আঠারো শতকের শেষভাগ। ফ্রান্স তখন জ্বলছে বিপ্লবের আগুনে। রাজা ষোড়শ লুইয়ের রাজত্ব ধুলোয় মিশেছে, চারদিকে কেবল পুরনো নিয়ম ভেঙে নতুন কিছু গড়ার উন্মাদনা। কিন্তু সেই উন্মাদনার মাঝে এক অদ্ভুত সমস্যা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। ফ্রান্সে তখন প্রায় ৮০০টি ভিন্ন ভিন্ন পরিমাপের একক চালু ছিল। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে গেলে ‘এক ফুট’ জায়গার দৈর্ঘ্য বদলে যেত, ওজনের বাটখারা যেত পাল্টে। ব্যবসায়ীদের কারচুপি আর সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি যখন চরমে, ঠিক তখনই নেপথ্যে জন্ম নিল এক বৈপ্লবিক পরিকল্পনা। ১৭৯৫ সালের ৭ এপ্রিল; একটি দিন যা মানবসভ্যতার মাপজোখ করার চিরচেনা ধরনটাই চিরতরে বদলে দিল। শুরু হলো ‘মেট্রিক সিস্টেম’-এর রহস্যময় যাত্রা।
রাজার পায়ের মাপ বনাম প্রকৃতির ধ্রুব সত্য
বিপ্লবের আগে ফ্রান্সে দৈর্ঘ্যের মাপ নির্ধারিত হতো রাজার হাতের আঙুল কিংবা পায়ের পাতার দৈর্ঘ্য দিয়ে। নতুন রাজা সিংহাসনে বসলে মাপও বদলে যেত। এই খেয়ালখুশি বন্ধ করতে ফরাসি বিজ্ঞানীরা চাইলেন এমন এক মাপ যা কোনো মানুষের ওপর নয়, বরং স্বয়ং প্রকৃতির ওপর নির্ভর করবে। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, উত্তর মেরু থেকে বিষুবরেখা পর্যন্ত দূরত্বের এক কোটি ভাগের এক ভাগ হবে দৈর্ঘ্যের নতুন একক। যার নাম দেওয়া হলো ‘মিটার’। কিন্তু এই দূরত্ব মাপতে গিয়ে দুই বিজ্ঞানী মেচাইন ও ডিলাম্ব্রকে যে বিপদে পড়তে হয়েছিল, তা কোনো গোয়েন্দা গল্পের চেয়ে কম নয়। যুদ্ধ ও বিপ্লবের ডামাডোলের মাঝে পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে স্পেনের বার্সেলোনা থেকে ফ্রান্সের ডানকার্ক পর্যন্ত দূরত্ব মাপতে গিয়ে তারা বারবার গ্রেফতার হয়েছেন, স্পাই সন্দেহে জেলে গেছেন, এমনকি মানুষ তাদের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি দেখে ডাইনি বা জাদুকর মনে করে আক্রমণও করেছিল। দীর্ঘ সাত বছরের সেই রোমাঞ্চকর অভিযানের ফসলই হলো আজকের আধুনিক মেট্রিক পদ্ধতি।
এক পৃথিবীর এক নিয়ম এবং তালিল্যান্ডের স্বপ্ন
ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম কারিগর বিশপ তালিল্যান্ড স্বপ্ন দেখেছিলেন এমন এক ব্যবস্থার, যা হবে ‘সবার জন্য এবং চিরকালের জন্য’। ১৭৯৫ সালের ৭ এপ্রিল ফরাসি জাতীয় পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে এই পদ্ধতি গ্রহণ করে। তারা চাইলেন ওজন বা আয়তনের মাপ যেন কেবল অনুমানের ওপর না থাকে। সেই থেকে এক ঘন ডেসিমিটার বিশুদ্ধ পানির ওজন হলো এক কিলোগ্রাম। মজার ব্যাপার হলো, এই পদ্ধতিটি এতটাই নিখুঁত এবং গাণিতিক ছিল যে এটি কেবল দশমিকের ওপর ভিত্তি করে সাজানো হলো। অর্থাৎ ১০ মিলিমিটারে ১ সেন্টিমিটার, ১০০ সেন্টিমিটারে ১ মিটার। ব্রিটিশদের জটিল ‘ফুট-ইঞ্চি’ কিংবা ‘গজ’ যেখানে মুখস্থ করতে হিমশিম খেতে হতো, সেখানে মেট্রিক সিস্টেম জাদুর মতো সহজ হয়ে ধরা দিল। তবে মজার তথ্য হলো, স্বয়ং নেপোলিয়ন বোনাপার্টও একবার এই সিস্টেম বাতিল করেছিলেন কারণ সাধারণ মানুষ হুট করে এই নতুন নিয়ম মেনে নিতে পারছিল না। পরে ১৮৪০ সালে এটি পুনরায় বাধ্যতামূলক করা হয়।
ভল্টের নিচে লুকানো সেই আদি রহস্য
আপনি হয়তো ভাবছেন, মিটার বা কেজির এই মাপগুলো আসলে সুরক্ষিত থাকে কোথায়? প্যারিসের কাছে সেভ্রেস নামক এক জায়গায় একটি ভূগর্ভস্থ ভল্টের ভেতরে অত্যন্ত সাবধানে রাখা হয়েছিল একটি প্ল্যাটিনাম-ইরিডিয়ামের তৈরি দণ্ড, যা ছিল পৃথিবীর প্রথম ‘আদর্শ মিটার’। তেমনিভাবে ‘লি গ্র্যান্ড কে’ নামের একটি সিলিন্ডার ছিল ওজনের আদর্শ মাপ। এই বস্তুগুলো এতটাই পবিত্র এবং গোপন ছিল যে দশকের পর দশক ধরে এগুলোকে বাইরের পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হতো। রহস্যময় ব্যাপার হলো, বিজ্ঞানীরা পরে খেয়াল করলেন যে সময়ের সাথে সাথে সেই আদি কেজির সিলিন্ডারটির ওজন সামান্য কমে যাচ্ছে! এটি বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দেয়। ফলে বর্তমানে এই ভৌত বস্তুগুলোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আলোর গতিবেগ এবং পরমাণুর স্পন্দনের মতো মহাজাগতিক ধ্রুবকের ওপর ভিত্তি করে মিটার ও কেজির সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে।
আমেরিকার একগুঁয়েমি এবং মহাকাশের ট্র্যাজেডি
মেট্রিক সিস্টেম দিবস পালনের আড়ালে একটি বিস্ময়কর তথ্য হলো, পৃথিবীর প্রায় সব দেশ এটি গ্রহণ করলেও আমেরিকা এখনও তাদের পুরনো পদ্ধতি আঁকড়ে ধরে আছে। আর এই জেদের মাশুল গুণতে হয়েছে চরমভাবে। ১৯৯৯ সালে নাসার ‘মার্স ক্লাইমেট অরবিটার’ মহাকাশযানটি মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছানোর সাথে সাথে বিধ্বস্ত হয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে এক অদ্ভুত তথ্য। মহাকাশযানের সফটওয়্যারের একটি অংশ কাজ করেছিল মেট্রিক সিস্টেমে (নিউটন), আর অন্য অংশটি তথ্য পাঠিয়েছিল আমেরিকান সিস্টেমে (পাউন্ড-ফোর্স)! সামান্য মাপের এই গড়মিলে কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের মিশন মুহূর্তেই ছাই হয়ে যায়। এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মাপজোখের এই ঐক্যবদ্ধ ব্যবস্থা কেবল গণিতের বিষয় নয়, এটি বিশ্বকে একত্রে রাখার এক অদৃশ্য সুতো। তাই প্রতি বছর ৭ এপ্রিল যখন পৃথিবীজুড়ে মেট্রিক সিস্টেম দিবস পালিত হয়, তখন তা আসলে সেই সাত বছরের রুদ্ধশ্বাস অভিযানের সাহস আর বিজ্ঞানের নিরঙ্কুশ জয়ের গল্পই বলে।