা ভেজে নেওয়াকে ‘সাতলানো’ বলা হয়। এই প্রক্রিয়ার ফলে মাংসের ভেতরের জলীয় অংশ বা আর্দ্রতা অনেকটাই শুকিয়ে যায়, যা ব্যাকটেরিয়া বা ক্ষতিকারক অণুজীবের বংশবৃদ্ধিতে বাধা দেয়। এই সাতলানো মাংস প্রতিদিন অন্তত একবার উল্টেপাল্টে গরম করে নিতে হবে। এভাবেও বেশ কিছুদিন মাংসের স্বাদ ও মান অটুট রাখা সম্ভব।
কড়া মসলা ও চর্বি দিয়ে রান্না করে রাখা
কোরবানির মাংস সংরক্ষণের আরেকটি সহজ বুদ্ধি হলো তা ভালো করে রান্না করে ফেলা। তবে এই ক্ষেত্রে সাধারণ রান্নার চেয়ে তেল, চর্বি, মসলা ও লবণের পরিমাণ একটু বাড়িয়ে দিতে হবে। রান্নার পর তেলের যে ঘন আস্তরণ মাংসের ওপর ভেসে থাকে, তা বাইরের বাতাস ও জীবাণু থেকে মাংসকে সুরক্ষিত রাখে। এই রান্না করা মাংস প্রতিদিন অন্তত দুইবার এমনভাবে গরম করতে হবে যেন তরকারিতে কোনো আলগা ঝোল বা পানির কণা না থাকে।
‘শুঁটকি’ তৈরি করে রাখা
মাংসকে মাসের পর মাস এমনকি বছরজুড়ে সংরক্ষণ করার সবচেয়ে সেরা উপায় হলো রোদে শুকানো। এর জন্য চর্বি ও হাড় ছাড়া সলিড মাংসকে চিকন ও লম্বা ফালি করে কেটে নিতে হবে। এরপর সামান্য হলুদ ও লবণ মাখিয়ে সুতোয় গেঁথে কড়া রোদে টানা কয়েকদিন শুকাতে হবে। মাংসের ভেতরের সব পানি শুকিয়ে যখন তা কাঠের মতো শক্ত হয়ে যাবে, তখন বায়ুরোধী (এয়ারটাইট) পাত্রে ভরে রেখে দিন। রান্নার পূর্বে এই মাংস কিছুক্ষণ গরম পানিতে ভিজিয়ে রাখলেই তা আবার নরম ও রান্নার উপযোগী হয়ে ওঠে।
থার্মোকল বক্সে বরফ চাপা দেয়া
সাময়িক সময়ের জন্য বা জরুরি প্রয়োজনে মাংস তাজা রাখতে বরফ অত্যন্ত কার্যকরী। হঠাৎ দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে বা তাৎক্ষণিক রান্নার সুযোগ না হলে একটি বড় কর্কশিট বা থার্মোকলের বাক্সে প্রচুর বরফ কুচি দিয়ে তার ভেতর মাংস চেপে রেখে দেওয়া যায়। তবে খেয়াল রাখতে হবে, বরফ গলে যেন পানি জমে না থাকে, তাই বাক্সের নিচে পানি নিষ্কাশনের ছিদ্র রাখতে হবে। এই উপায়ে ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত মাংসের সতেজতা বজায় রাখা যায়।
চর্বির আস্তরণে ডুবিয়ে রাখা (কনফি পদ্ধতি)
বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় ফরাসি ‘কনফি’ পদ্ধতির মতোই আমাদের দেশেও চর্বিতে মাংস ডুবিয়ে রাখার রেওয়াজ রয়েছে। এর জন্য প্রথমে মাংসের চর্বিগুলোকে কড়াইতে গলিয়ে তরল তেল তৈরি করে নিতে হবে। এবার সেই ফুটন্ত গরম চর্বির মধ্যে মাংসের টুকরোগুলো দিয়ে খুব ভালো করে রান্না করতে হবে। রান্না শেষে পাত্রটি ঠান্ডা হলে চর্বি জমে শক্ত হয়ে যাবে এবং মাংসের টুকরোগুলো চর্বির স্তরের নিচে ঢাকা পড়ে যাবে। অক্সিজেন প্রবেশ করতে না পারায় এই মাংস দীর্ঘদিন নষ্ট হয় না। খাওয়ার সময় চর্বি থেকে বের করে গরম করে নিলেই চলে।
ফ্রিজ ছাড়া মাংস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পাত্রটিকে সবসময় মাছি ও ধুলোবালি থেকে দূরে শুষ্ক ও বাতাস চলাচল করে এমন স্থানে রাখা।