নিউ ইয়র্ক: উত্তর আমেরিকায় বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অন্যতম বৃহৎ আন্তর্জাতিক আয়োজন ‘৩৫তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা-২০২৬’ আজ ২২ মে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে। নিউ ইয়র্কের জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে চারদিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক আয়োজন চলবে আগামী ২৫ মে পর্যন্ত।
নিউ ইয়র্ক সময় শুক্রবার (২২ মে) বিকেল ৫টা থেকে শুরু হবে প্রাক-উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং সন্ধ্যা ৬টায় অনুষ্ঠিত হবে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী অনুষ্ঠান শুরু হবে ২৩ মে ভোর ৩টা এবং উদ্বোধনী পর্ব অনুষ্ঠিত হবে ভোর ৪টায়। পরবর্তী তিন দিন- ২৩, ২৪ ও ২৫ মে- প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত মেলা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
প্রবাসী বাঙালির আবেগ, ভাষা ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতাকে ধারণ করে ১৯৯২ সালে ক্ষুদ্র পরিসরে যাত্রা শুরু করেছিল এই বইমেলা। তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে আজ এটি উত্তর আমেরিকায় বাংলা ভাষাভাষীদের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। আয়োজক মুক্তধারা ফাউন্ডেশন এবারের আয়োজনের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে- ‘যত বই তত প্রাণ’।
মেলায় অংশ নিতে এরই মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে লেখক, কবি, গবেষক, শিল্পী ও প্রকাশকরা নিউ ইয়র্কে পৌঁছেছেন। বইমেলাকে ঘিরে জ্যামাইকা এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। স্টল নির্মাণ, বই সাজানো, মঞ্চসজ্জা, আলোকসজ্জা, স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ, ডিজিটাল ডিসপ্লে ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আয়োজক প্রতিষ্ঠানের সিইও বিশ্বজিৎ সাহা জানান, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিশ্বপরিসরে আরও শক্তিশালীভাবে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়েই এবারের আয়োজন। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা বই ও সাহিত্যকে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য।
এবারের বইমেলার উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত থাকছেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলন। প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নিচ্ছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও চিন্তাবিদ রেহমান সোবহান। তাঁকে প্রদান করা হবে ‘মুক্তধারা সুকৃতজ্ঞ সম্মাননা’ ও আজীবন সম্মাননা।
আয়োজকদের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নচিন্তায় অধ্যাপক রেহমান সোবহানের অবদান অনন্য। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি কেবল একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবেই নয়, বরং একজন মানবিক বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও রাষ্ট্রচিন্তার পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। তার গবেষণা, বক্তৃতা ও লেখনী বাংলাদেশের উন্নয়ন, বৈষম্য, গণমানুষের অধিকার ও রাজনৈতিক অর্থনীতির আলোচনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে।
সম্মাননা পর্বে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হবে এবং উপস্থিত সবাই সম্মিলিতভাবে সম্মাননা-লিপি পাঠ করবেন। এরপর রোকেয়া হায়দার আনুষ্ঠানিকভাবে তার হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেবেন। আয়োজকরা জানিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে সম্মান জানানোর অংশ হিসেবেই এই বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন রওনক জাহান, ফরিদুর রেজা সাগরসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে রয়েছেন সাদাত হোসাইন, সুবোধ সরকার, লুৎফর রহমান রিটন, শামীম রেজা, রুমা মদকসহ বাংলা ভাষার বহু লেখক, কবি ও গবেষক।
প্রাক-উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থাকবে সংগীত, আবৃত্তি, নৃত্য ও স্মরণানুষ্ঠানের বিশেষ আয়োজন। ঢোলের বাদ্য ও রবীন্দ্রসংগীত ‘আজি দক্ষিণ দুয়ার খোলা’ এবং ‘বাউলা কে বানাইলোরে’ গানের মধ্য দিয়ে শুরু হবে অনুষ্ঠান। মালাবিকা চ্যাটার্জির নির্দেশনায় ‘সংগীত সাধনা’র শিল্পীরা পরিবেশন করবেন এই অংশ।
এরপর ‘আগুনের পরশমণি’ গানের আবহে অনুষ্ঠিত হবে বিশেষ স্মরণানুষ্ঠান। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির তিন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব- মহাস্বেতা দেবী, আবুল কালাম শামসুদ্দিন এবং তপন রায় চৌধুরীর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে। মোমবাতি প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে এই শ্রদ্ধাঞ্জলিতে অংশ নেবেন ইমদাদুল হক মিলন, রোকেয়া হায়দার এবং ড. নজরুল ইসলাম।
পরে থাকবে সাহিত্য পাঠ, আবৃত্তি ও সংগীত পরিবেশনা। রোকেয়া রফিক বেবী পাঠ করবেন মহাশ্বেতা দেবীর রচনা থেকে নির্বাচিত অংশ। শহিদুল আলম পাঠ করবেন তপন রায়চৌধুরীর ‘বাঙ্গালনামা’ থেকে অংশবিশেষ। এছাড়া সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘নৃত্যাঞ্জলি’ চন্দ্রা ব্যানার্জির পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় পরিবেশন করবে ‘আলোকের এই ঝরনা ধারায়’, ‘হৃদয় আমার নাচেরে’ এবং ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই’ গানের নৃত্যনাট্য।
বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে অনন্য, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, প্রথমা প্রকাশন, আহমেদ পাবলিসার্স, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশসহ বাংলাদেশ ও কলকাতার খ্যাতিমান প্রকাশনা সংস্থা। নতুন প্রকাশিত বই, গবেষণাগ্রন্থ, প্রবাসভিত্তিক সাহিত্য, শিশু-কিশোর বই এবং বিশ্বসাহিত্যভিত্তিক প্রকাশনা এবার পাঠকদের বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠবে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।
চারদিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক আয়োজনে প্রতিদিন চলবে বই বিক্রি, নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, সাহিত্য আলোচনা, কবিতা পাঠ, শিশু-কিশোর অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, লেখক-পাঠক আড্ডা এবং প্রবাসী সংস্কৃতি নিয়ে বিশেষ আলোচনা। বাংলা সাহিত্য ও বিশ্বসাহিত্যের সেতুবন্ধন তৈরির পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষা ও বইপড়ার সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়াই এবারের বইমেলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।