বর্ষার মৌসুমে মেঘ ভাঙা বৃষ্টিতে শহরের চেনা রাস্তাগুলো যখন হঠাৎ করেই চেনা রূপ হারিয়ে ছোটখাটো নদীতে পরিণত হয়, তখন সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন মোটরসাইকেল আরোহীরা। পানির নিচে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য গর্ত, ম্যানহোল কিংবা খোলা ড্রেন তো আছেই, সেসঙ্গে যোগ হয় চাকা পিছলে যাওয়া এবং সাইলেন্সার দিয়ে পানি ঢুকে সাধের বাইকটি মাঝরাস্তায় বিকল হওয়ার চরম আতঙ্ক। জলমগ্ন সড়কে বাইক চালানো কেবল একটি চ্যালেঞ্জ নয়, এটি নিখুঁত ধৈর্যের এক কঠিন পরীক্ষা। সামান্য একটু অসাবধানতা যেখানে মুহূর্তেই বড় কোনো দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে, সেখানে কিছু বিশেষ কৌশল জানা থাকলে যেকোনো চালকই এই কর্দমাক্ত পথ অনায়াসে পাড়ি দিতে পারেন।
পানিতে ডোবা সড়ক পার হওয়ার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি হলো গতি নিয়ন্ত্রণ এবং গিয়ারের সঠিক সমন্বয়। জলাবদ্ধ রাস্তায় নামার আগেই বাইকের স্পিড একদম কমিয়ে আনা উচিত। পানির নিচে কী আছে তা যেহেতু বাইরে থেকে বোঝা যায় না, তাই প্রথম বা দ্বিতীয় গিয়ারের মতো লো-গিয়ারে রেখে বাইক চালানো সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। এই সময়ে বারবার গিয়ার পরিবর্তন না করে ক্লাচ ও এক্সিলারেটরের ভারসাম্য বজায় রেখে ইঞ্জিনের আরপিএম কিছুটা বাড়িয়ে রাখতে হবে। এতে ইঞ্জিনের শক্তি বজায় থাকে এবং সাইলেন্সার পাইপ দিয়ে উল্টোমুখী পানি ঢুকে ইঞ্জিন বন্ধ হওয়ার পথ বন্ধ হয়। যদি কোনো রাস্তার পানি বাইকের সাইলেন্সার বা এয়ার ফিল্টারের উচ্চতা ছুঁয়ে ফেলে, তবে ঝুঁকি না নিয়ে বিকল্প পথ খোঁজা বা পানি কমা পর্যন্ত অপেক্ষা করাই শ্রেয়।
ভেজা কিংবা নিমজ্জিত সড়কে ব্রেক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রথাগত নিয়ম খাটবে না। পানিতে থাকা অবস্থায় হঠাৎ কড়া ব্রেক চাপলে চাকা লক হয়ে বাইক মুহূর্তেই উল্টে যেতে পারে। তাই সামনের ব্রেকের চেয়ে পেছনের ব্রেকের ওপর মৃদু চাপ দিয়ে গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সবথেকে ভালো হয় যদি ব্রেক প্যাডে চাপ না দিয়ে এক্সিলারেটর কমিয়ে ‘ইঞ্জিন ব্রেকিং’-এর সাহায্যে গতি কমিয়ে আনা যায়।
এর বাইরেও অদৃশ্য কিছু বিপদ লুকিয়ে থাকে পানির নিচে। ম্যানহোলের খোলা ঢাকনা, বড় গর্ত বা ধারালো কোনো বস্তু পানির কারণে চোখেই পড়ে না। তাই সামনের বড় যানবাহনের চাকা কোন দিক দিয়ে যাচ্ছে তা লক্ষ্য রেখে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে পিছু নেওয়া যেতে পারে। তাড়াহুড়ো করে বা ওভারটেক করার চেষ্টা এই সময়ে আত্মঘাতী প্রমাণিত হতে পারে। বিশেষ করে যারা রাইড শেয়ারিং অ্যাপে যাত্রী পরিবহন করেন, তাদের গন্তব্যে পৌঁছানোর চেয়ে আরোহীর নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
সবশেষে মনে রাখা জরুরি, গন্তব্যে কয়েক মিনিট আগে পৌঁছানোর চেয়ে অক্ষত ও নিরাপদে পৌঁছানো অনেক বেশি মূল্যবান। জলাবদ্ধ পথ পাড়ি দেওয়ার পর ব্রেক প্যাডে পানি জমে সাময়িকভাবে ব্রেকের কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে, তাই শুকনো রাস্তায় উঠে কয়েকবার হালকা ব্রেক চেপে প্যাড শুকিয়ে নেওয়া উচিত। আর কোনো কারণে যদি বাইক পানির মধ্যে দীর্ঘক্ষণ আটকে থেকে বন্ধ হয়ে যায়, তবে জোর করে বারবার স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা করলে ইঞ্জিনের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বাইক ঠেলে শুকনো নিরাপদ স্থানে নিয়ে কোনো অভিজ্ঞ মেকানিক দিয়ে পুরো মেকানিজম পরীক্ষা করিয়ে নেওয়াই হবে প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ। একটু বাড়তি সতর্কতা, ঠাণ্ডা মাথা আর নিয়ন্ত্রিত গতিই পারে বর্ষার এই কর্দমাক্ত বৈরি রাস্তাতেও আপনার সফরকে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে।