ইসলামী শরিয়তে জিলহজ মাসের ৯ তারিখ তথা আরাফার দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বরকতময়। মক্কা নগরী থেকে পূর্ব দিকে অবস্থিত ঐতিহাসিক আরাফাত ময়দানে এই দিনে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা লাখো মুসলিম সমবেত হন। হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা আবর্তিত হয় এই বিশেষ দিনটিকে কেন্দ্র করেই।
আসুন জেনে নেই, কোরআন ও হাদিসের আলোকে এই দিনটির মহিমার মূল কারণগুলো…
আরাফাত ময়দানে অবস্থানই হজের মূল ভিত্তিহজের যতগুলো রুকন বা আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে অপরিহার্য হলো আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা। ইসলামের দৃষ্টিতে এই উপস্থিতি ছাড়া হজ কোনোভাবেই পূর্ণাঙ্গ হয় না। রাসুলুল্লাহ $({সা.})$ এ প্রসঙ্গে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, যে ব্যক্তি আরাফার ময়দানে নির্দিষ্ট সময়ে অবস্থান করতে পেরেছে, তার হজ সুসম্পন্ন হয়েছে।
দিনপঞ্জিকার সর্বশ্রেষ্ঠ দিনহাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় আরাফার দিনকে পুরো বছরের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ দিন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সৃষ্টিকর্তার কাছে এই দিনটির চেয়ে উত্তম আর কোনো দিন নেই। এই দিনে আকাশ থেকে পৃথিবীতে আল্লাহর বিশেষ রহমত ও অনুগ্রহ বর্ষিত হয়।
দ্বীন ও নিয়ামতের পূর্ণতা লাভের দিনমানবজাতির হেদায়েতের বার্তা নিয়ে আসা ইসলাম ধর্ম পূর্ণতা পেয়েছিল এই ঐতিহাসিক দিনে। বিদায় হজের সময় আরাফার ময়দানেই পবিত্র কোরআনের সুরা মায়েদার সেই বিখ্যাত আয়াতটি নাজিল হয়, যেখানে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন যে, আজ তিনি বিশ্বাসীদের জন্য তাদের দ্বীনকে সম্পূর্ণ করলেন এবং নিজের নিয়ামতকে পরিপূর্ণ রূপ দিলেন।
আনন্দ ও উৎসবের আবহআরাফার দিনটি কেবল ইবাদতের নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি আনন্দের দিন। পরবর্তী দিনগুলোতে কোরবানি ও ঈদের যে আমেজ তৈরি হয়, তার সূচনা ঘটে এই দিনটি দিয়েই। তাই হাদিসে আরাফার দিন, কোরবানির দিন এবং এর পরবর্তী দিনগুলোকে উম্মাহর জন্য উৎসবের দিন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
ক্ষমার বন্যা ও জাহান্নাম থেকে মুক্তিবান্দার পাপমোচনের জন্য এই দিনটি এক মহাসুযোগ। বছরের অন্য যেকোনো দিনের তুলনায় এই দিনে আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষকে ক্ষমা করেন এবং নরকের অগ্নি থেকে মুক্তি দেন। আল্লাহর দয়া ও ক্ষমার এই বিশালত্ব দেখে শয়তান এই দিনে সবচেয়ে বেশি অপমানিত ও লজ্জিত বোধ করে।
এক রোজা দুই বছরের গুনাহ মাফযারা হজে যেতে পারেননি, সেইসব সাধারণ মুসলিমদের জন্য এই দিনের রোজা রাখার মধ্যে রয়েছে বিশাল সওয়াব। রাসুলুল্লাহ (সা.) আশা ব্যক্ত করেছেন যে, আরাফার দিনের একটি মাত্র রোজা বান্দার বিগত এক বছর এবং আগামী এক বছরের ছোটখাটো গুনাহের কাফফারা বা ক্ষতিপূরণ হিসেবে গণ্য হবে।
প্রার্থনা কবুলের শ্রেষ্ঠ মাহেন্দ্রক্ষণদোয়া বা প্রার্থনার জন্য আরাফার দিনটি সবচেয়ে কার্যকরী সময়। এই দিনের করা মোনাজাত আল্লাহর দরবারে দ্রুত কবুল হয়। এই দিনের সর্বোত্তম আমল হলো আল্লাহর একত্ববাদের জিকির করা। নবী-রাসুলদের শেখানো তাওহিদের বাণী তথা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, প্রশংসা ও ক্ষমতার সাক্ষ্য দেওয়া এই দিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জিকির।
সংক্ষেপে, আরাফার দিনটি হলো স্রষ্টা ও সৃষ্টির মেলবন্ধনের, ক্ষমা পাওয়ার এবং আত্মশুদ্ধি অর্জনের এক অনন্য সুযোগ। ইবাদত, জিকির ও কান্নাকাটির মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য এই দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম।